সিলেট প্রতিনিধি : বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সরকারি মালিকানাধীন দেশের সবচেয়ে পুরনো ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সার কারখানাটি বন্ধ করে দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ক্যামিকেল ইন্ড্রাস্টিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। অব্যাহত লোকসানের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি চালু হলে কাঁচামাল ও গ্যাসের সংকট দেখা দেবে- এমন আশঙ্কা থেকেই কারখানাটি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।
এ কারণেই গত বছরের জুলাই মাসে কারখানার ট্রান্সফর্মার বিকল হয়ে উৎপাদন বন্ধ হওযার পর আর চালু হয়নি। জুলাইয়ের পর থেকেই বন্ধ রয়েছে সার কারখানাটি। ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারাখানা চালু না রাখার ব্যাপারেও বিসিআইসি চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার গড় উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩শ টন। কিন্তু ধীরে ধীরে যন্ত্রপাতি পুরনো হয়ে যাওয়ায় এবং অন্যান্য সমস্যার কারণে এ কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ৭০ টনে এসে দাঁড়িয়েছে।
২০১৪ সালের জুলাইয়ে কারখানাটির প্রধান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্রান্সফর্মার বিকল হয়ে পড়ে। ফলে কারখানার উৎপাদন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। বিকল হওয়া ট্রান্সফর্মার মেরামতের জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হলেও মেরামত হয়ে সেটি আর ফিরে আসেনি সার কারখানায়। বিসিআইসি ট্রান্সফর্মার মেরামতের জন্য ৭০ লাখ টাকা না দেয়ায় সেটি আর মেরামত হয়নি। টাকা ছাড় না দেয়ার পেছনে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়ার বিসিআইসির পরিকল্পনা কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা যায়, কারখানাটি চালু থাকা অবস্থায় প্রতি টন ইউরিয়া উৎপাদনে খরচ পড়তো প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। কিন্তু প্রতি টন সার সরকার নির্ধারিত ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হতো। অর্থাৎ প্রতি টনে প্রায় ২২ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হতো। এরকম অবস্থায় কারখানাটি পুরোদমে চালু থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা লোকসান দিতে হতো। অথচ দেশের অন্যান্য সার কারখানায় প্রতি টন সার উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ৭ হাজার টাকার মতো। পুরনো যন্ত্রপাতি আর মান্ধাতার আমলের প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণেই ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় এই বাড়তি খরচ হতো।
ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার এই অব্যাহত লোকসানের ফলেই এটি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। এছাড়া এই কারখানার পাশেই শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি চালু হওয়ার পথে। এটি চালু হলে তখন ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার সংকট আরো বাড়বে। এমন আশঙ্কায় বন্ধ হওয়ার পথে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা।
জানা যায়, ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার পাশেই নির্মিত হচ্ছে শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি। গড়ে প্রতিদিনি এক হাজার ৭শ ৬০ টন ইউরিয়া ও এক হাজার টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনে সক্ষম এই ফ্যাক্টরি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ৪শ’ ৯ কোটি টাকা। আগামী জুনে উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই চলছে কারখানাটির নির্মাণ কাজ। এই কারখানার নির্মাণ কাজ শেষে উৎপাদনে যাওয়ার পরই ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা আসতে পারে।
এদিকে কারখানাটি আর চালু হচ্ছে না, এমনটা ধরে নিয়েই এখানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে অন্যত্র বদলি করে দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার প্রায় ৫০ ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী পার্শ্ববর্তী শাহাজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিতে বদলি হয়ে গেছেন।
এ ব্যাপারে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার সিবিএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুল মালিক চৌধুরী বলেন, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিসিআইসিকে লিখিতভাবে প্রস্তাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বদলি হয়ে যাচ্ছেন। যারা রয়েছেন, তাদেরকেও অন্যত্র বদলি করার পক্রিয়া চলছে।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোলায়মান আহমদ বলেন, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ কারখানা চালু রাখলে লোকসান বইতে হবে। তাই এ কারখানা চালু রাখার চেয়ে বন্ধ করে দেয়াই ভালো। তবে বিষয়টি নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

