ঢাকাSunday , 20 October 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ট্রাইব্যুনালের নতুন অধ্যায়ঃ গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনার বিচার শুরু

Link Copied!

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিই ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম আদেশ। দ্বিতীয় আদেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। পৃথক দুই আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এসব আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আদেশে পরোয়ানাভুক্তদের গ্রেপ্তার করে ১৮ নভেম্বরের মধ্যে হাজির করতে বলা হয়েছে। এর আগে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তাদের গ্রেপ্তারের আবেদন করেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, বি এম সুলতান মাহমুদ, মো. সাইমুম রেজা তালুকদার সঙ্গে ছিলেন।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বছরের মধ্যেই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করেন। এবার জুলাই-আগস্ট গণহত্যার অভিযোগে এ ট্রাইব্যুনালেই বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে শেখ হাসিনা, তার দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও তার সরকারের অনুসারীদের বিরুদ্ধে।শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের ছাড়াও পরোয়ানা জারি হওয়াদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, শেখ হাসিনার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য মোহাম্মদ এ আরাফাত, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আনিসুল হক, দীপু মনি, আ ক ম মোজাম্মেল হক, জুনাইদ আহমেদ পলক, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ, পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকার, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক র‌্যাব ডিজি হারুন অর রশিদ, সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার নির্দেশদাতা, উসকানিদাতা ও নির্দেশ পালন করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া শেখ হাসিনার দেড় দশকের বেশি শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, আয়নাঘর, তথ্যপ্রযুক্তি আইনে হওয়া মামলা, দুর্নীতি ইত্যাদির পরিসংখ্যানসহ নানা তথ্য তুলে ধরা হয়। চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্তে গণহত্যার প্রাথমিক অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। চিফ প্রসিকিউটর আদালতে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্তে গণহত্যার প্রাথমিক অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আসামিরা প্রভাবশালী। এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে আসামিদের লোকজন বিভিন্ন পজিশনে আছেন। তাই আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া মামলার তদন্তকাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করছি। এক পর্যায়ে আদালত জানতে চান, রাষ্ট্রীয়ভাবে আসামিদের অবস্থান জানেন কি না। জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, না। তারপর আদালত চিফ প্রসিকিউটরের আবেদন মঞ্জুর করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। আর ১৮ নভেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ রেখে এ সময়ের মধ্যে আসামিদের আদালতে হাজির করতে বলেন। পরে ট্রাইব্যুনাল থেকে বেরিয়ে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছিলাম। আদালত আমাদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। একটি আবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরেকটি আবেদনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ১৮ নভেম্বরের মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করে এ আদালতে উপস্থিত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ১৮ নভেম্বর পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হলেই ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, সাংবাদিকরা তাদের নাম জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এ অপরাধীদের অনেকে এখনো রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। সে কারণে তাদের সবার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। আমরা নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে এসব নাম প্রকাশ করছি না।
এর আগে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহতদের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করা হয়। গণহত্যার অভিযোগে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতা, পুলিশের তৎকালীন আইজিসহ বেশ কয়েকজন সদস্য, র‌্যাবের তৎকালীন ডিজি, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে। প্রায় সব অভিযোগেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটনার তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে গণহত্যার অভিযোগগুলোয়। এ ছাড়া এ সময়ে আহত হয়ে পরে বিভিন্ন তারিখে নিহতরাও এর আওতায় থাকবেন। ঘটনার স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশকে। অপরাধের ধরনে বলা হয়েছে, প্রধান আসামির নির্দেশ ও পরিকল্পনায় অন্য আসামিরা দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী সাধারণ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে তাদের সমূলে বা আংশিক নির্মূল করার উদ্দেশ্যে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেন।
পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লব দমাতে এবং ক্ষমতায় থাকতে দেশের ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা চালিয়েছেন। এ সময়ে দেড় হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে হত্যা এবং বিশ হাজারের বেশি মানুষকে চিরতরে পঙ্গু ও অন্ধ করা হয়েছে। এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বহু ছাত্র-জনতা চিকিৎসাধীন এবং কেউ কেউ এখনো মৃত্যুবরণ করছে। এই গণহত্যা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মধ্যে তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। আশ্রয় নিতে হয় তার প্রভু মোদির ভারতে। এখনো তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। সেখানে তার অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ভারত তাকে ট্রাভেল পাস দিয়ে রেখেছে এবং গত বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র দফতর থেকে বলা হয়েছে, তার নিরাপত্তার স্বার্থে ভারত আশ্রয় দিয়েছে। ভারত কেন তাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে, তা বুঝতে বাকি থাকে না। তাকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চক্রান্তের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য রেখে দিয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি, ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গঠিত প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ ও অকার্যকর করে দিতে শেখ হাসিনা ও মোদি যৌথভাবে বিভিন্ন আন্দোলন করিয়েছেন। একের পর এক ষড়যন্ত্র করেছেন এবং তা অব্যাহত রেখেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার সকল ষড়যন্ত্র অত্যন্ত সফলভাবে মোকাবেলা করেছে এবং করছে। শেখ হাসিনাকে যদি দেশে ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে দেশের বিরুদ্ধে তার ও মোদির ষড়যন্ত্র যে চলতে থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে তাকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা অত্যন্ত জরুরি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর গত ১৭ অক্টোবর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, আদালতের নির্দেশে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে যা প্রয়োজন, তাই করা হবে। দেশের মানুষও চায়, ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। এক্ষেত্রে, কোনো রকমের শৈথিল্য ও ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারেরও অগ্রাধিকারমূলক প্রতিশ্রুতি হচ্ছে, জুলাই-আগস্ট গণহত্যার দ্রুত বিচার করা। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ বিচার কাজে অনেক বাধা-বিপত্তি ও গতিহীন করার ষড়যন্ত্র থাকবে। শেখ হাসিনা ও মোদির দোসররা এখনো আদালত ও প্রশাসনসহ সর্বত্র ঘাপটি মেরে রয়েছে। তারা চাইবে যে কোনো উপায়ে বিচারকাজে বাধা সৃষ্টি করতে। ভারত শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে সব ধরনের চক্রান্ত করবে। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারকে দৃঢ় ও সচেতন থাকতে হবে।
শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের যে বিচার শুরু হয়েছে, তার মধ্যে যাতে কোনো ধরনের ফাঁকফোকর না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে চিফ প্রসিকিউটরসহ তদন্ত কাজে নিয়োজিতদের সতর্ক থাকতে হবে। অতীতে এই ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধপরাধ ও মানবাতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচার কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তা স্মরণে রেখে বিচার কার্যক্রমকে স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত রাখতে হবে। কেউ যাতে বলতে না পারে, এ বিচার ক্যাঙ্গারু কোর্টে বা ক্যামেরা ট্রায়ালে হচ্ছে। ইতোমধ্যে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এই বিচার কাজ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার কথা বলেছেন। এ বিচার কীভাবে হচ্ছে, সে সম্পর্কে যাতে দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহল জানতে পারে, এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরাও চাই, আইনের নিরিখে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। এই বিচার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা।