নিজস্ব প্রতিবেদক : খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ‘কারেন্ট পোকা’র আক্রমণে ঝলসে যেতে বসেছে কৃষকের স্বপ্ন।
খুলনার পর এবার বাগেরহাটেও ছড়িয়ে পড়েছে ‘কারেন্ট পোকা’র ভয়াবহতা। এ জেলার রামপাল উপজেলার মল্লিকেরবেড় গ্রামের প্রায় এক হাজার বিঘা জমির রোপা আমন ধানে কারেন্ট পোকার (বাদামী গাছ ফড়িং) আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এ পোকার আক্রমণে ধান গাছ পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এলাকার কৃষক।
এদিকে, কৃষকরা সর্বশান্ত হলেও উপজেলা কৃষি অফিস এ বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করছেন। লোক দেখানো খোঁজ খবর দেওয়ার দাবি করলেও কৃষি কর্মকর্তারা সময়মত কৃষকের পাশে দাঁড়াননি, এমনকি ক্ষতিগৃস্ত কৃষকদের কোন তালিকাও তারা করেননি বলে স্বীকার করেছেন উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষ্ণা রাণী মণ্ডল। ফলে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রামপাল উপজেলার মল্লিকেরবেড় গ্রামে প্রতি বছর নাবীতে রোপা আমন ধানের চাষ করা হয়। এ বছর হঠাৎ করে কারেন্ট পোকার ব্যাপক আক্রমণে ধান গাছ শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। কারেন্ট পোকা ধান গাছের গোড়ার দিকে দলবদ্ধ অবস্থায় থেকে গাছের কাণ্ডের ও পাতার খোলের রস শুষে খেয়ে ফেলছে। ফলে ধান গাছ পুড়ে খড়ের মতো হয়ে গেছে। গাছে কোনো ফলনও হচ্ছে না। কারেন্ট পোকা (বাদামী গাছ ফড়িং) দেখতে ছোট ছোট বাদামী রঙের।
মল্লিকেরবেড় গ্রামের কৃষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক হাওলাদার জানান, তিনি এবছর আট বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান চাষ করেছেন। কারেন্ট পোকার ব্যাপক আক্রমণে তার ধান গাছ পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো ফলন পাওয়া যাবে না।
তিনি জানান, তার মতো কৃষক আব্দুল মালেকের ১৮ বিঘা জমির ধান একেবারে সাদা হয়ে গেছে, ধান কাটতে মাঠে কাচি নিয়ে যাওয়া লাগবে না। বয়োজ্যেষ্ঠ এ কৃষকের ভাষায় ‘কারেন্ট পোকা আল্লাহর গজব’। এ বিষয়ে তিনি মল্লিকেরবেড় কৃষি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমানকে জানালেও তিনি কোন পদক্ষেপ নেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিষয়টি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বরদেরকেও জানানো হয়েছে।
একই গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হোসেন শরীফ, মামুন শরীফ, হারুন হাওলাদার, আব্দুল হামিদ, বাবুল হাওলাদার ও মুকুল হাওলাদারসহ অন্যান্য কৃষকদের সূত্রে জানা গেছে, মল্লিকেরবেড় বিলে তাদের চাষকৃত রোপা আমন ধান কারেন্ট পোকার আক্রমণে পুড়ে গেছে। ঝলসে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ধান গাছ। এ ধান গাছ থেকে কোনো ফলন পাওয়া যাবে না। এতে তারা সর্বশান্ত হয়ে গেছেন বলে জানান।
কৃষকরা আরো জানান, মল্লিকেরবেড় গ্রামে প্রায় এক হাজার বিঘা জমির রোপা আমন ধান কারেন্ট পোকার আক্রমণে পুড়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকেরা আর কাঁচি নিয়ে মাঠে ধান কাটতে যেতে পারবেন না এবং কোনো ফলন পাবেন না। মাঠের পর মাঠ ধান গাছ দ্রুত ঝলসে যাওয়ার দৃশ্য দেখে কৃষকের স্বপ্নও ঝলসে যাচ্ছে যেন। এতে এ গ্রামের কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সর্বশান্ত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেন, মল্লিকেরবেড় কৃষি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান এ এলাকায় আসেন না এবং কৃষকদের কোনো পরামর্শও তিনি দেন না। এমনকি মল্লিকেরবেড় গ্রামে আমন ধানে কারেন্ট পোকার ব্যাপক আক্রমণে আমন ধান পুড়ে নষ্ট হবার পরও তার দেখা মিলছে না।
এদিকে, মল্লিকেরবেড় গ্রামে কারেন্ট পোকার আক্রমণে আমন ধান পুড়ে গেলেও রামপাল উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষ্ণা রাণী মণ্ডল এ এলাকা পরিদর্শনে আসেননি। এমনকি কোনো কৃষি কর্মকর্তাকেও মাঠ পর্যায়ে কৃষকের পাশে দেখা যায়নি। ফলে তাদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা পাননি কৃষক। এতে মল্লিকেরবেড় গ্রামে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। রোপা আমন ধানে সর্বনাশা কারেন্ট পোকার ভয়াবহ আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত মল্লিকের বেড় গ্রামের কৃষকেরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এ এলাকা পরিদর্শনপূর্বক ক্ষতিপূরণের আবেদন জানিয়েছেন।
রামপাল উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষ্ণা রাণী মন্ডল এ প্রতিবেদককে বলেন, তার উপজেলায় কারেন্ট পোকা ও বুলবুলের কারণে তিন হেক্টরের মত জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণেও ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কোন তালিকা করা হয়নি। তিনি নতুন যোগদান করায় এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতেও অপারগতা প্রকাশ করেন।
তবে, মল্লিকের বেড় এলাকায় এক হেক্টর জমির ধান নষ্ট হওয়ার কথা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান তাকে জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
কারেন্ট পোকার আক্রমণের বিষয়টি স্বীকার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাগেরহাটের উপ-পরিচালক রঘুনাথ কর জানান, আক্রমণকৃত ফসলের ওপরে খোসা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ভিতরে ধান নেই। রামপালে কি পরিমাণ জমির ধান নষ্ট হয়েছে- সেটি তথ্য না দেখে বলা যাচ্ছে না।
তবে, পোকা দমন, প্রতিরোধ ও বোরো’র ক্ষতি এড়াতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপরন্তু কৃষকরা কৃষি কর্মকর্তাদের কথা শোনে না বলেও পাল্টা অভিযোগ করেন তিনি। এমনকি কথা না শোনা কৃষকদের তালিকাও আগামীতে তিনি সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করবেন বলেও জানান।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি কারেন্ট পোকার (বাদামী গাছ ফড়িং) আক্রমণে খুলনার রূপসা উপজেলার জাবুসার পশ্চিম পাড়া বিলের প্রায় পাঁচশ বিঘা জমির রোপা আমন ধান গাছ লাল হয়ে শুকিয়ে মরে গেছে। এছাড়া খুলনার বটিয়াঘাটার খারাবাদ, ডুমুরিয়া ও দাকোপসহ বিভিন্ন এলাকায় আমনে পোকার আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। ফলে কৃষকরা আমন ঘরে তুলতে পারবেন কি-না এ আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

