নিজস্ব প্রতিবেদক : লোকেশন ‘ক্লিয়ারেন্স’ ছাড়াই ভূমি উন্নয়ন শুরু করা রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যে পরিবেশগত প্রভাব নিরুপণ (ইআইএ) সংক্রান্ত সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এ ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে তা নিয়ে নানান অভিযোগ তুলেছেন পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা এই ইআইএকে লোক দেখানো বলেও দাবি করেছেন।
দীর্ঘ দুই বছর নয় মাস ধরে সাতদফা সংশোধন ও পরিমার্জনের চূড়ান্ত হয় রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের ইআইএ। এ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট ৫৯ শর্তে কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরিবেশ ছাড়পত্র দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। যদিও এ ছাড়পত্রের আগেই (২০১১ সাল থেকে) ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়।
প্রথম অভিযোগটি আসে যে প্রতিষ্ঠান দিয়ে ইআইএ করা হয় তাকে ঘিরে। রামপাল প্রকল্পের ইআইএ সম্পন্ন করে সেন্টার ফর ইনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিআইজিআইএস), যা সরাকরি প্রতিষ্ঠান।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে নিরপেক্ষ ইআইএ সম্পাদনের নিয়ম থাকলেও রামপালে সরকারি প্রকল্পের সমীক্ষা করেছে আরেক সরকারি প্রতিষ্ঠান।’ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় জড়িত থাকায় এটি নিরপেক্ষতার মানদণ্ড অর্জন করতে পারেনি বলে তিনি মনে করেন।
ইআইএ প্রতিবেদন অনুসারে সুন্দরবন এলাকায় নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্বের মাত্রা প্রতি ঘন মিটারে ১৬ থেকে মাইক্রোগ্রাম। রামপাল কেন্দ্র চালু হলে যা বেড়ে ৫১ দশমিক ২ মাইক্রো গ্রামে দাঁড়াবে। একইভাবে সালফার ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৮ মাইক্রোগ্রাম থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৪ মাইক্রোগ্রাম হবে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত)।
ইআইএ প্রতিবেদনের তথ্য মতে (২৭৮ পৃষ্ঠা), রামপাল হলে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইডের সর্বোচ্চ যে ঘনত্ব হবে তা পরিবেশ আইন ১৯৯৭ অনুযায়ী আবাসিক ও গ্রাম্য এলাকার জন্য নির্ধারিত মাত্রা (প্রতি ঘনমিটারে ৮০ মাইক্রোগ্রাম) এর থেকে অনেক কম। অর্থাৎ এখানে সুন্দরবনকে ‘আবাসিক ও গ্রাম্য এলাকা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ১৯৯৭ সালের পরিবেশ আইনে ‘পরিবেশগতভাবে চরম সঙ্কটাপন্ন এলাকা’র (ইসিএ) জন্য নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইডের সর্বোচ্চ মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম । পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে সুন্দরবন ইসিএ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত।
পরিবেশবাদি লেখক ও এক্টিভিস্ট কল্লোল মোস্তফা এ বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, যেহেতু পরিবেশগত চরম সঙ্কটাপন্ন এলাক এলাকার জন্য নির্ধারিত মানদণ্ডের (৩০ মাইক্রোগ্রাম /ঘনমিটার) সঙ্গে তুলনা করলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কোনোভাবেই জায়েজ করা যাবে না, সেজন্য পরিকল্পিতভাবেই আবাসিক ও গ্রাম এলাকার জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক নাজমুল আহসান জানান, ‘ইআইএ অনুমোদনের সময় ফ্লু গ্যাস ডি সালফারাইজেশন নামে একটি পদ্ধতি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করার শর্ত দেয়া হয়েছে। এটি ব্যবহৃত হলে দিনে প্রতি ঘনমিটারে সর্বোচ্চ ৫ মাইক্রোগ্রাম সালফার ডাই অক্সাইড জমা হবে। বাকি সালফার ডাই অক্সাইড বায়ুতে নির্গত হওয়ার আগেই শোষিত হবে। একই ভাবে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড এর অধিকাংশই শোষণ করে অল্প মাত্রায় বাতাসে ছাড়া হবে। তাই শঙ্কার কিছু নেই।’
এদিকে পরিবেশবাদিরা আরও অভিযোগ করেছেন, ইআইএ প্রতিবেদন চূড়ান্তকরার সময় কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ করা হয়নি। নিয়ম রক্ষার জন্য একটা গণশুনানি করা হয়েছে। গণশুনানিতে পরিবেশবিদসহ বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরলেও সেগুলো আমলে না নিয়েই ইআইএ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আবদুল মতিন বলেন, ‘রামপাল ইআইএ রিপোর্টের মধ্যে কোনো সততা নেই। এতে আমাদের মতামত গৃহিত হয়নি।’
এ প্রসঙ্গে অধিদপ্তরের পরিচালক নাজমুল আহসান বলেন, ‘ইআইএ প্রতিবেদন সম্পর্কে যারাই মতামত দিয়েছেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদন তাদের সবার মতামতের ব্যাখ্যা দেয়া আছে।’

