নিজস্ব প্রতিবেদক : পুরান ঢাকার হোসনি দালানে তাজিয়া মিছিলের আগে ইমামবাড়া চত্বরে বোমা হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পারেনি তদন্তকারীরা। তবে সন্দেহভাজন শনাক্ত করতে নাশকতায় জড়িত জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের তালিকা করে মাঠে নেমেছে তদন্তকারীরা। খুনিদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও বিশ্লেষণ করছেন তদন্তকারীরা। হাজারো মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতে যায় বেশ কয়েকজন। পিন খুলে বোমাগুলো ছুড়ে মাড়ে একজন। তাকে সহায়তা করে আরো একজন। বিস্ফোরণ ঘটার পর সন্দেহভাজন দুই হামলাকারী হোসনি দালানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের সীমানা প্রাচীর টপকে বেরিয়ে যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
গত শুক্রবার রাত পৌনে ২টার দিকে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে ‘হোম মেইড’ হ্যান্ড গ্রেনেড হামলা করা হয়। ভয়াবহ এ হামলার ঘটনায় সাজ্জাদুর রহমান সাঞ্জু নামে এক কিশোর নিহত এবং শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু আহত হয়। গত রোববার দুপুরে চকবাজার থানা পুলিশ বাদী সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করে পুলিশ। মামলাটি তদন্তভার পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় চার সন্দেহভাজন যুবক আব্দুল কাদের জিলানী, শফিকুল ইসলাম, ফয়সাল, ও মোরসালীনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কোনো সূত্র মিলেনি বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ডিবির উপ-কমিশনার (ডিসি-দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘কবরস্থানের ভেতর থেকে এক বা দুইজন বোমা ছুঁড়ে মারে। এরপর হামলাকারীরা দক্ষিণদিকে পালিয়ে যায়। ফুটেজসহ অন্যান্য আলামত ধরে আমরা কাজ করছি।’
গত সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘পুলিশ হত্যায় একজনকে গ্রেপ্তারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। কামরাঙ্গীরচরে অভিযান চালিয়ে বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়, যা হোসনি দালানের বিস্ফোরকের একই। এটি বাংলাদেশকে অশান্ত করার জন্য সরকারকে চাপে ফেলার জন্য একটি চিহ্নিত মহল সারাদেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার জন্য সারাদেশে এ ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছে। সময় হলে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জাতির কাছে এই বিষয়গুলো উপস্থাপন করবো।’ তিনি আরো বলেন, ‘তাভেল্লা হত্যা এবং দেশব্যাপী নৈরাজ্য তৈরি আলাদা ঘটনা, আলাদা গ্রুপের। এটি মুখের কথা নয়, আলামত প্রমাণ করে একই ধারাবাহিকতায় এসব ঘটনাগুলো ঘটছে।’ আইএস’র দায় স্বীকারের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এখানেও আইএসের নামটা ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু আমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে- একটি চিহ্নত গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে সরকারকে চাপে ফেলে তাদের অন্যায় ও অসাধু উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে আইএসের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে আমরা এতটুকু নিশ্চিত হয়েছি, দু’জন সন্ত্রাসী হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের দায়িত্বে ছিল। তবে যেহেতু এটি পরিকল্পিত নাশকতা, ধারণা করা হচ্ছে ঘটনা ঘটনাস্থলের আশপাশে তাদের আরো কয়েকজন লোক ছিল। যারা ব্যাকআপ, গ্রেনেডগুলো এগিয়ে দেয়া বা পিন খুলতে সহায়তা করেছে। সহিংসতার আগে দুর্বৃত্তরা বেশ কয়েকবার ওই এলাকা রেকিও করে।’
ডিবির ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, অপরাধীরা শিয়া সম্প্রদায়ের মতো বেশ ধারণ করে হোসনি দালান চত্বরে প্রবেশ করেন। যাতে প্রবেশের মুখে বাধার সম্মুখিন না হতে হয়।
প্রাচীর টপকিয়ে পালায় হামলাকারী : বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হোসনি দালানের সীমানা প্রাচীর টপকিয়ে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায় বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে। ডিবি তৈরি করা নকশাতেও সেটি উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি সন্ত্রাসীরা পালানোর জন্য পেছনের প্রাচীরটা ব্যবহার করেছে। সিসিটিভিতে ধারণ করা ফুটেজ বিশ্লেষণ ও ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করে সেটি মনে হয়েছে। সাদা পাঞ্জাবি পড়া এক যুবক বোমা ছুঁড়ে মেরে কবরস্থানের ভেতর দিয়ে চলে যায়। এরপর তার গতিবিধি সিটিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।
ধারণা করা হচ্ছে, ডান পাশের দেয়াল টপকে পালায় হামলাকারী। এদিকে হোসনি দালান চত্বরে অবস্থিত গোরস্থানের উত্তর পাশের থেকে পাঁচটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে তদন্তকারীরা। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেনেডে ব্যবহার করা চারটি সেফটি পিনও উদ্ধার করেছে তারা। অপর একটি পিন অবিস্ফোরিত গ্রেনেডের সঙ্গেই ছিল। আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারীরা রেকি করে নিশ্চিত হয়েছে- কবরস্থানের ভেতরে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরাই দেখা যাবে না।
র্যাব-১০ এর অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা ছায়া তদন্ত করি। ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ভেতরে ঘটনানো হয়েছে। এখানে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। চত্বরের চারপাশে বড় বড় দেয়াল ও ভবন রয়েছে। বাইরে থেকে এগুলো মারা সম্ভব নয়।’
নাশবতাকারীদের খোঁজ : ডিবি পুলিশের একজন ডিসি জানান, গত বৃহস্পতিবার এএসআই ইব্রাহিম খুনের ঘটনায় কয়েকজন জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরাঙ্গীর চর থেকে বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে পাঁচটি এরকই ধরনের বোমা ছিল, মেনটি ব্যবহার হয়েছে হোসনি দালানে। এ কারণে বোমা হামমলায় জামায়াত-শিবির কানেকশন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ পরিকল্পনা কোথায় কীভাবে কার মাধ্যমে এসেছে তা বের করার চেষ্টা চলছে।
এ হামলার নেপথ্যে কারা কারা কীভাবে জড়িত সেটিও বের করার চেষ্টা চলছে। এ জন্য আগে নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত জামায়ত-শিবিরের নেতাকর্মীদের তালিকা করে মাঠে নেমেছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি ইব্রাহিম হত্যা মামলার আসামিদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সন্দেহভাজন কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সূত্র।

