আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের সারদা গ্রুপের অর্থে জামায়াতের মাধ্যমে বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ ওঠা তৃণমূলের সাংসদ আহমেদ হাসান ইমরানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এই তদন্তের কথা জানান। কোলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক রিপোর্টে একথা বলা হয়েছে।
আজ শনিবার মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আইন আইনের পথেই চলবে। সরকার এতে হস্তক্ষেপ করব না।’
আনন্দবাজারের রিপোর্ট বলা হয়, ইমরানের ‘সন্দেহজনক’ ভূমিকা নিয়ে রাজ্যের গোয়েন্দা, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা এমনকি বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থাও যে সংশ্লিষ্ট মহলে নিয়মিত সতর্কবার্তা পাঠিয়ে এসেছে, তার প্রমাণ মিলেছে। এ বার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তদন্তের কথা জানিয়ে দেওয়ায় আরও এক দফা অস্বস্তি বাড়ল তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের।
তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে কাঠগড়ায় তুলে দাবি করেছে, ইমরান সংখ্যালঘু বলেই তাঁকে জড়িয়ে ‘অপপ্রচার’ চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি, দলীয় ওয়েবসাইটে আজ আনন্দবাজারকেও সরাসরি আক্রমণ করেছে তারা।
রিপোর্টে বলা হয়, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাজ্যসভার এক সাংসদের বিরুদ্ধে দেশবিরোধী কাজের অভিযোগ উঠেছে। তা ছাড়া, সারদা কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে সিবিআই, যারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। সেই কারণেই রাজনাথ আজ বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া এড়িয়ে যান বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা বলছেন, ইমরানের ভূমিকা কখনো সন্দেহের ঊর্ধ্বে ছিল না। দীর্ঘদিন তিনি নিষিদ্ধ মৌলবাদী সংগঠন স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া (সিমি)-র পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি ছিলেন। ২০০১ সালে সিমিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কেন্দ্র। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে, তত দিনে সিমির শিকড় গোটা দেশে ছড়িয়ে গিয়েছে। গোপনে ভারত-বিরোধী কাজে এখনও সক্রিয় তারা। জঙ্গি কাজকর্মের জন্য টাকাও তুলছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের ধারণা, এই ধরনের কাজে ইমরানের মতো প্রাক্তন সিমি নেতারাও জড়িত।
কেন্দ্রের গুরুতর জালিয়াতি তদন্ত সংস্থা বা এসএফআইও তাদের রিপোর্টে সম্প্রতি জানিয়েছে, সারদা গোষ্ঠীর টাকার একটি বড় অংশ আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় পাচার হয়ে গিয়েছে। হুণ্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে ওই টাকা পাচার হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না কেন্দ্র। ইমরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাচার হওয়া টাকার একটি অংশ তিনি দিয়েছেন জামাতের তহবিলে। সেই টাকা বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বলে গোয়েন্দাদের দাবি।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে গণহত্যার অপরাধে কাদের মোল্লার ফাঁসি ঘোষণা হওয়ার পর ধর্মতলায় বেশ কিছু সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়েছিল। জামায়াত ও সিমির মদতেই এটা হয়েছিল এবং তাতে ইমরানের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন অবশ্য বলেছেন, “বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশন থেকে এই (ইমরান) সংক্রান্ত কোনও রিপোর্ট আমরা পাইনি। গতকাল বিকেল চারটা নাগাদ যোগাযোগে ছিলাম। তখনও পর্যন্ত রিপোর্ট আসেনি।”
এ কথার সূত্র ধরেই তৃণমূলের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তৃণমূলের টাকা বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বলে আনন্দবাজারে যা প্রকাশিত হয়েছে তা সর্ম্পূণ ভুল।’
তবে কূটনীতিবিদদের একাংশের বক্তব্য, দু’দেশের সম্পর্ক জড়িত, এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে কখন ওই নির্দিষ্ট করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা হয় না। তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে ভাবে জোর দিয়ে তদন্তের কথা জানিয়েছেন, তাতেই বিষয়টি স্পষ্ট।
অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজ্যে বিজেপির পর্যবেক্ষক সিদ্ধার্থনাথ সিংহ বলেন, ওরা আদালতে গেলে ভালই হয়। আমি ওদের আদালতে স্বাগত জানাচ্ছি। সংখ্যালঘু বলে ইমরানকে আক্রমণ করার প্রশ্নই নেই।
সিপিএম সাংসদ মহম্মদ সেলিমের কথায়, ‘এগুলো চেনা রাজনীতির ছক! দুর্নীতিতে জড়িয়ে মায়াবতীও বলতেন, দলিত বলে তাঁকে নিশানা করা হচ্ছে। তৃণমূল বলছে, সংখ্যালঘু বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। বরং মুসলিম হিসেবেই ওই সাংসদের আরও ইমানদার হওয়া উচিত ছিল!’ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার বৃহত্তর
পরিকল্পনায় যেভাবে জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ হয়েছে, তা প্রতিরোধের চেষ্টা না করার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, অর্থসচিব এবং অর্থমন্ত্রীর ভূমিকাকেও তদন্তের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন সেলিম।
বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের প্রেক্ষিতে ইমরানের কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁকে জঙ্গি বলে উল্লেখ করেছিলেন সিদ্ধার্থনাথ সিংহ। শুক্রবার বেনিয়াপুকুর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ করেছেন ইমরান। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হবে।

