নিজস্ব প্রতিবেদক : কয়েক জন সংসদ সদস্যদের উষ্ণ সমালোচনার মধ্য দিয়ে পাস হলো ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ৯ হাজার ৫০৮ কোটি ৫৭ লাখ ১২ হাজার টাকার সম্পূরক বাজেট। অর্থমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান পাসের জন্য সম্পূরক বাজেটটি উত্থাপন করেন।
মঙ্গলবার সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা সমন্বিতভাবে কণ্ঠভোটে এটি পাস করেন। সদ্য সমাপ্ত অর্থ-বছরের বরাদ্দকৃত বাজেটের অতিরিক্ত খরচের হিসাব এই সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে পাস করিয়ে নেয়া হলো।
খরচ করার পর তা পাস করার এ প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যরা। এ নিয়ে সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘আপনার অথরাইজেশন ছাড়া টাকা খরচ করেছেন। তাও আবার কোথায় কত টাকা খরচ করেছেন সেটার সঠিক কোনো ব্যাখ্যা সম্পূরক বাজেটে তুলে ধরা হয়নি। এখানে আপনারা আপনাদের জবাবদিহিতার জায়গা থেকে সরে এসেছেন। তবে কেন আমরা এ বাজেটটি পাস করাতে ভোট দেব।’
একইভাবে সমালোচনা করেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ ও মো. সেলিম উদ্দিন। তারাও বিভিন্ন খাতে চরম অনিয়ম, দুর্নীতির বিচার না হওয়া, জবাবদিহিতার-সুশাসনের অভাবের উল্লেখ করেন। আলোচনায় ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির বিষয়গুলো ঘুরেফিরে সামনে নিয়ে আসেন তারা।
এ সম্পূরক বাজেটে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে পরিকল্পনা বিভাগে। তাদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ হাজার ৮১৯ কোটি ৯৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এরপরেই রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়; যার বরাদ্দের পরিমাণ ১ হাজার ৫৩৭ কোটি ২৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এক হাজার ৪২৩ কোটি ৬৯ লাখ ২৩ হাজার টাকা নিয়ে বাজেট বরাদ্দে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।
পাস হওয়া সম্পূরক বাজেটে মন্ত্রণালয় ও বিভাগসহ ২২টি মঞ্জুরি দাবির উপর ১৭০টি ছাঁটাই প্রস্তাব দেয়া হয়। আনীত ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর ৮ জন সদস্যের প্রত্যেকেই তাদের যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তবে কণ্ঠভোটে তাদের দাবি নাকচ হয়ে যায়। পরে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সম্পূরক বাজেট পাসের জন্য ভোটে দেন। এরপর সরকারি দল ও বিরোধী দলের সবার উপস্থিতিতে সর্বসম্মতক্রমে সম্পূরক বাজেট (২০১৪-১৫) পাস হয়।
পাসকৃত সম্পূরক বাজেটে খরচের দিক দিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তাদের পাসকৃত বরাদ্দের পরিমাণ ১ হাজার ৩৭২ কোটি ৯৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ১ হাজার ২৭১ কোটি ১৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
পাসকৃত সম্পূরক বাজেটে সুপ্রিম কোর্টের জন্য ১০ কোটি ৮০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ৭৮ কোটি ২৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ ৮৭ কোটি ২১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ১ হাজার ৪২ কোটি ৮৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৮৭ কোটি ৫৯ লাখ ৩ হাজার টাকা, বাণিজ্য মন্ত্রণায় ৩৫ কোটি ৩৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ২২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ৪৬ কোটি ৮৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, সরকারি কর্ম কমিশন ৮ হাজার ১২৬ টাকা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ৫ কোটি ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা মঞ্জুরী বরাদ্দ পেয়েছে।
বাজেট পাসের সময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ অধিকাংশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
সম্পূরক বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অংশ নিয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান আর্থিক খাতের কিছু কেলেঙ্কারির ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে বলেন, ‘এ খাতে যা ঘটেছে তা অর্থমন্ত্রণালয়ের জন্য লজ্জাজনক। এবার শক্তহাতে রোধ করতে না পারলেও আগামীতে যাতে এমনটা না ঘটে সেজন্য বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আর্থিক খাতের কেলেঙ্কারির ঘটনা নিয়ে জাতির সামনে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। একইসঙ্গে আর্থিক খাতের কেলেঙ্কারি কীভাবে রোধ করা যায়, সে বিষয়েও কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করা হবে।’
অর্থ-প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘মহাজোট সরকারের গত পাঁচটি বাজেটের ক্ষেত্রে মূল বাজেটের সঙ্গে সম্পূরক বাজেটের খুব একটা বেশি তফাৎ ছিল না। কয়েক বছর পর পর শেয়ার মার্কেটে বড় ধরনের উত্থান-পতন ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিমূল্যায়ণে গেলেই এমন ধস নামে। ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন হওয়ার পর সূচক ৪ থেকে সাড়ে চার হাজারে মধ্যে রয়েছে। উত্তম সময়ে আমরা ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন করেছি, যার সুফল বিনিয়োগকারীরা পাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হলে পুঁজিবাজারের বিকাশ করতেই হবে। দুই-তিন বছরে পুঁজিবাজারে অনেক সংস্কার করেছি।
বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। বাজেট যে সরকার প্রদান করে, সেই দলের রাজনৈতিক আদর্শ, স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রতিচ্ছবি থাকে। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় থাকে, তখনই দেশে জনহিতকর কর্মকাণ্ড চলে। আগামী ৫ বছরে তা আরো বেগবান হবে। কর প্রদানের ক্ষমতা অনেক মানুষের রয়েছে। এদের করজালের মধ্যে আনতে ব্যাপকভিত্তিক জরিপ চালানো হচ্ছে। করজাল বিস্তৃত করতে পারলে রাজস্ব আদায়ও অনেকগুণ বেড়ে যাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে কারোর কোনো পরামর্শ থাকলে তা দিন, অবশ্যই ভালো প্রস্তাবগুলো আমরা গ্রহণ করবো।’

