ঢাকাTuesday , 11 February 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অপারেশন ডেভিল হান্ট : দূর হোক অস্থিরতা

তালুকদার রুমী
February 11, 2025 10:05 pm
Link Copied!

সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর, স্থাপনাসহ অন্যান্য বিভিন্ন ম্যুরাল-ভাস্কর্যে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি, নাশকতা, সরকারবিরোধী নানা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে যে বিশৃঙ্খলাময় ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের।চলমান পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগে গত ৮ ফেব্রয়ারি সন্ধ্যা থেকে দেশব্যাপী একযোগে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। দেশব্যাপী বিরাজমান বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কর্মকা- এবং সর্বশেষ গাজীপুরে ছাত্র-জনতার ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতেই শুরু এ অভিযান। অভিযানের প্রধান লক্ষ্য সার্বিকভাবে সমাজে স্থিতিশীলতা আনয়ন। অবৈধ অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ, নাশকতাকারী, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবের সময় থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্টে’ ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রায় দেড় হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। এর আগে দুপুরে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভায় যোগ দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ডেভিলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চলবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এই অপারেশনটা চলবে তত দিন পর্যন্ত, যত দিন পর্যন্ত ডেভিল এখান থেকে মুক্ত না হবে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের বাড়িতে মারধরের শিকার হন ১৫-১৬ জন শিক্ষার্থী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীরা ওই রাতে ডাকাতির খবর পেয়ে তা প্রতিহত করতে সেখানে গিয়েছিলেন। তখন তাঁদের মারধর করা হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যৌথ বাহিনী দেশজুড়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট শুরু করেছে। গাজীপুরে ছাত্র-জনতার ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে এক সভায় এই অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এদিকে কথিত আন্দোলন আর মবের মহড়া এখন থেকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করা হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি ১০ ফেব্রুয়ারি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে বলেন, অভ্যুত্থানের পক্ষে হলে মব করা বন্ধ করুন। আর যদি মব করেন তা হলে আপনাদেরও ডেভিল হিসেবে ট্রিট করা হবে। আজকের ঘটনার পর আর কোনো অনুরোধ করা হবে না। আপনাদের কাজ না আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। তিনি লিখেন, কথিত আন্দোলন আর মবের মহড়া আমরা এখন থেকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করবো। রাষ্ট্রকে অকার্যকর এবং ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করা হলে এক বিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না। তৌহিদী জনতা! আপনারা দেড় দশক পরে শান্তিতে ধর্ম ও সংস্কৃতি পালনের সুযোগ পেয়েছেন। আপনাদের আহমকি কিংবা উগ্রতা আপনাদের সে শান্তি বিনষ্টের কারণ হতে যাচ্ছে। উপদেষ্টা লিখেন, জুলুম করা থেকে বিরত থাকেন। না হলে আপনাদের ওপর জুলুম অবধারিত হবে। লা তাযলিমু না ওলা তুযলামু না-জুলুম করবেন না, জুলুমের শিকারও হবেন না। এটাই আপনাদের কাছে শেষ অনুরোধ! অতীতে হওয়া এমন অভিযানের মতোই ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অতীতে এমন অভিযান করার সময় যেসব প্রশ্ন উঠতো এবারের এই অভিযান নিয়েও প্রশ্ন জারি আছে।তারা বলছেন, অভিযানের নাম নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ সন্দেহভাজন হিসেবে কাউকে ধরা হলেও সে ‘ডেভিল’ বা শয়তান আখ্যা পাচ্ছে। অপরাধী ধরা হলে আইনেই তার বিচারের ব্যবস্থা আছে। ‘ডেভিল’ বা শয়তানের বিচারের কথাতো কোনো আইনে উল্লেখ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ঘোষণার পর থেকেই এ নিয়ে নানা আলোচনা। বিশেষ করে অভিযানের নাম নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। অভিযানের প্রথম দুইদিনে দেখা গেছে নিয়মিত এবং সাধারণ আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই গ্রেপ্তারকৃতরা কী ডেভিলের সংজ্ঞায় পড়বেন? বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক এ বিষয়ে বলেন, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নাম দিয়ে অভিযান চালানো মোটেও যৌক্তিক নয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কে দোষী আর কে নির্দোষ তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের না। এটি তো আদালতে নির্ধারিত হবে। এভাবে ডেভিল বা শয়তান বলে কারও অভিযান চালানো আইনের শাসনের পরিপন্থি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নাম যাই হোক এই অভিযান নিয়ে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। বিতর্কও তৈরি হয়েছে। এর আগে অপারেশন ক্লিনহার্ট নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রার শুরু থেকেই বড় রকমের ঝুঁকি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। যে কারণেই সরকারকে হয়তো এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। তবে এর মধ্যদিয়ে কোনো অবস্থাতেই যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন না ঘটে সে বিষয়ে নজর দিতে হবে। যাদের আটক করা হয়েছে, কোন মানদ-ে আটক করা হয়েছে তা প্রকাশ এবং তাদের জন্য ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এ বিষয়ে বলেন, ডেভিল তো অনেক বড় বিষয়। ফৌজদারি মামলার যারা আসামি তারা এই ডেভিলের সংজ্ঞায় পড়ে কিনা এই প্রশ্নতো উঠবেই। এ ছাড়া ডেভিলের বিচারের জন্য কোনো আইন আছে কিনা? যাদের ডেভিল বলে তারা মনে করছে তাদের প্রায় সবাই তো দেশ ছেড়ে চলে গেছে। যাদের এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হলো তারা সবাই ডেভিল কিনা এটাও একটা প্রশ্ন। তিনি বলেন, মানুষ প্রশ্ন করতেই পারে যে তারা বুঝে এই ডেভিল শব্দ ব্যবহার করেছে কিনা, নাকি এর পেছনে গোপন কোনো এজেন্ডা আছে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, অভিযানের নামে যে ডেভিল যুক্ত করা হয়েছে এই ডেভিলের সংজ্ঞা কি? তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযানের বিষয়ে এমন নানা প্রশ্ন অতীতে যেমনটা ছিল এখনো জারি আছে। বিশেষ করে মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি। কোনো ব্যক্তির বিনা বিচারে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, অতীতের সরকারের মতোই অন্তর্র্বতীকালীন সরকার এটা আমরা মনে করি না। তাই তাদের যেকোনো পদক্ষেপ চিন্তা করেই নিতে হবে। এই অভিযানে যাতে কারও মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয় তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ৯ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সম্প্রতি বিতর্কিত একটি পার্টির পলাতক কিছু নেতাকর্মী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সরকারবিরোধী নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তাদের নেতাকর্মীদের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। তাদের এসব উসকানিমূলক বক্তব্য শুনে দেশে থাকা ওই পার্টির নেতাকর্মীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।সম্প্রতি আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত পলাতক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। ফেসবুক উসকানিমূলক বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার উসকানি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার হয়। নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতা উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এসব বক্তব্য শুনে বিতর্কিত পার্টির কিছু নেতাকর্মী বিভ্রান্ত হয়ে পরিকল্পিতভাবে নানামুখী নাশকতামূলক কর্মকা-ে লিপ্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে সারা দেশ থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে সহ¯্রাধিক মানুষকে। তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।এর আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙচুরসহ দেশব্যাপী অস্থিরতার প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এক বিবৃতির মাধ্যমে চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এসব কর্মকা- থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়। উদ্বেগ জানায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সব মিলিয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে যৌথ বাহিনীর এ অভিযানকে ইতিবাচক বলছে একাধিক রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন। তারা মনে করছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এ অভিযান সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আমরা মনে করি, যে কোনো উপায়ে দেশব্যাপী বিরাজমান অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার অবসান অত্যন্ত জরুরি। কেননা এ অস্থিরতা দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, মানুষের ব্যক্তি-পারিবারিক জায়গায়। বহির্বিশ্বে ক্ষুন্ন করছে দেশের ভাবমূর্তি। এক কথায় দেশ অস্থিতিশীল হলে সার্বিকভাবেই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, যা যে কোনো দেশের জন্যই অশনিসংকেত। এমন একটি অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরানোর লক্ষ্যে সরকারের নতুন এ অভিযান যেন সফল হয়, এটাই সবার প্রত্যাশা।