ঢাকাSaturday , 8 February 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হাসিনার কর্মফলই জনতার এই প্রতিক্রিয়া

তালুকদার রুমী
February 8, 2025 10:46 pm
Link Copied!

দেড় দশক ধরে দুঃশাসন-দুর্বৃত্তায়ন, গুম-খুন, গণহত্যা ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা দেশের মানুষের মধ্যে যে সংক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানে তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ছাত্র-জনতার রোষানল থেকে বাঁচতে শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ফ্যাসিবাদের আইকন হিসেবে পরিচিত শেখ মুজিবের বিশালাকৃতির মূর্তি ও ম্যুরালগুলো ২৪-এর ৫ আগস্ট তাৎক্ষণিকভাবে ছাত্র-জনতার টার্গেটে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে নিপীড়ক স্বৈরশাসকের পতনের পর বিশ্বের দেশে দেশে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বিরোধীদের দলন-দমনে শেখ হাসিনার নিষ্ঠুরতা তাকে ইতিহাসের অন্যতম নির্দয়Ñনির্মম স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে। প্রতিবেশী দেশের ষড়যন্ত্রে তিনি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে চরম আঘাত করে রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে শুধুমাত্র অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সর্বাত্মক অপতৎপরতা চালিয়েছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি কোনো বার্তা দেননি। দিশাহারা নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার কথা না ভেবেই তিনি দিল্লীতে বসে দেশবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছেন। অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আন্দোলন দমনের নামে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার পর তার মধ্যে বা তার দোসরদের মধ্যে ন্যূনতম আত্মসমালোচনা বা অনুশোচনা দেখা যায়নি। গত কয়েকমাসে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে, ছাত্র সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে হত্যার হুমকিসহ নানা ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তার এসব কর্মকা- ছাত্র-জনতাসহ পুরো জাতির মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছে। পালিয়ে যাওয়ার ৬ মাসের মাথায় ৫ ফেব্রুয়ারি লাখো ছাত্র-জনতা বুলডোজার মার্চ করে শেখ পরিবারের স্বৈরতন্ত্রের আইকনিক সিম্বল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে অগ্নিসংযোগ ও এক্সকেভেটার দিয়ে ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিেেয়েছ। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাথে শেখ হাসিনার ভিডিও ভাষণে উস্কানিমূলক বক্তব্য ও কর্মসূচির জবাবে ছাত্র-জনতা ৩২ নম্বর গুঁড়িয়ে দেয়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পরও বাড়িটি অক্ষত ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার রাজনীতিতে ফিরতে ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগের অতীত ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে ১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সহায়তা নিয়ে ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হয়েছিল। তবে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে আত্মসমালোচনার বদলে প্রতিশোধই তাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত ১৬ বছর জাতি তাদের সেই প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ দেখেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস, টার্গেট কিলিং, গণহত্যা, প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো ঘটনার জন্মদাত্রী শেখ হাসিনা। জনতার অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েও ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের চক্রান্তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে নানামুখী চক্রান্তের প্রত্যক্ষ অংশীদার শেখ হাসিনা। আন্দোলনে ছাত্র হত্যা, গুম-খুন, নারী ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগকে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের নির্দেশদাতা এবং ঘোষণা দিয়ে তাদের সাথে অডিও ভাষণে উস্কানিমূলক নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ক্ষোভকে চরমে নিয়ে গেছে। ৫ ফেব্রুয়ারি হাসিনার টেলিভাষণের প্রতিবাদে পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে ছাত্র-জনতা জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনার নির্দেশে গণহত্যার তথ্যচিত্র, গণমাধ্যমে বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ এবং বুলডোজার দিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়ার কর্মসূচি নিতে বাধ্য হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, অভ্যুত্থানের ৬ মাস পর কেন ছাত্র-জনতাকে আবারো সিদ্ধান্ত নিয়ে বুলডোজার কর্মসূচি নিতে হচ্ছে? এর প্রধান কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সর্বত্র এখনো পতিত স্বৈরাচারের দোসররা বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা এখনো ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এখনো ধরা হয়নি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার প্রত্যাশিত উন্নয়ন ও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও পূরণ করতে পারছে না। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সারাদেশে দুর্বৃত্তায়নের সাথে জড়িত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একাংশকেও এখনো গ্রেফতার ও বিচারের সম্মুখীন করা হয়নি। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নামে রাজনীতি করার অধিকার থাকতে পারে না। গুম-খুন, অর্থ পাচার ও দুঃশাসনের সাথে জড়িত স্বৈরাচারের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করার পাশাপাশি স্বৈরাচারের আইকন শেখ মুজিবের মূর্তি, ভাস্কর্য, ম্যুরালগুলো উচ্ছেদ করার দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। আসল কাজে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও ধীরগতির কারণে বার বার ছাত্র-জনতাকেই রাস্তায় নামতে হচ্ছে। এটা কোনো সুখকর বিষয় নয়। এ ধরনের বাস্তবতা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং সরকারের সংস্কার ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সংগতকারণেই ছাত্র-জনতার ক্ষোভ শুধুমাত্র ধানমন্ডির ৩২ নম্বরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জুলাই বিপ্লবের ৬ মাস পর আবারো খুলনা, বরিশাল, ভোলা ও কুষ্টিয়াসহ বেশ কয়েকটি স্থানে হাসিনার আত্মীয়-স্বজন ও দোসরদের বাড়িঘর ছাত্র-জনতার আক্রমণের শিকার হয়েছে। জনগণের অর্থসম্পদ লুণ্ঠন করে গড়ে তোলা একেকটি অট্টালিকা ফেলে তারা পালিয়ে গেলেও তাদের গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করতে না পারায় ব্যর্থতার ক্ষোভ ছাত্র-জনতাকে আবারো আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য করেছে। গণহত্যা, দখলবাজি, ভুয়া নির্বাচন, রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি ও পাচারের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করা অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে গড়িমসি বা সময় ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। শেখ হাসিনার দেশবিরোধী তৎপরতার কারণেই সারাদেশে শেখ মুজিব ও শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের নাম, ভাস্কর্য, ম্যুরালগুলো বহাল থাকলে তা ছাত্র-জনতার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতেই পারে। শেখ হাসিনাসহ পলাতক স্বৈরাচারের দোসরদের গ্রেফতার করে বিচারের মাধ্যমেই কেবল জনগণের ক্ষোভ কমিয়ে আনা সম্ভব। বার বার জাতির সাথে প্রতারণা, দুঃশাসন, গণহত্যা, গণতন্ত্র ও বিদেশি চক্রান্তে রাষ্ট্রকাঠামো ধ্বংসের সাথে জড়িত হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের নামে আর রাজনীতি করার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই নিজের অবস্থান জাতির সামনে পরিষ্কার করার সাথে সাথে সংস্কারের লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে শেখ হাসিনার কর্মফলের এই প্রতিক্রিয়া দেশকে আরও অস্থির করে তোলার ষড়যন্ত্র কিনা সেটাও ভেবে দেখতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্রের পথে এই যে নতুন যাত্রা তা ব্যাহত হতে পারে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়ি, শেখ মুজিবের ম্যুরাল এবং মুজিব পরিবারের সদস্যদের নামসম্বলিত ফলক ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এ ধরনের ঘটনা উসকে দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছে প্রায় সব দলই। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাকেও দায়ী করেছেন কেউ কেউ। দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি বলছে, এত মানুষের মৃত্যু ও ১৫ বছরের নির্যাতনের ক্ষোভ মানুষের মধ্যে জমে ছিল। এ ঘটনায় আরও একবার মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনাকে রাজনীতির মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত বলে মনে করছে জামায়াতে ইসলামী। কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়া কাম্য নয় বলেই মত দলটির। এই ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। তারা বলছে, গণহত্যার দায় স্বীকার না করলে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তবে বিশৃঙ্খলার জন্য সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নাগরিক ঐক্য ও গণঅধিকার পরিষদ। এই ঘটনায় সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেই মত দল দুইটির।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, এত লোকের মৃত্যু হয়েছে, শহীদ হয়েছে, মানুষ তো বিক্ষুব্ধ ছিল গত ১৫ বছরের নির্যাতনে। ভাষণের খবর আসায় সেই ক্ষোভ দূর হওয়ার আগেই নতুন করে ক্ষোভকে উসকে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী বলছে, রাজনৈতিক বিষয়গুলোর জন্য যে উত্তেজনা তা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করা উচিত। দলটির মুখপাত্র মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মনে করি রাজনৈতিক বক্তব্য রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা দরকার। কারণ একটা শক্তি বা একটা মবকে আরেকটা শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে গেলে সেখানে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সৃষ্টি হয়। অতীতে তা-ই দেখা গেছে। এই ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী বলে মনে করছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি ‘ফ্যাসিস্টের প্রতীক’ হিসেবে উল্লেখ করে এ ঘটনাকে যথাযথ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন।