ঢাকাFriday , 12 June 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফুটবলের মাফিয়া

Link Copied!

CORRUPTস্পোর্টস ডেস্ক : গত মে মাসের ২৭ তারিখ সুইজারল্যান্ডের একটি হোটেলে অতর্কিতে গ্রেপ্তার হন আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার সাত কর্মকর্তা। বেশিরভাগ মানুষই ভেবেছিলেন এই দামি স্যুট কোট পরিধান করা মানুষ যারা বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা তারা বুঝি আইনের ঊর্ধ্বে। যাইহোক ঘুষ, অবৈধ উপায়ে খেলোয়াড় পরিবর্তন, ভোটের ফলাফল পরিবর্তন এবং অন্যান্য নোংরা কাজের জন্য ফিফা প্রেসিডেন্ট জোসেফ ‘সেপ ব্ল্যাটার’ এবং তার সঙ্গীরা সবসময়ই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করেছেন।
সবকিছুর বাইরে শেষমেষ ফিফার বর্তমান এবং সাবেক কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট ১৪ জনকে দুর্নীতি এবং জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ আনা হয়েছে যে, ১৫০ মিলিয়ন ডলার ঘুষ বিনিময়ের জন্যও এদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডের আইনজীবীরাও এখন ২০১৮ এবং ২০২২ সালের অনুষ্ঠিতব্য ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং পেছনের ঘটনা অনুসন্ধান করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১৮ সালে রাশিয়ায় এবং ২০২২ সালে কাতারে ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ফিফার ঘুষ কেলেঙ্কারির পর আগামী বিশ্বকাপগুলো আদৌ নির্দিষ্ট স্থানে অনুষ্ঠিত হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এটা সত্যি যে, দীর্ঘদিন ধরেই পেশাদার ক্রীড়া অঙ্গনে দুর্নীতি চলছে। যেমনটা আমেরিকান বক্সিংয়ে আমরা দেখতে পাই। এমনকি সবচেয়ে ভদ্রলোকেদের খেলা ক্রিকেটেও পর্যন্ত ঘুষ ও জুয়ার অভিযোগ আছে।
মোট কথা ফিফা হলো সবচেয়ে ধনী, সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং সবচেয়ে বেশি দুগ্ধবতী বৈশ্বিক গাভী। কেউ কেউ ফিফার সঙ্গে মাফিয়ার সংযোগের কথাও বলেন, যার জন্ম আদতে সুইজারল্যান্ডের একটি ছোট্টো গ্রাম থেকে, যা মূলত ‘ডন ব্লাটারওয়ান’ নামে পরিচিত। যদিও এটা ঠিক নয়। যতদুর আমরা জানি তাতে ফিফার সদরদপ্তর জুরিখ থেকে কখনোও কাউকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়নি।
কিন্তু সংস্থাটির গোপনীয়তা, বিপক্ষ গোষ্ঠিগুলো যারা চালায় তাদের হুমকি দান এবং এর ঘুষ এবং অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দেয়ার ঘটনা আমাদের একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
যে কেউ চাইলে ফিফাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন না বলে অকার্যকর সংগঠন বলতেই পারেন। কিন্তু ফিফার বহুমুখী ভালো-মানুষী চরিত্র থাকলেও আজ যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তার পেছনে আছে সংগঠনটির স্বচ্ছতার অভাব। পুরো সংগঠনটিই চলে মূলত একদল গোপন মানুষ দ্বারা যাদের প্রকাশ্যে কখনোই দেখা যায় না। তারাই মূলত পেছন থেকে ফিফার সকল ব্যবসায়িক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করেন।
তবে যদি কেউ ভেবে থাকেন যে, এসব হয়েছে সেপ ব্ল্যাটারের হাত ধরে, তাহলে কিছুটা ভুলই হবে। কারণ এসবের শুরু সেপ ব্ল্যাটারের অনেক আগেই ব্রাজিলিয়ান জোয়াও হ্যাভালাঞ্জের সময় থেকে। তার আমলেই প্রথম ফিফা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে যায় এবং বিভিন্ন দেশে এর কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়। আর এই সাম্রাজ্য তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রকাশ্যে বৈধতা দেয়ার জন্যই ভোট ব্যবস্থার শুরু হয়। অথচ যারা ওই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তারাই আবার ভোট প্রয়োগ করে পুরো প্রক্রিয়াটিকে বৈধতা দেয়।
