মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট (এমপিপি) বন্ধ বা চুক্তি বাতিলের আগে বিনিয়োগকারীদের জন্য কমপক্ষে ২০ বছরের নির্ধারিত মেয়াদ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।
একই সঙ্গে বিতরণ কোম্পানির (ডিআইএসকম) ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলে ‘ডিমড জেনারেশন’র বিপরীতে ক্ষতিপূরণ এবং গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অগ্রাধিকার চেয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের গাইডলাইন ও ট্যারিফ বিষয়ে গণশুনানিতে লিখিত প্রস্তাবে এসব দাবি জানায় বিএসআরইএ। সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। শুনানিতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদসহ কমিশনের সদস্য, সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা ও তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএসআরইএ’র প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ বা চুক্তি বাতিল করার আগে অন্তত ২০ বছরের নির্ধারিত মেয়াদ নিশ্চিত করতে হবে। সংগঠনটির মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বিনিয়োগকারীদের জন্য আইনি ও নীতিগত সুরক্ষা প্রয়োজন। এজন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রকল্পের ডেভেলপার এবং বিনিয়োগকারীর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সার্ভিস লিগ্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট করারও প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
ডিআইএসকমের ত্রুটিতে ক্ষতিপূরণ
বিএসআরইএ বলেছে, ডিআইএসকমের ত্রুটির কারণে ফিডিং ও ডিস্ট্রিবিউশন সাব-স্টেশন অকার্যকর হলে এমপিপি প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও সরবরাহ করতে না পারলে ‘ডিমড জেনারেশন’-এর বিপরীতে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর তা গ্রাহকের কাছে সরবরাহ না হলেও উদ্যোক্তার স্থায়ী ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক দায় বহাল থাকে। ফলে বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির দায় উদ্যোক্তার ওপর চাপানো উচিত নয়।
প্রথম ৫ বছর কম ট্যারিফের প্রস্তাব
দেশে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের উন্নয়ন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে উল্লেখ করে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রথম পাঁচ বছরের জন্য ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ শূন্য দশমিক ৫০ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে বিএসআরইএ।
সংগঠনটির মতে, এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। গ্রাহকদের কাছ থেকে ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ পোস্ট-পেমেন্ট ভিত্তিতে ত্রৈমাসিক হারে আদায়ের প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।
সৌরবিদ্যুতের ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৬.৪৮ টাকা
গণশুনানিতে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বেসরকারি মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ বিক্রির ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। কমিটির হিসাবে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিট স্থায়ী সম্পদের মূল্য ৩২৬ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নিয়ন্ত্রক কার্যকরী মূলধন বাবদ ৪৪ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা যোগ করে মোট মূল্যভিত্তি ধরা হয়েছে ৩৭০ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
এই মূল্যভিত্তির ওপর প্রস্তাবিত মুনাফার হার ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এতে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। জনবল, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসনিক ও সাধারণ ব্যয় এবং অবচয় মিলিয়ে মোট রাজস্ব প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৯ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।
কমিটির হিসাবে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিট উৎপাদন হবে ৯ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার ইউনিট। উৎপাদন ও নিট রাজস্ব প্রয়োজনের ভিত্তিতে ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা ট্যারিফ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অগ্রাধিকার দাবি
গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিএসআরইএ। অন্যান্য গৌণ উৎসের আগে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিডে ফিড করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি।
এছাড়া মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টে উৎপাদিত অব্যবহৃত বা উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ সরকারি খাতের ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিএসআরইএ। এ বিদ্যুতের মূল্য বিইআরসি নির্ধারিত গড় হারে পরিশোধের ব্যবস্থা রাখার দাবি জানিয়েছে তারা।
সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ পরিবহনের সময় হওয়া ক্ষতি বিপিডিবি ও সরকারের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া এবং বিভিন্ন ভোল্টেজ পর্যায়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য নির্ধারিত স্থির ভাড়া রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি।
শুল্ক-করে সমতার দাবি
সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর ও শুল্ক সুবিধায় সমতা আনার দাবি জানিয়েছে বিএসআরইএ। এসআরও ১৮১-এর ভাষা সংশোধন করে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট, স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী (আইপিপি) এবং করপোরেট বা শিল্প খাতের সৌরবিদ্যুৎ গ্রাহকদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও গ্রিড-সংযুক্ত অবকাঠামো আমদানিতে অভিন্ন শুল্ক ও কর অব্যাহতির প্রস্তাব দিয়েছে বিএসআরইএ। একই সঙ্গে এসআরও ৪০০ প্রবর্তনের মাধ্যমে ট্যারিফ শূন্য করার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
অফ-টেকার বা বিদ্যুৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এমপিপিকে বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হলে সরকারের হস্তক্ষেপের ব্যবস্থারও প্রস্তাব দিয়েছে বিএসআরইএ। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএসআরইএর মতে, বিনিয়োগবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত কাঠামো তৈরি করা গেলে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং ২০৩০ ও ২০৪১ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ওপেন অ্যাকসেসে গ্রাহকের ভোল্টেজ স্তর অনুযায়ী সিস্টেম লস কাটার প্রস্তাব
মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট (এমপিপি) থেকে সরাসরি গ্রিডে এবং বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ওপেন অ্যাকসেস ব্যবস্থায় এনার্জি ম্যানেজমেন্ট, সঞ্চালন ও বিতরণ লস নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত অপারেশনাল পদ্ধতি, বিলিং ও এনার্জি সেটেলমেন্ট সংক্রান্ত শর্তাবলিতে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৩২ কেভি বা তার বেশি ভোল্টেজের এমপিপি সরাসরি গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। গ্রিড-সংযুক্ত এমপিপি থেকে ২৩০, ১৩২, ৩৩, ১১ ও ০.৪ কেভি পর্যায়ে গ্রাহক বিদ্যুৎ কিনতে পারবেন। এছাড়া ডুয়াল-এন্ডেড বিতরণ ব্যবস্থায় এমপিপি নিকটবর্তী বিতরণ ব্যবস্থার ১১ বা ৩৩ কেভি পর্যায়ে সংযুক্ত হয়ে ওই বিতরণ ব্যবস্থার গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নেটওয়ার্কের দুই প্রান্তে ভোল্টেজ পর্যায় ভিন্ন হলেও সেটিকে প্রযোজ্য হিসাবের আওতায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, এমপিপি থেকে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গ্রিড ও বিতরণ নেটওয়ার্কের ভোল্টেজ পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের পরিমাণ ও লস হিসাব করা হবে।
সঞ্চালন লসের ক্ষেত্রে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি কর্তৃক মাসিক ভিত্তিতে প্রকাশিত গড় সঞ্চালন লস প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, গ্রিডের মাধ্যমে এমপিপি থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মাসে প্রকাশিত গড় সঞ্চালন লস হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এক বিতরণ ব্যবস্থার এমপিপি থেকে অন্য বিতরণ ব্যবস্থার গ্রাহক বিদ্যুৎ কিনলেও একই হারে সঞ্চালন লস প্রযোজ্য হবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভোল্টেজ অনুযায়ী বিতরণ লস কাটার সুপারিশ
সঞ্চালন লস বাদ দেওয়ার পর গ্রাহকের ভোল্টেজ পর্যায় অনুযায়ী প্রাপ্ত বিদ্যুতের ওপর বিতরণ লস কর্তনের প্রস্তাব করেছে বিইআরসি । এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্জিত ভোল্টেজ পর্যায়ভিত্তিক গড় সিস্টেম লস প্রযোজ্য হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৩২ কেভি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে ওই ভোল্টেজ পর্যায়ের অর্জিত সিস্টেম লস বিবেচনায় নেওয়া হবে। ৩৩ কেভি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে গ্রাহকের প্রান্ত পর্যন্ত ওই ভোল্টেজ পর্যায়ের গড় সিস্টেম লস এবং ১১ কেভি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলেও গ্রাহকের প্রান্ত পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের গড় সিস্টেম লস প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে, ০.৪ কেভি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হলে সামগ্রিক গড় হারে সিস্টেম লস বিবেচনা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে ওপেন অ্যাকসেসের মাধ্যমে এমপিপি থেকে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ে কতটুকু বিদ্যুৎ লস হবে, তা নির্দিষ্ট নিয়মে হিসাব করার সুযোগ তৈরি হবে।

