চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : দেশজুড়ে বইছে পৌর নির্বাচনের ভোটের হাওয়া, জোড় প্রস্তুতি চলছে চট্টগ্রামেও। নির্বাচন হচ্ছে পৌরসভায়; কিন্তু আমেজ সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের। এবার প্রার্থী মনোনয়ন দেবে রাজনৈতিক দলগুলো, প্রথমবারের মত মেয়র প্রার্থীরা লড়বেনও দলীয় প্রতীকে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো বর্জন করায় লড়াই তেমন জমজমাট হয়নি। তবে পৌরনির্বাচনে বিএনপি’র অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পর পুরো চিত্রটাই পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয়পার্টিসহ প্রদান দলগুলোর অংশগ্রহণে সরাসরি দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে এবারের পৌর নির্বাচন যেনো জাতীয় নির্বাচনেরই মহড়া।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই চট্টগ্রামের পৌরসভাগুলোতে সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে প্রার্থীদের অনেকেই মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেছেন, দ্বারস্থ হচ্ছেন ভোটারদের। তবে দলীয় নির্বাচন হওয়ায় এখনো প্রার্থীরা তাকিয়ে আছেন দলের সবুজ সংকেত পাবার আশায়।
ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যেই মাঠে তৎপর হলেও। বিএনপি পৌর নির্বাচনে অংশ নেবে কি না তা নিয়ে শংকা ছিল। তবে আজ (২৭ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পর বেশ জমছে ভোটের মাঠ। তবে এর আগ থেকেই ভেতরে ভেতরে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানা গেছে। দলীয় হাইকমান্ড থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর থেকেই নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়েছেন তারা। আর শুক্রবার জমুার নামাজের সুযোগটাকেই অনেকে কাজে লাগিয়েছেন নির্বাচনী প্রচারণায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ না করা এবং ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীর জয় লাভের কারণে নির্বাচনী আমেজ ছিল না। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে সব দলই। এতদিন মুখে না বললেও নির্বাচনে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়েছে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি। দেশের সব জেলার মতই চট্টগ্রামের ১০ পৌরসভায় দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে যাচাই-বাছাই চলছে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের ১০টি পৌরসভার জন্য সম্ভাব্য ১৫ জন মেয়র প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার কেন্দ্রের নেতারা এ তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট ইফতেখান হোসেন চৌধুরী মহসিন বলেন, ‘বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী দল। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অতীত আচরণের কারণেই সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আমরা শংকিত। দলীয় হাই কমান্ডের নির্দেশে আমরা প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। এখন দলীয় নির্দেশনায় অনুযায়ী কাজ করা হবে।’
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রার্থী বাছাইয়ের কাছ প্রায় গুছিয়ে আনা হয়েছে। যারা দলের দুর্দিনে জনগণের পাশে ছিলেন, যাদের ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে তাদেরকেই আমরা প্রার্থী দেওয়ার কথা চিন্তা করছি। সংগঠনের আদর্শিক চিন্তা চেতনায় যারা উদ্ধুদ্ধ তাদেরকেই আমরা প্রার্থী করব।’
অন্যদিকে এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টি আগামী রোববার প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করবে বলে জানিয়েছে। এছাড়া এলডিপি, সমাজতান্ত্রিক জোট, ইসলামিক ফ্রন্ট, ইসলামী ঐক্যজোট ও ইসলামী শাসনতন্ত্র নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাই সব দলের অংশগ্রহণে পৌর নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ তৈরি হয়েছে। এবার একটি ভিন্ন আঙ্গিকে পৌর নির্বাচনী উৎসবের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দেশবাসী। যেখানে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই উৎসবে শামিল হবে।
এদিকে শীতের হাওয়া ভালো ভাবে বইতে শুরু না করলেও ভোটের হাওয়া বেশ জোরেশোরেই বইছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পৌর এলাকাগুলোয়। ‘জনগণের সেবার সুযোগ’ চেয়ে ইতিমধ্যে পোস্টার সাঁটানো, দেয়াল লিখন শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। স্থানীয় সরকারের মেয়র পদে নির্বাচন হবে দলীয় প্রতীকে। সে কারণে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে দলের প্রতীক-সংবলিত বহুরঙা পোস্টারও সাঁটিয়েছেন, ঝুলিয়ে দিয়েছেন ডিজিটাল ব্যানারও।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্ভাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, , চট্টগ্রামে ১০ টি পৌরসভায় ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে এবার মোট ভোটার ২ লাখ ৬১ হাজার ৬০৫ জন। বুধবার থেকে মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু করেছেন রিটার্নিং অফিসাররা। চলবে আগামী বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) পর্যন্ত। প্রতি ওয়ার্ডের ভোটার তালিকার সিডির জন্য ৫০০ টাকা হারে জমা দিলে প্রার্থীরা বিনামূল্যে মনোনয়নপত্র পাচ্ছেন।
মনোনয়নপত্র বিতরণের শুরুর দিনে তেমন সাড়া না থাকলেও, গতকাল একদিনে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ১৫ পৌরসভায় মেয়র পদে ৭জন, কাউন্সিলর পদে ১৫৫ জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে (মহিলা) ২৮জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।
চট্টগ্রাম জেলার ১০ টি পৌরসভার মধ্যে আছে বারৈয়ারহাট, মীরসরাই, সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী। পৌরসভার ৯০টি ওয়ার্ডে মোট ২ লাখ ৬১ হাজার ৬০৫ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৮৮ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ২৬ হাজার ৭১৭ জন। ১০ টি পৌরসভার ১৩৩ টি ভোটকেন্দ্রে ৭৯১ টি বুথের মাধ্যমে ভোটারদের ভোট গ্রহণ করা হবে আগামী ৩০ ডিসেম্বর।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আবদুল বাতেন বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু হয়েছে। আগামী ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। এছাড়া ভোটার তালিকা, ভোটগ্রহণে প্যানেল কর্মকর্তা, ভোট কেন্দ্র, ভোট কক্ষের তালিকা তৈরিসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন কর্তৃপক্ষ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। স্ব স্ব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ভোট গ্রহণ দিনের দুই দিন আগে আমাদের কাছে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনের যাবতীয় সারঞ্জমাদি পৌছাবে। তবে ব্যালট বক্সগুলো প্রত্যেক উপজেলায় আগে থেকেই আছে।

