নিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত বাংলাদেশের ছিটমহলবাসীরা। সম্প্রতি দুদেশের স্থলসীমান্ত চুক্তির পর তা বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে অবসান হতে যাচ্ছে সেই বঞ্চনার। সেই সুবাদে ছিটমহলবাসীরা ভোটার হতে যাচ্ছেন। আর তাদের হাতে তুলে দেয়া হবে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র। ছিটমহলবাসীদের ভোটার তালিকায় আনতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিচ্ছে ‘বিশেষ কর্মসূচি’।
এতদিন অন্যদেশের দেশের সীমানার ভেতরে বলে এসব ছিটমহলে হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, স্কুল-কলেজ বা বিচার- প্রশাসনের ব্যবস্থা কিছুই ছিল না। এমনকি মূল ভূখণ্ডে যাতায়াতের জন্যও ছিল না কোনো ব্যবস্থা। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানোর সুযোগ ছিল সীমিত। এর মধ্যে অনেকে বাংলাদেশি বা ভারতীয় ঠিকানা ব্যবহার করে লেখাপড়া করলেও ছিটমহলের বাসিন্দা হওয়ায় ছিল না চাকরির সুযোগ।
সাধারণত ছিটমহলবাসীদের পরিচয় নির্ধারণ করতো এলাকার পঞ্চায়েত প্রধানরা। ভারত-বাংলাদেশের স্থল সীমান্ত চুক্তির সমাধান হওয়ায় তারা পাচ্ছেন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোট প্রদানের অধিকার। এ প্রক্রিয়ায় ছিটমহলবাসীরা তাদের জমি ও ভিটামাটিতে বসবাসের সুযোগও পাবেন। কারো স্থানান্তরের প্রয়োজন হবে না। শুধু বদলে যাবে জাতীয়তা। কিন্তু কেউ যদি তার আগের জাতীয়তা বজায় রাখতে চায়, তাহলে তাকে দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হবে।
এ উদ্যোগের মধ্যদিয়ে ছিটমহলবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হলে তারা চাকরি, শিক্ষাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের মতো সমান সুযোগ পাবে।
ইসি সূত্রে জানা যায়, আজ মঙ্গলবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম নিয়ে বৈঠকে ছিটমহলবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে শেষে পর্যন্ত সিদ্ধান্ত না হলেও আগামী বৈঠকে ঠিক হবে কবে থেকে বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটার তালিকায় তাদের অর্ন্তভূক্ত করা হচ্ছে।
ইসি সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এর আগে ছিটমহলগুলোর বাংলাদেশি নাগরিকদের ভোটার তালিকাভূক্ত করার উদ্যোগ নিলেও সে উদ্যোগ সফল হয়নি। এবার নতুন করে উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে এর আগে সার্বিক আনুষ্ঠানিকতা সেরে সীমানা গেজেট পুননির্ধারণ করতে হবে। কোন ছিটমহল কোন আসনের মধ্যে পড়েছে সে বিষয়গুলো ঠিক করার পর নাগরিকদের সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার করে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী বছরের শুরুতেই হালনাগাদ কার্যক্রমে ছিটমহলবাসীদের ভোটার করা সম্ভব না হলেও যত দ্রুত সম্ভব বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হবে। তবে এ কর্মসূচি কবে নাগাদ নেয়া হবে তা নির্বাচন কমিশনই চূড়ান্ত করবে।’
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের মহা পরিচালক সুলতানুজ্জামান মো. আবু সালেহ বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। ছিটমহল বিনিময়ের কার্যক্রম শেষ হলে আমরা বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ছিটমহলবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের কার্যক্রম শুরু করব।’
এ বিষয়ে ইসির উপসচিব আব্দুল ওদুদ বলেন, ‘ছিটমহলের বাসিন্দাদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের কার্যক্রম নিয়ে আজকের বৈঠকে তেমন আলোচনা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে শীঘ্রই কোনো বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর কেবল আঙ্গরপোতা ও দহগ্রামের পাঁচ হাজারের কিছু বেশি ভোটার পাশের ইউনিয়নে গিয়ে তালিকাভুক্ত হন। তখন তারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোট দিতে পেরেছেন। ওই দুই ছিটমহলে ২০১২ সালেও ভোটার তালিকা হালনাগাদ হয়।
এদিকে, গতকাল সোমবার দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবের মধ্যে বিনিময় হওয়া এক চিঠিতে ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময় শুরুর কথা জানানো হয়। এর আগে গত শনিবার ৬ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে স্থল সীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল হস্তান্তর হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে এ ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি সই হয়। কিন্তু এ চুক্তি সে সময় বাস্তবায়ন হয়নি। গত ৭ মে ভারতের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ওই চুক্তি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়। সেই সঙ্গে ছিটমহল নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানের পথ সৃষ্টি হয়।
২০১১ সালে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত শুমারি অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল আছে। এতে ৩৭ হাজার মানুষের বাস করছে। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দা ১৪ হাজার। ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের আয়তন মোট ৭ হাজার ১১০ একর। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের আয়তন ১৭ হাজার ১৬০ একর।

