নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করতে দেশ বিদেশে চলছে নানা ষড়যন্ত্র। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা তার প্রভুর দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে বসে মোদি-হাসিনা এদেশের সরকারের বিরুদ্ধে নানান ষড়যন্ত্র করছে। এসব ষড়যন্ত্র সফলতার সাথে মোকাবেলায় করলেও এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরতে পারছেনা। ষড়যন্ত্রকারীদের নানান ইস্যুকে মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকার অনেক বিষয়েই যথাযথ নজর দিতে পারছেনা। এর মধ্যে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্যতম। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। বাড়ছে খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, রাহাজানি, লুটতরাজের মতো ঘটনা। ফলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অভাববোধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। গত ২৫ অক্টোবর দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সারা দেশেই অপরাধ কর্মকা- বাড়ছে। প্রায় প্রকাশ্যে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। গত দুই মাসে সারা দেশে ৬২৫ জন নিহত হওয়ার তথ্য মিলেছে। তবে রাজধানী ও চট্টগ্রামের অপরাধচিত্র বেশি খারাপ।প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় হত্যা, ছিনতাই, দখল, চাঁদাবাজিসহ তুচ্ছ কারণে পিটিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন স্বৈরাচার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নিলে সারা দেশে ব্যাপক সংঘাতের ঘটনা ঘটে। বহু থানা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং কয়েকটি কারাগারেও হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় আন্দোলনকারীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দুষ্কৃতকারীরা প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র লুট করে।এর মধ্যে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও আরো অনেক অস্ত্র দুষ্কৃতকারীদের কাছে রয়ে গেছে। তারা খুন, ডাকাতি, লুটতরাজে এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, অবৈধ অস্ত্রে খুনাখুনির অভিযোগ পেয়ে তদন্ত চলছে। সেই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু হয়েছে। যৌথ অভিযানে গত ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৩১৮টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।এই সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ১৭৪ জন সন্ত্রাসী। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে রিভলভার ১৯টি, পিস্তল ৭৬টি, রাইফেল ২২টি, শটগান ৩৭টি, পাইপগান আটটি, শ্যুটার গান ৪৩টি, এলজি ৩১টি, বন্দুক ৪৮টি, একে-৪৭ একটি, এসএমজি পাঁচটি, গ্যাসগান চারটি, এয়ারগান ১০টি, এসবিবিএল ১০টি, টিয়ার গ্যাস লঞ্চার দুটি এবং থ্রি-কোয়ার্টার দুটি। ২৫ অক্টোবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত অপর একটি খবরে বলা হয়, গত ৫ আগস্ট বগুড়া সদর থানা থেকে ৩৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় আট হাজার রাউন্ড গুলি খোয়া যায়। এ পর্যন্ত মাত্র ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র কাদের কাছে? তারা এসব অস্ত্র দিয়ে কী করছে? পুলিশি কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় চোরাচালান হয়ে আসা আগ্নেয়াস্ত্রের কেনাবেচাও বেড়েছে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষক নুর খান বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারলে সমাজে হানাহানি আরো বাড়বে। পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে গুলিতে অনেক মানুষ মারা গেছে। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।’ তিনি দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের দাবি জানান। পুলিশের কার্যক্রম এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সারাদেশে ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে পুলিশি কার্যক্রম চলছে। থানা, ট্রাফিক বিভাগ থেকে শুরু করে প্রায় সব খানেই জনবল সঙ্কট রয়েছে। কোথাও কোথাও একজন কর্মকর্তা একাধিক বিভাগ সামলাচ্ছেন। এখনও পুলিশ পুরোদমে সক্রিয় না হওয়ায় নিরাপত্তা শঙ্কায় রয়েছেন নাগরিকরা। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। মোহাম্মদপুর থানায় সেবাপ্রার্থীর সংখ্যা হাতেগোনা। অথচ গণ অভ্যুত্থানের আগে এই থানায় সেবাপ্রত্যাশীদের ভিড় লেগে থাকতো। এদিকে, মিরপুর থানায়ও একই চিত্র। দায়িত্বরতদের মধ্যে রয়েছে ঢিলেঢালা ভাব। রুটিন কাজের বাইরে খুব একটা তৎপরতা নেই।এভাবে রাজধানীর পঞ্চাশটি থানার মধ্যে অন্তত ত্রিশটি থানার কার্যক্রম এভাবেই চলছে। অপরদিকে, যাত্রাবাড়ি ও ভাটারা থানার কার্যক্রম নিজ ভবনে শুরু হয়নি এখনও।মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী ইফতেখার হাসান বলেন, মব নিয়ে একটি আতঙ্ক ছিল। আন্দোলনের সময় গণপিটুনিতে অনেক পুলিশ মারা গিয়েছে। কাজ চালিয়ে যেতে হবে- এমন বার্তা মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের কাজে পৌঁছানো হয়েছে। গাড়ি ভাড়া করে টহল চালানো হচ্ছে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা। শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থানার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে। গত ৫ আগস্টের পর নগরবাসিও তা টের পেয়েছেন। নগরবাসীর অভিমত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরোপুরি তৎপর না হওয়া পর্যন্ত নগরবাসী নিরাপত্তাবোধ করবে না। তাই পুরোপুরি কার্যক্রমে ফিরতে পুলিশ বাহিনীকে সবার সহযোগিতা করা উচিৎ। সেই সাথে দ্রুত পুলিশের জনবল বাড়ানোর কথা বলছেন নগরবাসী।
