ঢাকাThursday , 8 October 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

২০ বছর বন্ধ সরকারি হ্যাচারি, পোনা সংকটে মেহেরপুরের চাষিরা

Link Copied!

মাছ চাষে অপার সম্ভাবনার জেলা মেহেরপুর। জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কমবেশি মাছের চাষ হচ্ছে। গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য বাণিজ্যিক মাছের খামার। এমনকি কয়েকটি গ্রাম ইতোমধ্যে ‘মৎস্য গ্রাম’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিবছর জেলায় উৎপাদন হচ্ছে হাজার হাজার মেট্রিক টন মাছ। তবে সম্ভাবনাময় এই খাতের অন্যতম প্রধান উপকরণ মানসম্মত রেণু ও পোনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছেন চাষিরা।
জেলার দুটি সরকারি মৎস্য হ্যাচারির একটি প্রায় ২০ বছর ধরে বন্ধ। অন্যটিও দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। ফলে স্থানীয় চাষিদের মানসম্মত পোনার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে যশোর, ঝিনাইদহ, নওগাঁ ও সান্তাহারসহ দূর-দূরান্তের বেসরকারি হ্যাচারির ওপর। এতে একদিকে পোনা কেনার খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্ত হচ্ছে পরিবহন ব্যয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকিও থাকছে। সব মিলিয়ে মাছ উৎপাদনের খরচ বাড়ায় কমছে চাষিদের লাভ।

২০ বছর ধরে অচল গাংনী হ্যাচারি
স্থানীয় মৎস্য উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গাংনী উপজেলা সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি ২০০৫ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। সে সময় এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদন করা হতো। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলাতেও সরবরাহ করা হতো এসব পোনা।
কিন্তু ২০০৫ সালের পর থেকে হ্যাচারিটি দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ পড়ে আছে। বছরের পর বছর অযত্ন ও অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হয়ে গেছে পোনা উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। হ্যাচারির অবকাঠামোও এখন অনেকটা পরিত্যক্ত। সরকারি খামারের জমির একটি অংশ বেদখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হ্যাচারিটি বন্ধ থাকার সুযোগে এর বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও সরকারি বাসভবনের দরজা-জানালা পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর পরিত্যক্ত ভবনটিতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দূরের জেলা থেকে পোনা আনতে বাড়ছে খরচ
মাছ চাষের মৌসুম শুরু হলেই মেহেরপুরের চাষিদের বড় একটি অংশকে পোনা সংগ্রহের জন্য ছুটতে হয় বাইরের জেলার হ্যাচারিতে। স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত মানসম্মত পোনা না পাওয়ায় অনেকেই নওগাঁর সান্তাহার, যশোর ও ঝিনাইদহের হ্যাচারির ওপর নির্ভরশীল। গাংনীর ষোলটাকা গ্রামের মাছ চাষি খাইরুল ইসলাম প্রায় ৬০ বিঘা জমির পুকুরে মাছ চাষ করেন। তিনি বলেন, রেণু-পোনা সংগ্রহের জন্য কখনো নওগাঁর সান্তাহার, আবার কখনো যশোরে যেতে হয়। এতে পোনা কেনার পাশাপাশি পরিবহন খরচও দিতে হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক সময় পোনা মারা যায়। আবার পোনার গুণগত মান নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয়। তার ভাষ্য, একসময় গাংনী সরকারি হ্যাচারি থেকেই মানসম্মত পোনা পাওয়া যেত। স্থানীয়ভাবে পোনা উৎপাদন শুরু হলে চাষিদের পরিবহন খরচ কমবে এবং পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকিও থাকবে না। তাই দ্রুত সরকারি হ্যাচারিটি চালু করার দাবি জানান তিনি। ষোলটাকা গ্রামের রেণু-পোনা ব্যবসায়ী ইব্রাহিম হোসেন জানান, প্রতি মৌসুমে তিনি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার পোনা নওগাঁর সান্তাহার ও যশোর থেকে সংগ্রহ করে স্থানীয় চাষিদের কাছে বিক্রি করেন। দূর থেকে পোনা আনতে গিয়ে পরিবহন খরচের পাশাপাশি দুর্ঘটনা, অর্থের নিরাপত্তা এবং পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তেরাইল গ্রামের মাছ চাষি রহমত আলী বলেন, একসময় গাংনী সরকারি হ্যাচারি থেকেই বিভিন্ন জাতের সাদা মাছের মানসম্মত পোনা পাওয়া যেত। এখন হ্যাচারি বন্ধ থাকায় বেশি দাম দিয়ে দূরের জেলা থেকে পোনা আনতে হচ্ছে।

