নিজস্ব প্রতিবেদক : অপরহরণ করার পর মুক্তিপণ আদায়ে নগদ টাকার পরিবর্তে এখন মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস বিকাশের সুবিধা নিচ্ছে অপহরণকারীরা।
বিকাশে লেনদেন প্রথাগত ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে বলে এবং বায়োমেট্রিক করার পরও সিমগুলো এখনো অরক্ষিত থাকায় মূল অপরাধীরা পর্দার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এজন্য মোবাইল ব্যাংকিংকে আরো কড়া নজরদারির মধ্যে আনার কথা বলছেন অনেকেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যেকোনো ব্যক্তির পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের কপি দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস চালু করা যায়। কারণ যিনি বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলে দেন তিনি এসব ভেরিফিকেশন করেন না। তা ছাড়া, ব্যাংকেও ডকুমেন্টে ভেরিফিকেশন করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে ভুয়া পরিচয়পত্র বা ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে বিকাশ, রকেট, ইউক্যাশসহ অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়। এজেন্টদের কাছ থেকে সহজে টাকা, ক্যাশ আউট করা এবং দেশের সব জায়গায় এ ব্যাংকিংয়ের সুবিধা থাকায় বিভিন্ন অপরাধী চক্র বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে। বিশেষ করে অপহরণকারী চক্র মুক্তিপণের টাকা বিকাশের মাধ্যমেই নিচ্ছে।
সম্প্রতি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র্যাব) অভিযান চালিয়ে আন্তর্জাতিক অপহরণকারী চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে গত ২২ নভেম্বর টঙ্গীর তুরাগ থানা এলাকা ও রাজধানীর উত্তরা থেকে পৃথক অভিযানে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। বিকাশে টাকা লেনদেনের নম্বরের সূত্র ধরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার ভোরে বিকাশ লেনদেনের সূত্র ধরে র্যাব-১ এবং র্যাব-৩ এর পৃথক অভিযানে আরো পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা আন্তর্জাতিক অপহরণকারী চক্রের সাথে জড়িত বলে স্বীকার করেছে এবং তাদের অন্যান্য নেটওয়ার্কের বিভিন্ন তথ্য জানিয়েছে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং জানায়, অপহরণকারী চক্রের যারা বিদেশে আছে তারা মূল টার্গেট নির্বাচন করে সেখানে অপহরণ করে পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেয়। পরে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে পরিবারের কাছে ফোন করে বিপদের কথা জানাতে বলে। এরপর মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছে বিরাট অঙ্কের টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে মুক্তিপণের টাকা দিতে হয় সরাসরি সাক্ষাৎ ছাড়া। এ জন্য তারা এখন মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশের মাধ্যমের নম্বর দিয়ে দেয়। নম্বরে টাকা পাঠালেই তারা অপহৃত ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয়। বিশেষ ক্ষেত্রে তারা পাসপোর্ট আর ফিরিয়ে দেয় না।
সূত্র জানায়, অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা যেসব বিকাশ নম্বর দেয় তা তাদের নয়। কোনো দোকান থেকে তাদের পরিচিত কোনো এজেন্টের নম্বর অপহৃত পরিবারের সদস্যদের দেয়। টাকা পাঠালে ওই টাকার ওপর একটি বিশেষ কমিশন দেওয়া হয় তাকে। তবে কোনো কোনো সময় কয়েকটি পার্সোনাল নম্বরেও পাঠানো হয়। তবে সেসব অ্যাকাউন্ট ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়ে তৈরি করা। এজন্য মূল অপরাধী পর্দার আড়ালে থেকে যায়। তবে সম্প্রতি মোবাইল ট্রেকিং সিস্টেম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপহরণকারী বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান ভূইয়া বলেন, সম্প্রতি লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে র্যাব জানতে পারে কিছু দুর্বৃত্ত প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশিদের সমন্বয়ে একটি অপহরণকারী চক্র লিবিয়ায় অবস্থানকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের অপহরণ করে নির্যাতন করে। পরে তাদের বাড়িতে ফোনে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ আদায় করে। এ তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব তদন্ত শুরু করে। এর মধ্যে চাঁদপুরের মো. আচান উল্লা (২৮) র্যাব-৩ এর কাছে লিবিয়ায় আন্তর্জাতিক অপহরণকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে আসেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে আরো অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, লিবিয়াস্থ ফরিদপুরের মো. বেলাল মাতুব্বার ওরফে জাকির (৩৩) লিবিয়ায় বাংলাদেশি অপহরণ করে বিকাশের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করেন। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন একই জেলার মো. জাকির মোল্লা (২৩) ও তার বাবা লিবিয়া প্রবাসী মো. হান্টু মোল্লা (৪০)। পরে লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, তারা দেশে রয়েছে। এর ভিত্তিতে ২৭ নভেম্বর ফরিদপুর জেলার সদরপুর থানার উজির খার কান্দি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে বিকাশ ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা (২৫) এবং চক্রের হান্টু মোল্লাকে (৪০) গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের মূল হোতাকে তেজগাঁও এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন র্যাব-১ এর অভিযানে মো. লিটন খাঁন (২৮) ও নুর মোহাম্মদ ওরফে দুলালকে (২৮) গ্রেপ্তার করে।
মিজানুর রহমান বলেন, তারা জিজ্ঞাসাবাদে তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা অপহরণ করে বিকাশের মাধ্যমে মুক্তপণের টাকা আদায় করতেন। তারা জানিয়েছেন, বিকাশের মাধ্যমে টাকা আদায় অনেক সহজ ছিল। বিশেষ করে এর জন্য কোনো জবাবদিহিতার প্রয়োজন পড়ে না।
এদিকে মোবাইলভিত্তিক লেনদেনের বিষয়টি তদারকির আওতায় রাখার কড়া নির্দেশনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য হচ্ছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে প্রতিদিন ৭০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এক কোটির বেশি গ্রাহক প্রায় ৪২ লাখ ট্রানজেকশনের মাধ্যমে এসব লেনদেন করছে। তবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিষয়টি কড়া সতর্কতার মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ডেপুটি ডিরেক্টর আল-আমিন রিয়াদ।
তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোনো রকম অপরাধমূলক কাজ যাতে না হয়, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে দেশের সকল ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া রয়েছে।

