বিশেষ প্রতিবেদন : এক সিমেই সব মোবাইল টেলিফোন অপারেটরের সুবিধা বা এমএনপিএস সেবা চালু করার ক্ষেত্রে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তৈরি এক সার-সংক্ষেপে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নতুন করে কয়েকটি বিষয় জানতে চেয়েছেন। আর এ কারণে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এখনই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারছে না।
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি চুড়ান্ত করতে কিছু সময় লাগবে। অর্থমন্ত্রী যে বিষয়গুলো জানতে চেয়েছেন তা নিশ্চিত হওয়ার আগে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া শেষ হলেও পুরো বিষয়টি চুড়ান্ত হবে নিলামের মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ সংক্রান্ত ফাইলটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব গত ২৩ মে অর্থমন্ত্রীর জন্য একটি সার সংক্ষেপ তৈরি করে তা অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য দেন। অর্থমন্ত্রী একই দিন সার-সংক্ষেপে কয়েকটি বিষয় জানতে চেয়ে নোট দেন।
সূত্র জানায়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থমন্ত্রীর নোটের জবাব আসার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রীর জন্য তৈরি সার-সংক্ষেপে বলা হয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বিটিআরসি কর্তৃক প্রণীত ‘রেগুলেটরী অ্যান্ড লাইসেনিং গাইডলাইনস ফর মোবাইল নাম্বার পোর্টাবিলিটি সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ’ এর আর্থিক বিষয় সংশ্লিষ্ট সংশোধন অংশটিতে অর্থ বিভাগের পুনঃসম্মতি চেয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে প্রেরিত বর্তমান প্রস্তাবে উল্লেখ রয়েছে যে, মোবাইল নম্বর পোর্টাবিলিটি সার্ভিস (এমএনপিএস)’ লাইসেন্স নিলামের মাধ্যমে প্রদানের জন্য ইতোপূর্বে রেগুলেটরি ও লাইসেন্সিং গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছিল। বর্তমানে উক্ত লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে নিলাম প্রক্রিয়া অনুসরনের পরিবর্তে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুসরনের বিষয়ে বিটিআরসি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। অর্থ বিভাগ কর্তৃক ইতোপূর্বে সম্মতি প্রদানকৃত ফি অ্যান্ড সার্ভিসেস-এর হার এবং গাইড লাইন সংশোধন প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
গাইড লাইনে অ্যাপলিকেশন ফি আগে প্রস্তাব করা হয়েছিল এক লাখ টাকা। নতুন প্রস্তাবে সেটি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। লাইসেন্স অ্যাকুইজেশন ফি নির্ধারন করার ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল এক কোটি টাকা ভিত্তি মূল্য রেখে এটি নিলামের মাধ্যমে নির্ধারন করা হবে। নতুন প্রস্তাবে এটি অকশন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রবর্তন করায় ফি ১০ কোটি টাকায় নির্ধারিত হবে। বার্ষিক লাইসেন্স ফি আগে ২০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেটি বাড়িয়ে ২৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রস রেভিনিউ শেয়ারিং প্রথম বছর শূন্য শতাংশ। দ্বিতীয় বছর থেকে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। নতুন প্রস্তাবে সেটি প্রথম বছর শূণ্য শতাংশ অপরিবর্তিত রেখে দ্বিতীয় বছর থেকে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া অফার সিকিউরিটি মানি আগের প্রস্তাবে ছিল না। নতুন প্রস্তাবে এটি এক কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাংক গ্যারান্টি আগের প্রস্তাবে এক কোটি টাকার কথা বলা হয়েছিল। নতুন প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা করা হয়েছে। সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড আগে ছিল না। নতুন প্রস্তাবে দ্বিতীয় বছর থেকে বার্ষিক অডিটের গ্রস রেভিনিউর ১ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে।
সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, এমএনপিএস গাইড লাইনসে বর্ণিত ‘ফি ও চার্জ’ সমূহ নির্ধারনের ফলে অপারেটরদের অর্জিত আয়ের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সরকারের রাজস্ব হিসেবে বিটিআরসিকে প্রদানের প্রস্তাব করায় সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইতোপূর্বে অর্থ বিভাগের সম্মতি দেওয়া হয়েছে। সংশোধন প্রস্তাবে অপারেটরদের অর্জিত আয়ের ১৫ শতাংশ সরকারের রাজস্ব হিসেবে বিটিআরসিকে প্রদানের বিধান রাখা হচ্ছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় আরো বৃদ্ধি পাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবে অনুমোদন না দিয়ে একটি নোট দেন। এতে তিনি বলেন, সিকিউরিটি মানি এক কোটি টাকা সম্ভবত চুক্তি শেষে রিফান্ডেবল। এর ১০ কোটি টাকার ব্যাংক ড্রাফট ও সম্ভবত একইভাবে রিফান্ডেবল। তাই ছয়টি ক্ষেত্রে সরকার যা পাবে তার দুটি অ্যামাউন্ট চুক্তি শেষে ফেরত দিতে হবে বলে মনে হয়। সব মিলে লাইসেন্স দেবার সময় আমরা পাব ১০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রতি বছর আমরা পাব ২৫ লাখ টাকা এবং গ্রস আয়ের থেকে ১৫ শতাংশ। সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড- এর ব্যয় কে করবে এবং কীভাবে তা হবে ? আমার বুঝাটা কি যথাযথ ? বার্ষিক গ্রস রেভিনিউ কত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের কাছে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর চেয়েছেন।
ভয়েস কল ও ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, দুর্বল নেটওয়ার্ক কাভারেজ, নেটওয়ার্ক সমস্যা, ভয়েস কলের নিম্নমান, গ্রাহক সেবায় অসন্তুষ্টি মেটাতে এমএনপি সেবা চালুর উদ্যোগ নেয় বিটিআরসি। অন্যদিকে টুজি লাইসেন্স নবায়ন গাইডলাইনেও এমএনপি সেবার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, লাইসেন্সধারী অপারেটর এমএনপি চালু হলে এই সেবা বাস্তবায়ন করবে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ৫টি দেশের ৫ অপারেটর মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে এমএনপি সেবা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, লেবানন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি। মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, একাধিক দেশে এমএনপি সেবা দিলে এবং তার গ্রাহক এক কোটি হলে সে প্রকৃত পক্ষেই এমএনপি অপারেটর। পশ্চিমা দেশের কোনও অপারেটর হলে তার পক্ষে এক দেশে এক কোটি গ্রাহক পাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে তাকে অবশ্যই এমএনপি অপারেটর হতে হবে।
সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ১৩ জুন বিটিআরসির দেওয়া এক নির্দেশনায় মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে পরবর্তী ৭ মাসের মধ্যে এমএনপি চালু করতে বলা হয়। নির্দেশনায় এমএনপি চালুর জন্য ৩ মাসের মধ্যে সব অপারেটরকে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করতে বলা হয়। কনসোর্টিয়াম পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে এমএনপি সিস্টেম গড়ে তুলবে যা কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজ করবে। বেঁধে দেওয়া সময় ২০১৪ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝিতে শেষ হয় কিন্তু চালু হয়নি এমএনপি। পরবর্তী সময়ে এমএনপি চালুর জন্য একই বছরের মে মাসে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেয় বিটিআরসি। ওই কমিটিকে এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কমিটি কাজের জন্য কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে আগস্ট মাসে প্রতিবেদন দেয়। সেটি ছিল অন্তবর্তীকালীন প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদনে এমএনপি চালু করতে ৫ বছর সময় প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।

