ঢাকাWednesday , 30 October 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ হবে তো?

তালুকদার রুমী
October 30, 2024 10:14 pm
Link Copied!

পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে বাজার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে পলিথিন। এরই মধ্যে গত ১ অক্টোবর থেকে শপিং মলগুলোতে পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে পাটের বা কাপড়ের তৈরী ব্যাগ অথবা বিকল্প পণ্যের ব্যবহার শুরু হয়েছে। আগামীকাল অর্থাৎ ১ নভেম্বর থেকে সকল কাঁচা বাজারে পলিথিন ব্যাগের পরিবর্তে বিকল্প পণ্যের ব্যবহার শুরু করতে হবে। এ ছাড়া পলিথিন উৎপাদন ও বিপননের ব্যাপারে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।পলিথিন বন্ধে অভিযান তদারকিতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ২৯ অক্টোবর৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি ১ নভেম্বর থেকে দেশব্যাপী পরিচালিত পলিথিন বন্ধের অভিযান ‘মনিটর’ করবে। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আছেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন অনুবিভাগ)। সদস্য হিসেবে থাকছেন যুগ্ম সচিব (পরিবেশ-১ অধিশাখা), উপ সচিব (পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ-১ ও ২) এবং সিনিয়র সহকারী সচিব (পরিবেশ-৩)। মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ‘বিশেষ উদ্যোগে গৃহীত কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে’ এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরও একটি আলাদা কমিটি গঠন করবে। অধিদপ্তরের কমিটি প্রতিদিন বিকাল ৫টার পর পরিচালিত অভিযানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের কমিটিকে পাঠাবে। নভেম্বর প্রথম দিন থেকে পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধে কঠোর মনিটরিং ও অভিযান শুরুর কথা বলেছেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, বাজারের পাশাপাশি অভিযান চলবে উৎপাদনের স্থলেও। এ ছাড়া রিজওয়ানা হাসান পলিথিন বন্ধে জনসচেতনতায় জোর দিচ্ছেন। তিনি বলেন, মানুষ যদি পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করে, তাহলে উৎপাদনও বন্ধ হবে। এজন্য জনগণকে সচেতন করতে হবে। পলিথিন ব্যাগের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝে মানুষ যেন এটি থেকে সরে আসে, সে উদ্যোগ নেওয়া হবে। ২০০২ সালে সরকার আইন করে সাধারণ পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু দুই দশকেও এর বাস্তবায়ন হয়নি। পলিথিনের এই অতি ব্যবহার পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।পলিথিনের শপিং ব্যাগ পচনশীল নয়। পলিথিনের স্তূপ নালায় আটকে থাকায় পানি নিষ্কাষণেও বাধা তৈরি হয়। সে কারণে বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা এক সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই পলিথিন এবকার সত্যি সত্যি বন্ধ হবে তো? না কি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ের মতো শুধু হাঁকডাকেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি সেটাও ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’ অবস্থা হবে না তো? পলিথিন নিষিদ্ধ করে বিকল্প হিসেবে পাটের তৈরি ব্যাগ ব্যবহারে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও নানা সংকটের কথা আসছে। পলিথিন যেমন সহজলভ্য, পাটজাত পণ্য তেমন সহজলভ্য নয়। আবার ব্যবহারে জটিলতার কথাও বলছেন কেউ কেউ। এর বাইরে নতুন পণ্যে অভ্যস্ততার একটি বিষয় রয়েছে। তাইতো পলিথিন নিষিদ্ধের বিষয়টি নিয়ে জনমনে বারবারই একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, সত্যি সত্যি পলিথিন ব্যবহার বন্ধ হবে তো? পলিথিনের বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় (২০০১-২০০৬) তখনকার পরিবেশমন্ত্রী শাজাহান সিরাজ। তিনিবাজারগুলোকে পলিথিনমুক্ত করেছিলেন। বিগত অন্তত ২০ বছরের ইতিহাস যাদের মনে আছে তারা নিশ্চয়ই জানেন শাজাহান সিরাজের সেই সাফল্যের কথা। দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর তিনি যখন পলিথিন থেকে মুক্তির ঠিক কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন তখন তার সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরও বাজারে তেমন পলিথিন দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের শুরুর দিকেও পলিথিন ব্যবসায়ীরা বাজারে প্রবেশ করতে পারেনি। পরে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ সরকারের শিথিল নীতির কারণে পলিথিনে আবার সয়লাব হয়ে ওঠে বাজার। ফ্যাসিস্ট হাসিনা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশ ছেড়ে প্রভুর দেশ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এ সরকার রাষ্ট্রকে নতুন করে বির্নিমাণে বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি পরিবেশ উপদেষ্টা হিসাবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দায়িত্ব নেওয়ার পর পলিথিন ব্যবহার বন্ধে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১ অক্টোবর থেকে সুপার শপে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে আগামী ১ নভেম্বর থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বাজারে পলিথিনের ব্যবহার।
