‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’ স্কুলে পড়ার সময় বাংলা ব্যাকরণে এ বিষয়ে ভাব সম্প্রসারণ আমরা মুখস্থ করেছি। তবে এর যথার্থ মর্ম বা অর্থ তখন অনেকেইউপলব্ধি করতে পারিনি। আসলে জীবন ধারণের জন্য খাদ্য গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। তবে সে খাদ্য হতে হবে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ভেজালমুক্ত নিরাপদ। খাদ্য মানুষের জীবন বাঁচায়, আবার বিষাক্ত বা ভেজাল খাদ্য মানুষকে মৃত্যুর দিকেও ঠেলে দেয়। তাই একটি সুস্থ্য পরিবার, সুস্থ্য সমাজ তথা সুস্থ্য দেশ গঠনে ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্যের কোন বিকল্প নেই।খাদ্য মানুষের প্রথম মৌলিক চাহিদা। খাদ্যের চাহিদা মিটলেই কেবল অন্যান্য চাহিদা পূরণের প্রশ্ন আসে।‘সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা’ এই দেশে গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছের আপ্তবাক্যের বাস্তবতা এখন আর আমাদের দেশে নেই। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছরই দেশে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। শুধু তাই নয় বর্তমানে দেশে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে জনসংখ্যা। ঠিক তার উল্টোভাবে কমছে ফসলি জমির পরিমাণ। এ অবস্থায় বর্তমান বাড়তি জনসংখ্যার খাদ্যের যোগান দিতে ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়াতে হচ্ছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি প্রযুক্তি ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের মাধ্যমে এখন অল্প জমিতে অধিক খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি কিছুতেই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি সকল পদক্ষেপই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়টিই সরকারকে ভাবতে হবে সর্বাগ্রে। খাদ্যে ভেজাল জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড়ো হুমকি। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ শতাং রোগের সংক্রমণ ঘটে ভেজাল খাদ্য থেকে। কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের নির্বিচারে ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন পর্যায় থেকেই ফল ও ফসলে বিষের সংক্রমণ ঘটে। উৎপাদন পর্যায় শেষে সংরক্ষণের জন্যও ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের প্রিজারভেটিভ। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এসব রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত খাদ্যকে কোনো মতেই নিরাপদ খাদ্য বলা চলে না। এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেকে ক্রমশ অসুস্থতার দিকে চলে যান। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণের মতে, ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে হার্ট, কিডনি, ফুসফুসসহ মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রতি ১০ জন মানুষের মাঝে একজন অনিরাপদ খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সীরা, অপেক্ষাকৃত কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ এই সমস্যার প্রধান শিকার। ভোগ্যপণ্য বা খাদ্যদ্রব্য দুইভাবে অনিরাপদ হতে দেখা যায়। প্রথমত উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ভোগ্যপণ্যকে অনিরাপদ করে তোলা হয়। দ্বিতীয়ত বিষাক্ত উপাদান দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করে খাদ্যকে অনিরাপদ করে তোলা হয়। ফলে এখন নিরাপদ খাদ্য পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। উন্নতবিশ্বেও খাদ্য উৎপাদনের জন্য কীটনাশক বা রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের প্রিজারভেটিভ। তবে সঠিক অনুপাতে ব্যবহারের ফলে তা মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে না। বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিংবা খাদ্যদ্রব্যে প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক অনুপাত ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা খুব কমই মানা হয়। এর প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, এসব ব্যবহার বা প্রয়োগের দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তাদের বেশিরভাগই সঠিক অনুপাত ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সম্বন্ধে অজ্ঞ। এ সমস্যা সমাধানের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা খুবই জরুরি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কিংবা এ জাতীয় সরকারি কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করে উৎপাদক ও বাজারজাতকারীদেরকে কার্যকর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। খাদ্য দ্রব্য সঠিক নিয়মে ও সঠিক অনুপাতে রাসায়নিক বা প্রিজারভেটিভ প্রয়োগ না করলে বিষয়টিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা বা খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হওয়া যেমন জরুরি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা তার চেয়ে অধিক জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে দুষিত খাবার খেয়ে সারাবিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়। এসব অসুস্থ লোকদের মধ্যে থেকে মারা যায় প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ। দেশের ছাত্রাবাস কিংবা আবাসিক হোটেলে খাবার খেয়ে গণহারে অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রচার হতে দেখা যায়। পরীক্ষা করে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে এ ধরনের অসুস্থতার ঘটনা ঘটে। মানবদেহে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করার জন্য ফল খাওয়া জরুরি। কিন্তু বর্তমানে আমদানিকৃত ফল ও দেশি ফল-দুটোই অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য সচেতন অনেক মানুষ এখন বাধ্য হয়ে ফল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। মাছে ব্যাপক মাত্রায় ফরমালিন ব্যবহারের ফলে এদেশের মানুষের আমিষের প্রধান উৎস মাছও আর নিরাপদ নেই। ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে ব্রয়লার মুরগিকে অস্বাভাবিকভাবে বড়ো করা হচ্ছে। ভ্যাকসিন দিয়ে গরু মোটা তাজা করা হচ্ছে। হরমোন প্রয়োগ করে সবজির আকার ও ওজন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কৃষি খামারিদের এ ধরনের অনৈতিক তৎপরতার মূলে আছে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ। অল্প জমিতে অল্প সময়ে অধিক খাদ্য উৎপাদনের যুক্তি দেখিয়ে খাদ্যকেই বিষাক্ত করে তোলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নিরাপদ খাদ্য পাওয়া ভোক্তার একটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। বাণিজ্যিক স্বার্থে কোনো উৎপাদনকারী কিংবা ব্যবসায়ী ভোক্তাকে সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেন না। এ ব্যাপারে সরকারের ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০১৩ সালে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন’ পাশ করেছে। ২০১৫ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, সরকারের এই সংস্থাটি কাজ শুরু করতে পেরেছে ২০২০ সালে। জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু করতে ৫ বছর সময় লেগে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। নিরাপদ খাদ্য আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি প্রত্যাশা করে সাধারণ মানুষ। অনিরাপদ খাদ্য খেয়ে দেশের কোটি কোটি মানুষের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। হৃদরোগ ও ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা এখন এতটাই বেড়ে গেছে যে, এগুলো আজকাল খুব সহজ রোগ বলেই মনে হয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপচেপড়া ভিড়। সরকারি হাসপাতালে ঠাঁই না পেয়ে সাধারণ মানুষ চলে যাচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে এবং অর্জিত টাকা শেষ করে অনেকে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বাঁচার প্রধান উপায় হলো নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করা। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে নিরাপদ খাদ্য? নগরায়ণের ফলে মানুষের কাজের চাপ বেড়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ব্যাপকভাবে বিভিন্ন কল-কারখানা ও অফিস-আদালতের কাজে যুক্ত হয়েছে। এখন বাজার করে ঘরে রান্নার সময়টুকু অনেকের হাতে নেই। সহজ পথ হিসেবে হোটেল-রেস্তোরায় কিংবা রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা টং দোকানে অনেকেই খেয়ে নিচ্ছেন প্রয়োজনীয় খাবার। এসব খাবার কতোটা নিরাপদ ও মানসম্মত সে বিচার কেউ করছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ খাবারের ব্যাপারে সর্বপ্রথম সচেতনতা শুরু হওয়া উচিত নিজেদের ঘর থেকে। কারণ, রান্না করা বা কাঁচা খাবার কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, খাবারের বিষক্রিয়া এড়াতে করণীয় কী, একই খাবার বার বার রান্না করলে খাবারের গুণমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কি না, এরকম আরও নানা বিষয়ে যদি মানুষ শুরু থেকেই সচেতন থাকে, তাহলে অনাকাঙ্খিত বিপদ এড়ানো সম্ভব। খাবার নিরাপদ রাখতে যেসব পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, তার মধ্যে রয়েছে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, খাবার ভালোভাবে রান্না করা, খাবারকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখা এবং রান্নার সময় নিরাপদ পানি ও নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার করা। সরকারের যে সমস্ত সংস্থা বা যারা বিভিন্ন অনুমতি দিয়ে থাকে, তাদেরকে ঠিকমত কাজ করতে হবে। যদি কোনও ক্রেতার কোনও খাবারকে অনিরাপদ মনে হয়, তবে তারা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অফিসে সরাসরি এসে কিংবা ইমেইলে অভিযোগ জানাতে পারে। তাছাড়া, সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেয়া বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তাদের ফোনেও অভিযোগ জানাতে পারবে। এ জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার আমাদের সচেতনতা। নিরাপদ খাদ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। পর্যাপ্ত খাদ্য যোগানের প্রচেষ্টায় দেশ অনেকটা দূর এগিয়েছে। জমিতে কীটনাশকের প্রয়োগ কমিয়ে সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই আগামী লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভোক্তাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা সচেতন না হলে শুধু আইন করেও খাদ্যপণ্য ভেজালমুক্ত করা সম্ভব নয়। ভেজাল রুখতে হলে মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই ভোক্তা। উৎপাদক-ব্যবসায়ী থেকে ভোক্তাদের সবার সচেতনতার বিকল্প নেই।

