নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজের রাজনৈতিক গুরু অটল বিহারি বাজপেয়ির পক্ষে স্বাধীনতা সম্মাননা পদক গ্রহণ করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে এ সম্মাননায় ভূষিত করেছে।
রোববার দুপুরে বঙ্গভবনের দরবার হলে নরেন্দ্র মোদির হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বেলা ১২টা ৩৮ মিনিটে নরেন্দ্র মোদির গাড়িবহর বঙ্গভবনে এসে পৌঁছায়। সেখানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তাকে স্বাগত জানান। এরপর দরবার হলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন মোদি। বৈঠক শেষে শুরু সম্মাননা প্রদান পর্ব। যা পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁঞা।
বাজপেয়ির পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করে হিন্দিতে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বক্তব্য দেন মোদি। বলেন, ‘আজ আমার জন্য সৌভাগ্যের, ভারতবাসীর জন্য গৌরবের মুহূর্ত। যে মহানপুরুষ নিজের সম্পূর্ণ জীবন দেশের সেবায় কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি মানুষের এক বিন্দু শান্তির জন্য নিজের সারা জীবন কষ্ট করে গেছেন। সেই সঙ্গে আমার মতো লাখো মানুষের রাজনীতির প্রেরণা। তিনি বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের সময় দিল্লীতে তরুণদের বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য একত্রিত করেছিলেন। আজ এ সম্মাননা দেয়ার জন্য আমি তার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
তিনি বলেন, ‘আজ অটল জি নিজে উপস্থিত থাকলে এ অনুষ্ঠান আরো তাৎপর্যময় হতো। তবে প্রথম আনন্দের বিষয় হলো- বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য এ সম্মাননা নিচ্ছি এখন মুক্তিযোদ্ধার কাছে থেকে, যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। দ্বিতীয় আননন্দের বিষয়- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার উপস্থিতি।’
একাত্তর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটি কথা আজ পর্যন্ত আমি কখনো বলিনি, আজ এখানে প্রথম বলবো। আর তা হলো ১৯৭১ সালে অটল বিহারি বাজপেয়ি যখন ভারতের জনগণকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানিয়ে সত্যাগ্রহ করছিলেন, তখন লাখো তরুণের মতো আমি আমার গ্রাম থেকে দিল্লিতে ছুটে আসি। আমিও কোটি ভারতীয়দের মতো বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। তখন আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলাম না।’
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের লোকসভায় বিরোধী দলীয় সদস্য হিসেবে অটল বিহারি বাজপেয়ির বক্তব্যের উদ্বৃতি টেনে মোদি বলেন, ‘অটল জি বলেছিলেন, “বাংলাদেশে আজ তাদের তরুণ ও আমাদের জওয়ানদের রক্ত একসঙ্গে প্রবাহিত হচ্ছে। এ রক্তই প্রমাণ করছে আমাদের বন্ধুত্ব কখনো ভাঙবে না, কোনো কূটনীতিতে হারবে না।” তার কথার সঙ্গে সহমত হয়ে বলছি, আমারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত বন্ধুত্ব সম্পর্ক ধরে রাখবো।’
নরেন্দ্র মোদির পরে বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘এই সম্মাননা আপনার (মোদি) হাতে তুলে দিতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। আরো বেশি আনন্দিত হতাম যদি তিনি (বাজপেয়ি) নিজেই এই সম্মাননা গ্রহণ করতে পারতেন।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘অটল বিহারি বাজপেয়ির মতো এমন একজন মহৎ ব্যক্তিকে সম্মানিত করতে পেরে আমরা নিজেদের সম্মানিত করছি। বাজপেয়ি আমাদের মাঝে উপস্থিত থেকে পুরস্কারটি গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তার শারীরিক অবস্থার জন্য আসতে পারেননি। একজন সু-কবি হিসেবে একবার বলেছিলেন, “আমি জয় পরাজয়ে ভীত নই, কর্তব্য পালনের পথে যাই আসুক না কেন আমি এটা গ্রহণ করবো কারণ এটা যেমন সত্য তেমনি ওটাও সত্য”। এমন একজন মহৎ ব্যক্তি ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুকে সম্মানিত করার মাধ্যমে আমরা নিজেদের সম্মানিত করছি। আমি তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।’
বঙ্গভবনের এ অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য বৈঠক ও সম্মাননা গ্রহণ শেষে এখন নরেন্দ্র মোদি তার সৌজন্যে রাষ্ট্রপতির দেয়া মধাহ্নভোজে অংশ নিচ্ছেন।
বঙ্গভবন থেকে তিনি আবারো হোটেল সোনারগাঁওয়ে যাবেন। খানিকটা বিশ্রামের পর বিকেল ৩টায় সুরমা হলে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে মোদির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তারপর একে একে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ হোটেল সোনারগাঁওয়ে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন।
সন্ধ্যা ৬টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রয়েছে নরেন্দ্র মোদির বিশেষ বক্তৃতা। সেখান থেকেই তিনি সরাসরি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাবেন। সেখানে রাত ৮টা ১০ মিনিটে ভিভিআইপি টার্মিনালে তাকে বিদায় জানাতে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাত ৮টা ২০ মিনিটে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিশেষ বিমানে করে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন নরেন্দ্র মোদি।
এর আগে ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সফরের দ্বিতীয় দিনের কার্যসূচি শুরু করেন নরেন্দ্র মোদি। পরে তিনি রাজধানীর বারিধারায় ভারতীয় হাইকমিশেনে যান। সেখানে তিনি হাইকমিশনের চ্যান্সেরি উদ্বোধন করেন। পরে সেখান থেকে হোটেল সোনারগাঁওয়ে যান বিশ্রাম নিতে।

