ঢাকাSunday , 23 August 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজনীতির পাঁচ দশকে বদলে যাওয়া এক পরিচয়: মির্জা ফখরুল

Link Copied!

 ছাত্ররাজনীতির কর্মী থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী, এরপর দীর্ঘদিনের দলীয় মহাসচিব—পরিচয়ের একাধিক ধাপ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতন, নির্বাচনী জয়-পরাজয় এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাঁর এই অবস্থানে পৌঁছানো। ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রজীবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি সক্রিয় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করে ১৯৮০-এর দশকে সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে এসে একপর্যায়ে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে জায়গা করে নেন তিনি। ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ এবং বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।

ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম, ঢাকায় শিক্ষাজীবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। মা মির্জা ফাতেমা আমিন। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ই তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সংগঠনটির এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি
রাজনীতিতে পূর্ণকালীনভাবে আসার আগে মির্জা ফখরুলের কর্মজীবনের বড় একটি সময় কেটেছে শিক্ষকতায়। ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। সরকারি চাকরির সময় তিনি সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করলে মির্জা ফখরুল আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে
১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা থেকে অব্যাহতি নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার পর ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান তৈরি হয়।

নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের অভিজ্ঞতা
জাতীয় সংসদে যাওয়ার প্রথম চেষ্টাতেই সফল হননি মির্জা ফখরুল। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ৩৬ হাজার ৪০৬ ভোট পেলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবার তাঁর ভোট বেড়ে ৫৮ হাজার ৩৬৯ হলেও জয় পাননি। তবে পরপর দুইবার নির্বাচনে পরাজিত হয়েও রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং দলীয় সংগঠন ও নির্বাচনী এলাকায় তাঁর কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে।

২০০১ সালে সংসদ সদস্য
তৃতীয়বারের চেষ্টায় ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জয় পান মির্জা ফখরুল। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১০ ভোট পান এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে তাঁকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

২০১৮ সালের নির্বাচন
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হন। বগুড়া-৬ আসনে তিনি নির্বাচিত হন। তবে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরবর্তীতে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয় এবং সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময়
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন। দীর্ঘ সময় তিনি দলটির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিরোধী দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন, নির্বাচন এবং জাতীয় ইস্যুতে বিএনপির বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান মুখ। দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায়ও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন
২০২৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। দলীয় মহাসচিবের পদ ছেড়ে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আসে নতুন মোড়। এর আগে যে পরিচয়ে তিনি দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের সম্ভাবনা।

ভোটে জয়
২০ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। ভোটগ্রহণ শেষে মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পান। অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। ফলাফল ঘোষণার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

বঙ্গভবনে শপথ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ২১ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কূটনীতিক এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। স্বাধীনতার আগে ও পরে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার। তিনি জিয়াউর রহমান সরকারের ভূমিমন্ত্রী এবং পরে খালেদা জিয়া সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্য চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের ডাইরেক্টরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিজীবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই মেয়ে রয়েছে। রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ঢাকার একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বলে জানা যায়। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন বলে জানা যায়। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন বলে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়।

পরিচয়ের বদলে যাওয়া অধ্যায়
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে পরিচয়ের বহু পরিবর্তন ঘটেছে। ছাত্ররাজনীতি দিয়ে যে পথচলা শুরু, সেখানে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতাও যুক্ত হয়েছে। এরপর পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব—প্রতিটি ধাপ তাঁকে জাতীয় রাজনীতির আরও কাছে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক জীবনে যেমন নির্বাচনী জয় এসেছে, তেমনি পরাজয়ও এসেছে। কিন্তু পরাজয়ের পরও তিনি রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থেকেছেন এবং দলীয় নেতৃত্বে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন পরিচয়। ছাত্ররাজনীতির কর্মী থেকে রাষ্ট্রপতি—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই পরিবর্তন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় বাঁক নয়; বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির দীর্ঘ পরিবর্তনের ধারারও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।