নিজস্ব প্রতিবেদক : অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাল আবদুল মুহিতের ৮৪তম জন্মদিন ২৫ জানুয়ারি। ১৯৩৪ সালের এই দিনে সিলেটে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
৮৪তম জন্মদিন উপলক্ষে মঙ্গলবার সচিবালয়ে তাকে আগাম শুভেচ্ছা জানানো হয়। এ সময় তার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভূতপূর্ব অনুভূতি। যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় আমি এখনো কর্মক্ষম আছি, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী থাকতে পারে। আমি সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান? এ প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, ‘আমি দারিদ্র্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত, সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ দেখতে চাই। সারা জীবন এ উদ্দেশ্য সামনে রেখেই কাজ করেছি। আমি আশা করছি ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন লালিত স্বপ্নের দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে জাতির সেবা করার যে মহান সুযোগ করে দিয়েছেন, সে জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে আমার নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা রইল।’
পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা, তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের নেতা অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের দ্বিতীয় পুত্র তিনি। তার মা সৈয়দ শাহার বানু চৌধুরীও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
মুহিত ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ পাস করেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সেন্ট্রাল সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগদানের পর মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তিনি পরিকল্পনাসচিব এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন।
তিনি পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ও উপসচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন। ওয়াশিংটন দূতাবাসে তিনি প্রথম কূটনীতিক, যিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ১৯৭১-এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেন।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে মুহিত সবিশেষ পারদর্শী। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় তিনি একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব।
১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে তিনি অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদে কাজ শুরু করেন। ১৯৮২-৮৩ সালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন।
লেখক হিসেবেও আবুল মাল আবদুল মুহিত সমান পারদর্শী। প্রশাসনিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে তার ৩৪টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বুধবার তার জন্মদিন উপলক্ষে স্মৃতিময় কর্মজীবন শীর্ষক ৩৫তম গ্রন্থ প্রকাশ পাবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনে (বাপা) তিনি একজন পথিকৃৎ এবং বাপার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।
স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়।
স্ত্রী সৈয়দ সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ, বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং কনিষ্ঠ পুত্র সামির মুহিত শিক্ষকতা করেন।