‘মৎস্য গ্রাম’ ষোলটাকাতেও বাইরের পোনার ওপর নির্ভরতা
গাংনী উপজেলার ষোলটাকা গ্রাম ইতোমধ্যে ‘মৎস্য গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ চাষ, মাছ পরিবহন এবং মৎস্য খামারে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত।
বড় পরিসরে মাছ চাষ হলেও এই গ্রামের চাষিদেরও রেণু-পোনার জন্য বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্থানীয় মৎস্য উদ্যোক্তা আনসারুল ইসলাম বলেন, ২০০৫ সাল পর্যন্ত গাংনী সরকারি হ্যাচারিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন হতো। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আশপাশের জেলাতেও পোনা সরবরাহ করা হতো। সরকারি উদ্যোগে হ্যাচারিটি আবার চালু করা গেলে মেহেরপুরের পাশাপাশি আশপাশের জেলার চাষিরাও উপকৃত হবেন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে হ্যাচারির অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি জায়গার একটি অংশও প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত সংস্কার করে হ্যাচারিটি চালু করা প্রয়োজন।

মৎস্য খাতে বড় সম্ভাবনা
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুরে ১৪টি সরকারি বিল, একটি বাওড়, তিনটি নদী এবং প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। এসব জলাশয় থেকে বছরে প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়।
জেলায় রুই, কাতলা, মৃগেল, বাটা, মনোসেক্স, গ্রাসকার্প, পাঙ্গাস ও সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ হচ্ছে। চাষের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছর বাড়ছে রেণু ও পোনার চাহিদাও। কিন্তু স্থানীয়ভাবে সরকারি হ্যাচারি কার্যকর না থাকায় চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হচ্ছে বাইরের জেলার হ্যাচারি থেকে। এতে স্থানীয় অর্থ জেলার বাইরে চলে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। চাষিদের মতে, সরকারি হ্যাচারি চালু হলে স্থানীয়ভাবে মানসম্মত পোনার সরবরাহ বাড়বে। একই সঙ্গে কমবে পরিবহন ব্যয় ও পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকি। এতে মাছ উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি চাষিদের লাভও বাড়বে।

মৎস্য বিভাগের বক্তব্য
মেহেরপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, গাংনী সরকারি হ্যাচারি বন্ধ থাকার পেছনে প্রধান সমস্যা হচ্ছে লোকবল সংকট, পুকুরে পর্যাপ্ত পানি না থাকা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়া। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে হ্যাচারিটি উৎপাদনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে স্থানীয় মাছ চাষিরা সমস্যায় পড়ছেন।
তিনি জানান, জেলা সদরের সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি আগামী বছর উৎপাদনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে। সরকারি দুটি হ্যাচারি কার্যকরভাবে চালু করা গেলে মেহেরপুরে মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে। পাশাপাশি দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন ও সরবরাহও বাড়ানো সম্ভব হবে।

দ্রুত সংস্কারের দাবি চাষিদের
মেহেরপুরে মাছ চাষের পরিধি ও বাজার দুটিই ক্রমেই বাড়ছে। ছোট-বড় অসংখ্য খামারে চলছে বাণিজ্যিক মাছ চাষ। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতের অন্যতম মৌলিক উপকরণ রেণু-পোনার জন্য এখনো বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে চাষিদের। চাষিদের দাবি, প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ থাকা গাংনী সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি দ্রুত সংস্কার করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা হোক। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন, পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ এবং সরকারি জমি দখলমুক্ত করে হ্যাচারির কার্যক্রম পুনরায় চালু করা প্রয়োজন। হ্যাচারিটি চালু হলে মেহেরপুরের চাষিদের পোনা সংকট অনেকটাই দূর হবে, কমবে উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন ঝুঁকি। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার মৎস্য অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।