ঢাকাMonday , 8 June 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মিথ্যা ছেড়ে সত্য ঠিকানায়

Link Copied!

Chitmaholকুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : জন্ম নিবন্ধন থেকে শুরু করে মৃত্যু সনদ। স্কুলে ভর্তি, জমির দলিল, হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়াসহ সব কাজ করতে মিথ্যা ও ভুল ঠিকানা ব্যবহার করতে হতো ছিটমহলবাসীদের।
মিথ্যা দিয়ে শুরু হতো জীবনের পথ চলা। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগেও নিতে হতো মিথ্যার আশ্রয়। মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করতে হতো শবযাত্রায়ও। দীর্ঘ ৬৮ বছর মিথ্যার সঙ্গে বসবাস করতে হয়েছে ছিটমহলবাসীদের। দেশের ঠিকানা পাওয়া ছিল তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারে মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি বিনিময়ের পরে অবসান ঘটেছে সেই মিথ্যার পথ চলা।
বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম সূর্য ওঠা দেখে মিথ্যা ছেড়ে সত্যের আলোতে পথ চলা শুরু করেছেন ছিটমহলবাসী। এখন তারা বাংলাদেশের মুক্ত আকাশে নিঃশ্বাস নিতে পারছেন। কোনো কাজেই আর মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে না। বাংলাদেশ সরকারের সব সুযোগ সুবিধা পাওয়ার আশায় পথ চেয়ে আছেন তারা।
পাটগ্রামের বাঁশকাটা-১১৯ ছিটমহলের বাসিন্দা শাহেদা বেওয়া (৬৫) বলেন, ‘৬৮ বছর পর আল্লাহ এ্যালানী হ্যামার দিকে চায়া দেখিল। হামরা এখন বাংলাদেশের নাগরিক। হারার ছোয়া-পোয়া এখন স্কুলত পড়বার পারবি। হামাক আর মিছা কথা কবার নাকবান্নয়।’ এসব কথা বলতে বলতে তার চোখে আসে আনন্দ অশ্রু। বিভিন্ন ছিটমহল ঘুরে আনন্দ উচ্ছ্বাস করতে দেখা গেছে বাসিন্দাদের। দেশ পাওয়ার আনন্দে মিছিলে-স্লোগানে মুখরিত ছিল ছিটমহলগুলো। বাড়ি বাড়ি উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা। পটকা ফুটিয়ে, আতশবাজী করে আনন্দ-উল্লাস করছেন ছিটের বাসিন্দারা। আনন্দের জোয়ারে ভাসছে ছিটমহল।
পাটগ্রামের বাঁশকাটা-১১৯ ছিটহলের বাসিন্দারা আনন্দ মিছিল করেছেন। শতাধিক শিশু-যুবক-বৃদ্ধা মিছিলে অংশ নেয়। এ সময় তারা ‘নরেন্দ্র মোদি জিন্দাবাদ’, ‘শেখ হাসিনা জিন্দাবাদ’, ‘মমতা ব্যানার্জি জিন্দাবাদ’ বলে নানা স্লোগান দিতে থাকে।
ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির লালমনিরহাট জেলার সভাপতি শাহ আব্দুল হামিদ আফতাবী বলেন, ‘দেশের প্রথম সূর্যোদয় দেখে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছি। মিথ্যার পথ চলা সমাপ্ত হয়েছে। সরকার আমাদের জন্য যত তাড়াতাড়ি উন্নয়নমূলক কাজ করবে আমরা ততো শান্তিতে বসবাস করতে পারবো।’
এই ছিটের সভাপতি নজুরল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মুক্ত আকাশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। এজন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। আমরা চাই সরকার যেন আমাদের জন্য কাজ করেন।’
সহ-সভাপতি মকছুল হোসেন বলেন, ‘আমরা মুক্তি পেলাম। সবাই মিলে একসাথে থাকতে চাই। আমাদের রাস্তা-নেই। স্কুল -কলেজ নেই। আমরা সরকারের কাছে এসব কিছু চাই।’
জোবেদা বেওয়া নামে এক বাসিন্দা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘হামার সোয়ামী দ্যাশ দেখে মরবার পাইল না। হামরা এল্যা ছোয়া-পোয়া নিয়ে এই দ্যাশ থাকপার চাং। সরকার এল্যা হামার জন্য কি করবার নাকছে। হামরা নদী পাড়দ থাকি। কাজ-কাম করবার পারি না। সরকার যেন হামার দিকে চোখ তুলে দেখে।’
সদানন্দ রায় নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘ভারত সরকার যদি হামারঘরোক নিয়ে যায়, হামরা যামো। সরকার যদি না নেয় হামরা ভারত যাবান্নই। হামার বাপ-দাদা এই দ্যাশত মরছে। হামরাও এল্যা মরবার নাকছি। ছোয়া-পোয়া নিয়ে কষ্টে-মষ্টে দিন পার করবার নাকছি।’
লালমনিরহাট জেলার অভ্যন্তেরে আদিতমারীর কুটি, বাতৃগাছ, হাতীবান্ধার উত্তর গোতামারী, পাটগ্রাম উপজেলার বাশঁকাটা, উফারমারা, লতাবাড়ী, ভোটবাড়ী, জোংড়া ও কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া, কালমাটি, সাবেহগঞ্জ, দিঘলটারি, ছেউটিকুর্শাসসহ সব ছিটমহলের হাজার হাজার নারী, পুরুষ, শিশু গতকালও আনন্দ মিছিল করেছে।
এদিকে, কুড়িগ্রাম সীমান্ত থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার ভেতরে ফুলবাড়ি উপজেলা সদরের অভ্যন্তরে ১ হাজার ৬৪৩ একর আয়তনের দাসিয়ারছড়া বাংলাদেশের ভেতরে সর্ববৃহৎ ভারতীয় ছিটমহল। এখানে প্রায় ১০ হাজার বেশি লোকের বসতি। গতকালও তারা আনন্দ-উল্লাস করেছে।
দাসিয়ারছড়া ছিটের সাধারণ সম্পাদক মোজাফফর বলেন, ‘বিচার-আচার নাই, কোনো দেশেই সহজে চলাচলে উপায় ছিল না। এখন নতুন দেশ, নতুন ঠিকানা পেলাম। অনেক আনন্দ লাগছে। আশা করছি সরকার তাড়াতাড়ি আমাদের সমস্যা সমাধান করবেন। ছিটমহলে আইনের শাসন প্রতিষ্টিত হবে। আমারা শান্তিতে বসবাস করতে পারবো।’
ভারতের ভিতরে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহল ছিটকরলা-১, ২ বাসিন্দারাও তাদের বাড়ি বাড়ি ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন। বাসিন্দারা সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ভারতের পতাকা উত্তোলন করেছে। তারাও ভারতে যাওয়ার আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন। পটকা ফুটিয়ে উল্লাস করছে।
জাকির হোসেন বলেন, ‘জন্মভুমি ছেড়ে যাচ্ছি কষ্ট হচ্ছে। ঠিকানা পাওয়ায় খুশি লাগছে। এতোদিন কোনো দেশের সুবিধা পাইনি। আশা করছি ভারতে গেলে কিছু সুবিধা পাব। ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারব।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দলির বিনিময়ের পরে বাংলাদেশের ভেতর ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সঙ্গে যুক্ত হবে। একইভাবে ভারতের ভিতর থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল হয়ে যাবে ভারতের ভূমিতে।