নিজস্ব প্রতিবেদক : সাক্ষ্য না দেয়ায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জড়িয়ে হবিগঞ্জের রাজাকার আব্দুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন আসামি নিজেই। তবে এর আগে কোন মামলায় তাকে সাক্ষি সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল তা স্পষ্ট করে জানা যায়নি।
বুধবার চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এ আসামিকে হাজির করা হলে তিনি বিচারকদের উদ্দেশে এ কথা বলেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে মৌলভীবাজার জেলা সদরের আতাংগিরি পাহাড় থেকে আব্দুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করার পর তাকে আজ বুধবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এসময় প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন আসামি রাজ্জাকের গ্রেপ্তারের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালকে নিশ্চত করেন। পরে ট্রাইব্যুনাল আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামি আব্দুর রাজ্জাককে সামনে ডেকে পাঠান।
আসামি বিচারকদের সামনে হাজির হলে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হবে কি না বা আইনজীবী নিযুক্ত করার সাধ্য তার আছে কি না সে বিষয়ে জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। আব্দুর রাজ্জাকের শ্রবণশক্তি কম থাকার কারণে বিচারকদের প্রশ্ন তাকে আবারো বলে শোনানো হয়।
এ সময় আব্দুর রাজ্জাক তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগে অপরগতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘হুজুর..আমি সাক্ষ্য না হওয়ায় আমারে আসামি (রাজাকার) বানানো হয়েছে… (তবে এরপর কান্নাজড়ানো কণ্ঠে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ায় আসামির আঞ্চলিক ভাষার কথাগুলো আর স্পষ্ট শোনা যায়নি)।’ তখন আসামি আব্দুর রাজ্জাক টিস্যু দিয়ে বারবার তার নাক থেকে রক্ত পড়া বন্ধের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।
এ বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টিগোচর হলে বিচারকরা আসামির কাছে নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চান। এর উত্তরে আসামি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘নাক দিয়ে রক্ত পড়া আমার একটি সমস্যা।’
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি নির্দোষ, আমি কিছু করিনি। আমাকে সাক্ষি না হওয়ায় আসামি করা হয়েছে। আমার কিছু কথা আছে। আমি সেই কথা বলতে চাই…।’
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এসময় বলেন, ‘আমরা আপনার কথা অবশ্যই শুনবো। আপনার সব কথাই এখানে শোনা হবে। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার কথা শোনা হবে।’
এরপর ট্রাইব্যুনাল সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া এ আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, রাজাকার রাজ্জাক হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বাসিন্দা। গতকাল মঙ্গলবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যরা মৌলভীবাজার জেলা সদরের আতাংগিরি পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে রাজাকার রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করে।
আব্দুর রাজ্জাক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তারকৃত হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জের দুই সহোদর মহিবুর রহমান বড় মিয়া ও মুজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়ার চাচাতো ভাই এবং তাদের সঙ্গে একই মামলার আসামি।
এর আগে গত ১৭ মে রোববার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
এদিকে বড় মিয়া-আঙ্গুর মিয়া-আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগসহ ৪টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে।
২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে ২৮ এপ্রিল শেষ করেন এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নূর হোসেন। এতে ২১ জন সাক্ষির জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কুমুরশামা গ্রামের বাসিন্দা গ্রেপ্তারকৃত মহিবুর রহমান বড় মিয়া ও মুজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়া মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকায় রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলেন। তাদের মধ্যে বড় ভাই ছিলেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ও ছোট ভাই ছিলেন রাজাকার কমান্ডার। তাদের সহযোগী হিসেবে ছিলেন তাদের চাচাতো ভাই আব্দুর রাজ্জাক। আসামিরা এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেন।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তর সালের ১১ নভেম্বর বানিয়াচং উপজেলায় অভিযান চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আকল আলী ও রজব আলীকে হত্যা করে মরদেহ গুম করে ফেলেন আসামিরা।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি মরহুম মেজর জেনারেল এমএ রবের বাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ করে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যান এবং ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেন।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, একই দিন বানিয়াচং উপজেলার খাগাউড়া এলাকার উত্তরপাড়ায় তাদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী মঞ্জব আলীর স্ত্রী ও আওলাদ ওরফে আল্লাত মিয়ার ছোট বোনকে ধর্ষণ করে। পরে আল্লাত মিয়ার বোন বিষপানে আত্মহত্যা করেন।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তর সালের বাংলা ভাদ্র মাসের যেকোনো দিন আনছার আলীকে বাড়ি থেকে ধরে রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন চালান তারা।

