ঢাকাMonday , 3 October 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অপরাধের শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি

Link Copied!

Takaনিউজ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক সেমিনারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অপরাধের শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক এ সেমিনারে বাংলাদেশে অব্যাহত আর্থিক দুর্নীতি, বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারী এবং দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারকে জণগণের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আলোচক ও অর্থনীতিবিদরা। এ অপরাধ বন্ধ ও অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শুক্রবার নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে ‘ফিনান্সিয়াল ক্রাইমস এগেইনস্ট বাংলাদেশ পিপল’ শীর্ষক এই সেমিরারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার অর্থপাচার হচ্ছে। ব্যাংক খাতে আর্থিক অনিয়ম, শেয়ার বাজার কারসাজি ও উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় দেখিয়ে জনগণের সম্পদ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে পড়ছে, কর্মসংস্থান কমছে, জনগণের ভোগান্তি বাড়ছে।
তারা বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের র‌্যাংকিং-এ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অর্থনৈতিক সূচক নি¤œমুখী, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ তুলনামূলক কমছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- স্থবির হয়ে পড়বে।
সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে এই অর্থনৈতিক অপরাধ বিষয়ে দেশীয় ও আন্তজার্তিক ক্ষেত্রে কর্মরত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠনে দাবি জানান। এই অপরাধের বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং অপরাধীদের বিচারে একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার, ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারীসহ আর্থিক খাতে যে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে, তা প্রতিরোধে এবং এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করে ’ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন ফিনান্সিয়াল ক্রাইমস এগেইনস্ট বাংলাদেশ পিপল।’
বিশ্বব্যাপী অর্থ পাচারবিষয়ক ওয়াচ-ডগ ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই)- এর সহায়তায় এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে ‘ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমস ইন বাংলাদেশ : মানি লন্ডারিং অ্যান্ড বেয়ন্ড’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপাস্থাপন করেন লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শওকত আলী।
সেমিনারে ’ইলিসিট মানি ট্রান্সফার ফ্রম বাংলাদেশ : পলিসি রিকমেন্ডেশন ফর গভর্নমেন্ট’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জিএফআই-এর চিফ ইকোনমিস্ট ড. দেব কর।
‘ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইন বাংলাদেশ : হাউ উইল ইট ইমপ্যাক্ট অ্যাচিভিং সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক (সানি)- এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান এবং ’স্যোসিও ইকোনমিক কন্ডিশন অব বাংলাদেশ’- বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদ রেজা চৌধুরী।
সাংবাদিক কাউসার মুমিনের সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী ইমরান আনসারী। এ ছাড়া সেমিনারে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা বিশেষজ্ঞরা।
সেমিনারে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন স্তরের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় হিউম্যান রাইটস ডেভলপমেন্ট ফর বাংলাদেশ-এর সভাপতি মাহতাব উদ্দিন বক্তব্য রাখেন।
ড. শওকত আলী তার প্রবন্ধে সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত পরিসংখ্যান, গবেষণাপত্র ও বার্ষিক রিপোর্ট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন যা চলছে তাকে আর দুর্নীতি বলা যায় না। এটা অপরাধ। দেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ।’
তিনি বলেন, ‘সবার জন্য অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। যদি কোথাও কোনো সমাজে সরকারি বা প্রাইভেট সেক্টরে ব্যাপক হারে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে আবশ্যিকভাবে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। বর্তমানেও অর্থ পাচার হচ্ছে। আন্তজার্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে এই অঙ্ক সব মিলে ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের কোনো জবাবদিহি নেই। এমনকি এই ডাকাতি থেকে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বাদ যায়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে ১০০ মিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে- তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা।’
ড. শওকত আলী বলেন, ‘বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার নজিরগুলো হচ্ছে- শেয়ার বাজারকে কুক্ষিগত করা, রাজনৈতিক নেতাদের ঋণ খেলাপি হওয়া, সংসদ সদস্য, আমলা ও ব্যবসায়ীদের ঋণ মওকুফ করা, মেগা-প্রজেক্টে নজিরবিহীন ব্যয়-বরাদ্দ।’
সেমিনারে গ্লোবাল ফাইন্যান্স ইন্টিগ্রিটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. দেব কর বলেন, ‘অর্থপাচার নিয়ে জিএফআইয়ের সম্প্রতি যে গবেষণা প্রতিবেদন বেরিয়েছে, তাতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ পাচারের যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে, তা মূলত খুবই কনজারভেটিভ হিসাব। জিএফআই যেসব সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তার প্রধান সোর্স হচ্ছে ব্যাংক। কিন্তু তারা এই তথ্য দেওয়ার বিষয়ে খুবই কম উৎসাহী। তা ছাড়া এসব আন্তর্জাতিক ব্যাংকের হিসাব মূলত ব্যক্তির নামে। সুতরাং সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে পাচার হওয়া অর্থ আলাদা করে বের করা প্রায় অসম্ভব। বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশে পাচারের যে অঙ্ক জিএফআই প্রকাশ করেছে, তা মূলত একটি অংশমাত্র।
অর্থপাচারের সঠিক চিত্র তুলে না ধরতে পারার সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী অবৈধ অর্থ পাচারের যে প্রতিবেদন তুলে ধরে, তা পুরো নির্ভরশীল বিভিন্ন দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া তথ্য এবং সহযোগিতার ওপর। কিন্তু এ তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা খুবই সীমাবদ্ধ।’
দর্শক সারি থেকে আসা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে ছয়টি কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়, তার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রধান কারণ রাজনৈতিক সহিংসতা এবং গণতন্ত্রের অভাব। কোনো ব্যক্তিই চাইবে না তার অর্থ সেখানে বিনিয়োগ হোক। যদি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ সরকার অর্থ পাচার বন্ধ করতে চায়, তাহলে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে জিএফআই-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সহযোগিতা চাইতে পারে।’
ড. দেব কর আরো বলেন, ‘যদি বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা অর্থ পাচার বন্ধে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এ জন্য তাদেরকে কোনো অর্থও খরচ করতে হবে না। কারণ নরওয়ে, সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডের মতো বহু দেশ রয়েছে, যারা এসব কাজে গবেষণা চালাতে নিয়মিত অর্থ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। সরকার এগিয়ে না এলে জিএফআই-এর মতো সংগঠনের কিছু করার নেই।’
অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের মাত্র ১ শতাংশ লোকের হাতে যাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের দেশের টাকায় বিদেশে পড়াচ্ছেন।’
স্বাগত বক্তব্যে সাংবাদিক ইমরান আনসারী বলেন, ‘স্বাধীন দেশের জনগণ এখন স্বদেশি ব্যাংক ডাকাত ও লুটেরাদের যাতাকলে পিষ্ট। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কোনো না কোনো ব্যাংক থেকে অর্থ লুট হচ্ছে। বিভিন্ন নামে এই অর্থ লুটপাট চলছে। লুটপাট চলছে ঋণ খেলাপির নামে, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারীর মাধ্যমে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে। এটা ডাকাতি। সবচেয়ে খারাপ সংবাদ হচ্ছে যে, এই অর্থ বিদেশে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। জনগণের এই অর্থের নিরাপত্তা বিধানের জন্য জনগণকেই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান তিনি।’