এদিকে, রাজধানীর থানাগুলোর রাতের চিত্র আরও সুনসান। সেবাপ্রার্থীর সংখ্যা কমার পাশাপাশি মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। নগরবাসীর কেউ বলছেন, আগের সংস্কৃতি থেকে পুলিশ এখনও অনেকটা বের হতে পারেনি। আবার অনেকে বলেন, আগে থানায় সেবাপ্রার্থীদের সেভাবে মূল্যায়ন না করা হলেও বর্তমানে চিত্র পাল্টেছে।অপরদিকে, থানাগুলোতে বদলীর কারণে সদস্যদের আসা-যাওয়া চলছে। থানার বাইরে এলাকা ভিত্তিক টহলও খুব একটা চোখে পড়ছে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।ডিএমপিতে বর্তমানে চারজন যুগ্ম কমিশনার ও সাতজন উপ-কমিশনার সংযুক্ত রয়েছেন। একজন ডিসির অধীনে রয়েছে একাধিক বিভাগ। এছাড়া, গোয়েন্দা বিভাগে প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা নেই। কর্মকর্তাদের কথা অধস্তনরা আমলে নিচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। মামলার তদন্তে ধীরগতি রয়েছে। আবার দায়িত্বরত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ক্রাইম বিভাগ থেকে দূরে ছিলেন।ডিএমপি মুখপাত্র তালেবুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে টহল কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হয়েছে। তবে তা এখনও আগের চেয়ে কম। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি গতিশীল হচ্ছে। পুলিশের কার্যক্রমে এখনও সবচেয়ে বড় বাধা ভয়, আতঙ্ক এবং আস্থাহীনতা। অন্যদিকে, প্রায় চারশত থানায় কমবেশি অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হাজারখানেক যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।অন্যদিকে, প্রায় সব থানায় নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে সবার মধ্যে কাজের সমন্বয় এখনও গড়ে উঠেনি। তাছাড়া, সোর্স সঙ্কটও রয়েছে। এদিকে, নতুন করে থানায় থানায় ফরমায়েশি মামলা আর তদবিরবাজদের আনাগোনা বেড়েছে।পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) ইমামুল হক সাগর বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে কার্যক্রম চলছে। হেডকোয়ার্টার থেকে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।সরকারি নির্দেশনা না মেনে ১৮৭জন সদস্য এখনও কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন, আলোচিত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ, বিপ্লব কুমার সরকার, প্রলয় জোয়ার্দার ও মনিরুল ইসলাম। এছাড়া, অন্তত দশজন পুলিশ সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া বাকীদের আতঙ্কিত হবার কারণ নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।ইমামুল হক সাগর বলেন, অপরাধীদের শুধুমাত্র আইনের আওতায় আনা হবে। যেসব পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ রয়েছে তারাই গ্রেফতার হয়েছেন।পুলিশকে পুরোপুরি কার্যক্রমে ফিরতে সাধারণ মানুষকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন বাহিনীটির কর্মকর্তারা। পুলিশী কার্যক্রমের এমন বেহাল অবস্থার মধ্যেই সম্প্রতি কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়েছে। এতে জনমনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের পর স্বাভাবিকভাবে আশা করা গিয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এখন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। এতে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, যেখানে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারে থেকেই ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করত, সেখানে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর তা আরও পাকাপোক্ত হবে। অথচ নিরীহ মানুষ ভয়ে থানায় অভিযোগ নিয়েও যাবে না। এই পরিস্থিতি জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, বড় অপরাধীদের মামলা, জামিন, গ্রেপ্তার ও সামগ্রিক কার্যক্রমের ওপর পুলিশের বিশেষ শাখাসহ অন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজরদারি করত। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভঙ্গুর অবস্থা তৈরি হয়। এই সুযোগে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা খুব সহজে বের হয়ে আসছে। বের হওয়ার পর তাদের ওপর নজরদারিও নেই। সরকার যেসব সংস্কারের কথা বলছে, তা বাস্তবায়ন করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন আবশ্যক। কিন্তু এ বিষয়ে সরকার এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছে বলে মনে হয় না। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ ডাকাতির চেষ্টা ও সন্ত্রাসী ঘটনার কোনো যোগসূত্র থাকাও অস্বাভাবিক নয়।পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কারাগার থেকে বের হয়ে আসা সন্ত্রাসীদের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর যে অঙ্গীকার করেছেন, সেটা যাতে নিছক কথার কথা না হয়। তাঁরা যেন ভুলে না যান যে জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সরকারেরই।নিরাপদে এবং মানসম্মান নিয়ে বসবাস করা মানুষের মৌলিক অধিকার। আর মানুষের সেই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমরা চাই, দ্রুততম সময়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হোক। পুলিশি কার্যক্রম জোরদার করা হোক। সমাজে শান্তি ফিরে আসুক।

