ঢাকাTuesday , 30 September 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঝরে পড়া, উপকূলীয় এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার একটি বড় চ্যালেঞ্জ

আয়শা সাথী
September 30, 2025 10:52 pm
Link Copied!

২০১৫ সালে জাতিসংঘ কতৃক প্রকাশিত SDG -২০৩০ এর ৪নং লক্ষ্য গুনগত শিক্ষা নিশ্চিতকরন। ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে শিশুদের সম্পূর্ন ফ্রি, সমান সুযোগ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এখানে বলা “Ensure inclusive and equitable quality education and promote lifelong learning opportunities for all”। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত ধারা ১৭-এ বলা হয়েছে -“রাষ্ট্র জনগণের শিক্ষাকে তার দায়িত্ব বলিয়া বিবেচনা করিবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে— (ক) সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা; (খ) নিরক্ষরতা দূরীকরণ; (গ) সমান সুযোগের ভিত্তিতে সর্বজনীন শিক্ষা—সুনিশ্চিত করিবে এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও গণমুখী ব্যবস্থা হিসাবে গড়ে তুলিবে।”

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এবং শিশুশ্রমের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়, উপকূলীয় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা একটি জটিল পরিস্থিতিতে রয়েছে—যেখানে বিপুল দারিদ্র্য, ঘন ঘন দুর্যোগ, দুর্বল অবকাঠামো, শিক্ষার স্থায়িত্বের অভাব এবং শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ একসাথে কাজ করছে। এর ফলে শিক্ষার গুণগত ও পরিমাণগত উভয় উন্নতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; একদিকে যেমন অনেক শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হচ্ছেনা, অন্যদিকে ৬ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী শেষে তারা কাঙ্খিত যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ইউনিসেফের মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা সহ বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে ৩.৫ কোটি শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে—স্কুলে পৌঁছতে না পারা বা বন্ধ থাকা নির্ধারিত ছিল । সিলেট, খুলনা, চট্টগ্রামসহ কিছু জেলা নিয়ে শিশুদের স্কুল বন্ধের সময়—সিলেটে ৮ সপ্তাহ, অন্য জায়গায় ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত—ঘাটতি হয়েছে।

BANBEIS ও DPE Annual Primary School Census 2022-23 অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে ঝরে পড়ার হার ১৩.৯৫% (ছাত্র: ১৪.৮৮%, ছাত্রী: ১৩.১৯%)। উপকূলীয় এলাকা ও শহরের বস্তি এলাকাগুলোতে এই হার আরও বেশি, যেখানে কিছু গবেষণায় ৪৫ % পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন: ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও শিশুশ্রম— এই চতুর্মুখী সংকট প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। ঘূর্ণিঝড়ে স্কুল ভবন ভেঙে যায় কিংবা দুর্গতদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ফলে পাঠদান প্রভাবিত হয় এবং পুনরায় চালু বিলম্ব হয় । উচ্চ শৈত্য কিংবা তাপ প্রবাহের কারণে স্কুল বন্ধ করতে হয়েছে কারন স্কুলে থাকলে শিক্ষার্থীরা তাপজনিত অসুস্থতায় পড়েছে, যার ফলে মনোযোগ ও শিক্ষা লাভ ব্যহত হয়। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর চরম দারিদ্র্যের কারণে পরিবারগুলি শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করে, যা এসডিজি-৪ (গুণগত শিক্ষা) এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। মে ২৭,২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্যা কান্ট্রি টুডে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাগরীয় উপকূল ও নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবনাঞ্চলসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ২০ মিলিয়ন শিশু এই ঝুঁকিতে। এর মধ্যে ১২ মিলিয়ন নদী ভাঙনের, ৪.৫ মিলিয়ন ঘূর্ণিঝড়ের এবং ৩ মিলিয়ন খরা বা পানির অভাবে সত্বাগত বিপদের সম্মুখীন।

শিশুশ্রমের কারণে বহু শিশু বিদ্যালয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে পারে না। উপকূলীয় দরিদ্রতার কারনে শিশু শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের সংখ্যা ২০১৩-এর ১৬.৯ লক্ষ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সালে প্রায় ১৭.৭ লক্ষ হয়েছে। UNICEF এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিতে প্রায় ২০ মিলিয়ন শিশু এবং প্রায় ৩.৪৫ মিলিয়ন শিশু শিশুশ্রমের সাথে জড়িত। দেশের উপকূলীয় এবং দুর্যোগ-প্রবণ এলাকায় শিশুদের —বিশেষ করে ঝিনুক/ছবি শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, ও তৈরি পোশাকখাতে কাজে প্রবেশের প্রবনতা প্রবল। লবনাক্ততার কারণে ফসল নষ্ট হওয়া, ভূমিধস, ঘরবাড়ি ক্ষয়, পুনর্বাসনে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পরিবারের আর্থিক সংকটে পড়ার ফলে তখন তারা তাদের স্কুলগামী সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে নানা উপার্জন উপযোগী এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিযুক্ত করে। এমনকি পরিবারগুলো আর্থিক সংকটের কারনে শিক্ষার্থীদের স্কুলের বদলে কাজ বা বিবাহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। দরিদ্র্যতা ও জলবায়ুর বিরুপ প্রভাবে সারা দেশে স্থানান্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার বর্তমানে প্রায় ১৪‑১৯% রেঞ্জে রয়েছে যা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ও ৬-১১ বছর বয়সী সকল শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরনের লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা। UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে জাতীয়ভাবে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার প্রায় ১৭ %, বিশেষ করে উপকূলীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষা বন্ধ ও পুনরায় ফিরে না আসার প্রবণতা বেশি।

উপরোক্ত বাস্তবতার নিরিখে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সময়োপযোগী সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি। এর জন্য প্রথমেই যেটি দরকার তা হলো উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও মান সম্পর্কে ধারণা স্পস্ট করা এবং প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টজনদের মতামত ও গবেষণার মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষায় দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও জলবায়ুর সম্মিলিত প্রভাব বিশ্লেষণ করে মানোন্নয়নের বাধাসমূহ চিহ্নিত করার পাশাপাশি উত্তরণের কৌশলসমূহ নির্ধারণ করা। দারিদ্র্য ও শিশুশ্রম শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষার মানের ওপর যে প্রভাব ফেলে এবং জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যে সকল শিক্ষার্থীরা ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় তা নিরূপণ করে বিদ্যমান সরকারি ও বেসরকারি কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষালাভের সমতাভিত্তিক নিশ্চয়তা।

আয়শা সাথী শিক্ষক ও গবেষক