নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে স্বীকৃত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনসহ সব আন্দোলনের ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বুঝায় তার মধ্যে অন্যতম দৃষ্টি নন্দন হলো কার্জন হল। কিন্তু সেই কার্জন হল যেন তার সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। এর পেছনে কারণ হলো হলের সামনের ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তেমনি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে কার্জন হলের সৌন্দর্য। এত কিছু অনিয়ম সত্ত্বেও যেন দেখার কেউ নেই। সবাই ব্যস্ত পরস্পরের দোষারোপ নিয়ে।
দোকানদারদের বললে তারা দাবি করেন, সরকার দলীয় লোকজনদের টাকা দিলেই তারা পুলিশকে ম্যানেজ করে সেখানে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেন। আর পুলিশকে বললে তারা দাবি করেন, এটা সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এখতিয়ারে। তারা যেভাবে বলবে সেভাবেই কাজ হবে। এখানে তাদের কোনো হাত নেই। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে বললে তারা দায় চাপাচ্ছেন সিটি করপোরেশনের ওপর।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোয়েল চত্বরের মোড় থেকে শুরু করে হাইকোর্ট মোড় পর্যন্ত দুই পাশের ফুটপাতে সারি সারি গড়ে উঠেছে গাছের চারা বিক্রির অসংখ্য দোকানপাট। বলতে গেলে ফুটপাতে আর তীল ধারনের ঠাঁই নেই। সারা দেশ থেকে আনা ছোট ছোট গাছের চারাতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে দোকানগুলো। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারিরা যান বাহন চলাচলের রাস্তা হাটার কাজে ব্যবহার করছেন। এতে যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এসব অবৈধ চারা বিক্রির দোকানের কারণে কার্জন হল ও হাইকোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অংশ বিশেষও রাস্তা থেকে দেখা যায় না।
নিয়মিত ফুটপাত ব্যবহার করে কলাভবনে ক্লাস করতে আসেন দর্শন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জেরিন। তিনি বলেন, ‘দোকানপাটগুলো আমাদের চলাফেরার সবটুকু ফুটপাত দখল করে নিয়েছে। ধরতে গেলে ফুটপাত আমরা ব্যবহার করতেই পারি না। প্রত্যকদিন আমাদের ক্লাসে যেতে হয়। যানবহন চলাচলের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়তে পারি। কেউ না মরলে কি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের টনক নড়বে। শিক্ষার্থীর জীবনের চেয়ে বড় হলো তাদের ব্যবসা।’
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য স্থানে এমন অবৈধ ব্যবসা খুব কমই দেখা যায়। কেননা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রক্টোরিয়াল টিম আছেন তাদের অনেকটা তৎপর দেখা যায়। কিন্তু কার্জন হলের বেলায় যেন ঘটছে ঠিক উল্টোটা। এতোগুলো প্রক্টোরিয়াল সদস্য থাকা সত্ত্বেও কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা উদ্ধারে সিটি করপোরেশনের সহায়তা নিতে হবে এটা আমার বোধগম্য নয়। এর পেছনে নিশ্চয় অন্য কারণ আছে।’ কথাগুলো বলছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী।
ফুটপাতে এসব অবৈধ দোকান বাসানো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আর পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য পরস্পর বিরোধী। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবি করছে, এসব দোকান চলছে কিছু রাজনৈতিক নেতা আর পুলিশের হেফাজতে। কিন্তু শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাবি করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব অবৈধ দোকানপাট বসিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে তাদের কিছু করার নাই।
এ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোর (ভারপ্রাপ্ত) আমজাদ আলী দিলেন ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, ‘আমার আগের যিনি প্রক্টোরের দায়িত্বে ছিলেন তিনি শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সব ধরনের দোকানপাট উচ্ছেদ করেছিলেন।’ এসময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসন ও কিছু রাজনৈতিক নেতা এদেরকে আবার এখানে বসতে দেয়। সিটি করপোরেশনকে আমরা বার বার এগুলো সরানোর নির্দেশ দিলেও তারা কেউ কর্ণপাত করেনি।’
দোকানপাটের নানা দিক নিয়ে কথা হয় চারা বিক্রেতা কবির হোসেনের সঙ্গে। তিনিও একই তথ্য দেন। তিনি বলেন, ‘এটা আমার দুলা ভাইয়ের দোকান। তিনি দেশের বাড়িতে গেছেন তাই আমি দেখাশোনা করছি।’ কীভাবে আপনার দুলা ভাই এখানে দোকান নিয়েছে আপনি জানেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দোকান নেয়া হয়েছে। তারা প্রতি মাসে টাকা নেয়।’ তবে মাঝে মাঝে শাহবাগ থানার পুলিশকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
আরেক চারা বিক্রেতা মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘মার্কেট যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদেরকে টাকা দেই। উনারা পুলিশের সঙ্গে চুক্তি করে আমাদের এখানে ব্যবসা করতে দিয়েছেন।’ কারা মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দলীয় লোকজন।’ এর পর তিনি আর কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা এর আগেও নাই, পরেও নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তাদের এখানে বসিয়েছেন আমি কি করবো? এর আগে হাইকোর্টের ফুটপাতে বসানো হয়েছিল সেগুলো পরিষ্কার করেছি।’ ‘এখন প্রচুর গাছ থানায় আটক আছে’ দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যা বলবে আমরা তাই করবো।’ দোকানে পুলিশের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘কে বলেছে? নামটা আামাকে বলেন। আমি এখনি ফোর্স পাঠিয়ে ধরে নিয়ে আসছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব দোকান পাট পরিচালনার পেছনে স্বেচ্চাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা জড়িত। নিয়মিত চাঁদা আদায়ের প্রেক্ষিতে তারা এসব দোকানপাট বসতে দিয়েছে বলে সূত্রটি দাবি করেন।
এসম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দীক বলেন, ‘কোন ধরনের অবৈধ দোকানপাট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটপাতে বসতে দেয়া হবে না। অচিরেই এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হবে। এসবের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

