মাগুরা প্রতিনিধি : মাগুরার শালিখা উপজেলার সীমাখালীতে চিত্রা নদীর ওপর প্রায় ৩৭ বছর আগে নির্মিত ব্রিজটি সাড়ে তিন মাস আগে ভেঙে পড়ে। তিন মাসেরও বেশি সময় পার হলেও সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে বিকল্প বেইলি ব্রিজ নির্মাণ কাজ এখনো শেষ হয়নি।
এ কারণে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলার যোগাযোগ রক্ষাকারী গুরুত্বপুর্ণ মাগুরা-যশোর মহাসড়কটিতে বন্ধ রয়েছে সরাসরি যান চলাচল। ফলে এ সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রী সাধারণের সীমাহীন দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে চলতি বর্ষা মৌসুমে বাঁশের সাঁকো দিয়ে নদী পারাপার হওয়া অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা।
তবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও সড়ক বিভাগ বলছে, জনদুর্ভোগ লাঘবে আসন্ন ঈদের আগেই বেইলি ব্রিজ নির্মাণ কাজ শেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাযিক করা হবে। এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি দুটি পাথরবোঝাই ট্রাক ও একটি কার্ভাডভ্যান নিয়ে মাগুরা-যশোর মহাসড়কের এই ব্রিজটি ভেঙে পড়ে। পরে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে দেড় মাস পর ২৪ মার্চ শুরু করা হয় সংযোগ সড়ক ও বেইলি ব্রিজ নির্মাণ কাজ।
কার্যাদেশে বেইলি ব্রিজ নির্মাণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৫ দিন। পয়তাল্লিশ দিনের মধ্যে বেইলি ব্রিজের নির্মাণের নির্দেশনা থাকলেও গত সোমবার (মে ২৮) সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।
এদিকে বেইলি ব্রিজ নির্মাণের এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা ও বেনাপোল থেকে রাজধানীমুখী কিংবা দেশের বিভন্ন অঞ্চল থেকে এসব জেলা ও এলাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা যানবাহনগুলো বিকল্প রাস্তা হিসেবে মাগুরা-ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে এসব যানবাহনগুলোকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এই কারণে এইসব রুটের যাত্রীসাধারণ পড়ছেন দুর্ভোগে।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান মোল্যা বলেন, বেইলি ব্রিজ নির্মাণ কাজ চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। মাঝে কিছুদিন কাজ বন্ধও ছিল। এখন মাত্র তিন-চারজন শ্রমিক ঝালাইয়ের কাজ করছে। এভাবে চললে আগামী দুই মাসেও ব্রিজের কাজ শেষ হবে না।
অপর বাসিন্দা ধীরেন্দ্রনাথ রায় বললেন, দূরপাল্লার যাত্রীদের কথা না হয় বাদই দিলাম। যারা প্রতিদিন যশোর থেকে মাগুরায় কিংবা মাগুরা থেকে যশোর গিয়ে অফিস করেন বা জরুরি প্রয়োজনে এ সড়ক দিয়ে বাধ্য হয়ে যাতায়াত করেন, তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে বাঁশের সাকো পার হতে গিয়ে নদীর দুই পাড়ে খাড়া ঢাল বেয়ে ওঠা-নামা করতে গিয়ে অনেকেই পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছেন। এ অবস্থায় সুযোগ সন্ধানীরা যাত্রীদের একটি ব্যাগ পার করতে একশ’ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দ্রুত ব্রিজ তৈরি না হলে সামনে ঘন বৃষ্টি ও ঈদে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে।
আরিফুল হক নামে এক ব্যাংকার জানান, তিনি নিয়মিত মাগুরা থেকে যশোর অফিস করেন। প্রায় চার মাস ধরে নসিমন, করিমনে করে মাগুরা থেকে যশোর যাতায়াত করছেন। সীমাখালীতে বাঁশের সাঁকো দিয়ে নদী পার হচ্ছেন। গোটা বিষয়টা তার কাছে অত্যন্ত দুর্ভোগ বলে মনে হয়। বেইলি ব্রিজ নির্মিত হলেও দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমতো।
শালিখা উপজেলার তালখড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, সেতু ভেঙে পড়ার ফলে ঢাকা-খুলনা, বেনাপোল, মোংলা বন্দর ও সাতক্ষীরা নয়; দক্ষিণ বঙ্গের সঙ্গে এমনকি ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এতে সারা দেশের মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। জনসাধারণের দুর্ভোগ লাগবে তিনি সীমাখালী ব্রিজের নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানান।
গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কে বেইলি ব্রিজ নির্মাণে বিলম্বের বিষয়ে আলাপকালে মাগুরা জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ইমদাদুর রহমান বললেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও নানা ধরনের জটিলতার কারণে ব্রিজ নির্মাণ কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। মহাসড়কে এই ধরনের ব্রিজ ভেঙে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প বেইলি ব্রিজ নির্মাণের জন্য সড়ক বিভাগের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারযোগ্য ফান্ড থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা সম্ভব নয়।
বেইলি ব্রিজ নির্মাণে দীর্ঘসূত্রিতার ব্যাপারে জানতে চাইলে নিয়োজিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার তরিকুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেন, তারা সিডিউল অনুযায়ী সঠিক নিয়মে কাজ করছেন। ঈদের আগেই নির্মাণ কাজ শেষ হবে। তবে কথা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, বেইলি ব্রিজের ৭০ ভাগ কাজ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত তারা কোনো অর্থ বরাদ্দ পাননি।
বেইলি ব্রিজ নির্মাণ কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাগুরা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূরন্নবী তরফদার বলেন, কাজ সঠিক নিয়মে চলছে। তবে নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে ব্রিজ নির্মাণ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই বেইলি ব্রিজ নির্মাণ কাজ শেষ করে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সচল করতে পারবেন বলে তিনি দাবি করেন।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ৬০ ভাগ কাজ শেষ হলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে এখন পর্যন্ত কোনো বিল দেওয়া সম্ভব হয়নি।