কোকাকোলা এভং অ্যাডিডাসের মতো কোম্পানির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ইতোমধ্যেই এই সংগঠনটি নিয়ে নিচ্ছে। হ্যাভালাঞ্জ নিজে তৃতীয় বিশ্বকাপের সময় নিজের পকেট পূর্ণ করার জন্য এই কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় যে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার প্রধান স্পন্সর ছিল কোকাকোলা। অথচ সেসময় আর্জেন্টিনা ছিল বর্বর সামরিক জান্তার অধীনে।
ব্ল্যাটার অবশ্য হ্যাভালাঞ্জের মতো অতটা চোয়াড়ে স্বভাবের নন। ব্রাজিলিয়ানদের মতো তিনি দুর্বৃত্তদের সঙ্গে খোলাখুলি সহযোগিতা করেননি। কিন্তু তার ক্ষমতাও কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর ভোট এবং তাদের আনুগত্যের উপরই নির্ভর করতো। আর এর পুরোটাই নিশ্চিত হতো টেলিভিশন স্বত্ত্ব এবং বাণিজ্যিক ফ্রাঞ্চাইজি পাইয়ে দেয়ার শর্তের মাধ্যমে। কাতারের ক্ষেত্রে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়, যখন তীব্র বাজে আবহাওয়া স্বত্ত্বেও ফিফা কাতারকে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়। দেশটিতে প্রচণ্ড বৈরি পরিবেশের মধ্যে বিশ্বকাপের জন্য অবকাঠোমো তৈরি করা হচ্ছে এবং এই কাজে খুব অল্প মজুরি দিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদেশি শ্রমিকদের।
মূলত ফিফার স্বজন-প্রীতি এবং নয়া প্রভুত্ববাদী আচরণ সেপ ব্ল্যাটারকে আমাদের সময়ের গড়পড়তা মানুষ হিসেবে দেখাতে সাহায্য করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ব্ল্যাটার উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে নিজেকে একজন বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য অনেক অপকর্মই করেছেন। এমনকি উদ্ধত পশ্চিমের বিরুদ্ধে তিনি আফ্রিকা, এশিয়া, আরব এবং দক্ষিণ আমেরিকার পক্ষে নগ্নভাবে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু গরীব দেশ থেকে আসা একজন মানুষ যখন পশ্চিমা রাজনীতি অথবা বাণিজ্যিক স্বার্থগুলোকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দুর্নীতি করতে পিছপা হননি তখন থেকেই দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। এরকম ঘটনা আগেও ঘটেছে, এখনও ঘটছে। কিন্তু সত্যিকারের অর্থ এসেছে কিন্তু পশ্চিম থেকে নয়। চীন, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং এমনকি রাশিয়া থেকেও ওই অর্থ এসেছে।
বর্তমান সময়ে পশ্চিমা ব্যবসায়িরা, স্থাপত্যবিদরা, শিল্পীরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এবং জাদুঘরের প্রধান ছাড়াও যাদের প্রচুর পরিমাণ তহবিল দরকার হয় নিজেদের প্রকল্প চালাতে, তারা এখন আর অপশ্চিমা কোনো একনায়কের সঙ্গে চুক্তি করছেন না। উল্টো তারা এই কাজে বেছে নিয়েছেন নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের। কিছু মানুষ মনে করেন টনি ব্লেয়ারের মতো মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নেয়াই ভালো, যিনি সরকার থেকে চলে যাওয়ার পরেও নিজের ক্যারিয়ার গুছিয়ে নিয়েছেন সরকারি সকল সুবিধা ভোগ করে।
কর্তৃত্ববাদী শাসনের কুচক্রী এবং অস্বচ্ছ বাণিজ্যিক স্বার্থই কিন্তু পুরো ঘটনা নয়। শিল্পকলা এবং উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষার জন্য যে সাময়িক মিত্রতা স্থাপন করা হয়েছে তা এ ধরনের দুর্নীতির প্রশ্নে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যা আমরা সাম্প্রতিক পশ্চিমা দেশগুলো নির্ধারিত বহিঃদেশীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালা দেখলেই বুঝতে পারি। যে কারণে দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়িরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর জাদুঘরে পর্যন্ত বিনিয়োগ করছে। এমনকি চীনে বিশাল স্টেডিয়াম বানানো, রাশিয়া বা কাতারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগও তারাই করছে। আর এসবই করা হয় মূলত সেই ভোটের জন্য, যে ভোটের বিনিময়ে ওই ব্যবসায়িদের সকল অবৈধ কাজ বৈধতা পায়।