তবে আশার কথা হচ্ছে, দেশের সুপার শপগুলোতে আগে থেকেই পলিথিন ব্যবহার করা হয় না। নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে প্রধানত মীনাবাজার, আগোরা, স্বপ্ন, ইউনিমার্টের মতো সুপার শপগুলো আগে থেকেই পলিথিন ব্যবহার করে না। তবে রাজধানী ঢাকাসহ গ্রামগঞ্জের সব হাটবাজারে দেদারছে পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর প্রধান কারণ সহজলভ্যতা এবং ব্যবহারে সুবিধা। সাধারণত একটি চটের ব্যাগের দাম পড়ে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। সেখানে ৫০ থেকে ৭০ পয়সার একটি পলিথিনে সমপরিমাণ পণ্য পরিবহন করা যায়। পলিথিন সিঙ্গেল ইউজ পণ্য। একবার ব্যবহার করেই মানুষ এটি ফেলে দেয়। এছাড়া দাম কম হওয়ায় বাজারে বিক্রেতাই পলিথিন সরবরাহ করে। অন্যদিকে বাজারে পাটের ব্যাগ ক্রেতাকে নিয়ে যেতে হয়। একটি ব্যাগ অন্তত ৮ থেকে ১০ বার ব্যবহার করা গেলেও এটি পরিবহন এবং সংরক্ষণের যে অভ্যস্ততা ৮০ বা ৯০-এর দশকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল, তা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। যদিও পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন পরিবেশ উপদেষ্টা। এ জন্য পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে টানা বেশ কয়েকটি সভাও করেছেন তিনি। এরপর গত সপ্তাহে পলিথিনের বিকল্প পণ্য নিয়ে একটি মেলা করে পরিবেশ অধিদফতর। এতে মূলত পাটজাত পণ্যের নানা ধরনের ব্যাগের প্রদর্শনী করা হয়। এ প্রদর্শনীতে অংশ নেয় গ্রিন আর্থ কটেজ। প্রতিষ্ঠানটির সিইও ড. মো. তারেক হোসেইন জানান, পলিথিনের বিকল্প পাটের ব্যাগ দিতে হলে প্রতিদিন ৫০ লাখের মতো জুট ব্যাগ প্রয়োজন। যার কাঁচামাল এই মুহূর্তে কারও হাতে নেই। আসলে আমরা তো আগে থেকে জানতাম না এত দ্রুত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে সরকার। এ জন্য আমরা কাঁচামাল আনার চেষ্টা শুরু করেছি। পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টাও করছি। গত ৯ সেপ্টেম্বর পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঘোষণা দেন, ১ অক্টোবর থেকে সুপার শপে কোনও পলিথিন বা পলিপ্রপিলিনের ব্যাগ রাখা যাবে না এবং ক্রেতাদের দেওয়া যাবে না। বিকল্প হিসেবে সব সুপার শপে বা শপের সামনে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ রাখা হবে ক্রেতাদের জন্য। সেই সঙ্গে ১ নভেম্বর থেকে ঢাকার ১০টি কাঁচাবাজারে পলিথিন বন্ধে কার্যক্রম শুরু হবে। এদিন থেকে দেশব্যাপী পলিথিন উৎপাদনের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালিত হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করার বিষয়টি নির্ভর করে সরকারের কঠোরতার ওপর। সরকার যদি বিএনপির মরহুম পরিবেশমন্ত্রী শাজাহান সিরাজের মতো পলিথিন বন্ধে কঠোর হয় তাহলেই পলিথিন বন্ধ সম্ভব। অন্যথায় এটি প্রায় অসম্ভব। ২০০২ সালে সারা দেশে পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এতে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম, পাটশিল্প ও কাগজের ঠোঙার ব্যবহারও বেড়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে আবার আমরা সরে এসেছি। ২০১০ সালে সরকার আবারও ১৭টি পণ্যের মোড়ক হিসেবে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এতেও পলিথিনের ব্যবহার কমছে না। ২০১৫ সালে সরকার ধান, চাল, ভুট্টা, সার ও চিনি মোড়কের জন্য পাটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। কিন্তু বাজারে সেই বাধ্যতামূলক অবস্থার চিত্রটি দেখা যাচ্ছে না। তাই শুধু আইন করে নয়, আইনের প্রয়োগ দরকার। এ সরকার যেহেতু অরাজনৈতিক সরকার তাই তারা আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ করতে পারবে এমন প্রত্যাশা সবার। অতীতের স্বৈরাচার সরকার একদিকে পলিথিনের কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছেন, অন্যদিকে বিক্রেতার দোকানে অভিযান চালিয়ে তাকে জেল জরিমানা করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এরূপ দ্বিমুখী নীতি থেকে সরে আসতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এটাই সবার আশা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে জনসাধারণের মধ্যে পলিথিনের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে আরও ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালাতে হবে। মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারের তথা পলিথিনের বিকল্প ব্যবস্থারও পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো আমদানিকারক আর পলিথিনের কাঁচামাল আমদানি করবেন না, কোনো কারখানাতেই আর পলিথিন উৎপন্ন হবে না, কোনো পলিথিন ব্যবসায়ী আর পলিথিন বেচবেন না, আমরা যারা পলিথিন ব্যবহার করি তারাও পলিথিনকে না বলবো। তাহলেই ক্ষতিকর নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন, বিপনন ও ব্যবহার বন্ধ হবে।