ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কে ‘বরফ গলতে শুরু করেছে’ এমনটা বলেছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেছিলেন। এরপর তিন মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখন ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের বরফ কতটুকু গলেছে তা জানা না গেলেও বাংলাদেশের সাথে সে দেশের সম্পর্কের বরফ যে আরও জমাট বেঁধেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৫৩ বছরের ইতিহাসে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বর্তমানে সবচেয়ে শীতল। এর আগে এদেশের কোনও সরকারের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এতটা নাজুক হয়নি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাদের দেশের মিডিয়ায় বা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এই প্রচারণাকে এক ধরনের মিডিয়া যুদ্ধ বলছেন অনেকে। কারণ এই অপপ্রচার বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। যা দু দেশের জন্যই বিপদ জনক।ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীওগত ১৩ জানুয়ারি বলেছেন, প্রতিবেশীদের মধ্যে বিদ্বেষ কারো জন্যই ভালো না। তা কখনো কোনো পক্ষের জন্যই ভাল ফল বয়ে আনবে না। ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে গত বছর ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন তিনি পালিয়ে ভারতে চলে যান। তখন থেকেই আওয়ামী লীগের প্রথম সারির এবং সামনে থাকা নেতারা লাপাত্তা। তারা কেউ পালিয়ে গেছেন। আবার কেউ কেউ আত্মগোপন করে আছেন বলে মনে করা হয়। ওই সময় থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে বাংলাদেশের। কারণ, একজন পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী- যার নামে গণহত্যাসহ একাধিক মামলা হয়েছে, তাকে আশ্রয় দিয়েছে নয়া দিল্লি। এ বিষয়টিকে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার ভালোভাবে নিচ্ছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকটি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার চেষ্টা করে ভারত। তা নিয়ে আরও উত্তেজনা দেখা দেয়। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সেনাপ্রধানের সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের বক্তব্য মনে করিয়ে দিয়ে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, তিনি বলেছেন- কৌশলগত কারণে ভারত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দিক দিয়েও বিষয়টা একই। কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রতিবেশী, আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে, পরস্পরকে বুঝতে হবে। কোনো ধরনের বিদ্বেষ আমাদের কারো স্বার্থের জন্যই ভালো হবে না। দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে কোনো ‘সমস্যা নেই’ দাবি করে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, যখন পরিবর্তনটা হল (বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল), তখন থেকেই আমি বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। এমনকি গত ২৪ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সেও আমাদের কথা হয়েছে। বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে যদি বলতে হয়, সেটা আগের মতই চলছে। আমাদের অফিসাররা সেখানে এনডিসিতে যোগ দিয়েছেন। ওই পক্ষ থেকেও কোনো সমস্যা নেই। শুধু একটা বিষয়, যৌথ মহড়া যেটা হতো, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেটা সাময়িকভাবে স্থগিত আছে। যখনই পরিস্থিতির উন্নতি হবে, আমাদের মহড়াও হবে। ভারতের সেনাপ্রধান বলেন, এখন যদি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে বলতে হয়, সম্পর্কের কথা আমরা তখনই বলতি পারি, যখন একটি নির্বাচিত সরকার থাকবে। সেনাবাহিনী পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো এবং একদম ঠিক আছে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ভারতের বিভিন্ন কার্যকলাপ নিয়ে কড়া ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন। বিজেপি সমর্থিত ভারতীয় গণমাধ্যমে রাজনৈতিক সহিংসতাকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে প্রচারের ক্রমাগত মিথ্যাচারের পাশাপাশি দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-সমর্থকদের উসকানি, ভারতে বাংলাদেশের উপ-মিশনে হামলা ও জাতীয় পতাকার অবমাননা, সীমান্ত হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। নানা কারণে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও দৃশ্যমান ভারতবিরোধিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতে, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পাশাপাশি ভারত সরকারের সমালোচনাও করা যেত না। একটা ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। এখন সরকারি তরফে কোনও বাধা না থাকায় বাংলাদেশের জনগণও প্রকাশ্য ভারত সরকারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করছেন। প্রকাশ্য ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গুম-খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ শোনা যায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির মধ্যম সারির জনপ্রিয় নেতা ইলিয়াস আলী টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণসহ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হয়েছিলেন।সরকারের একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান সরকারবিরোধী লেখার কারণে যে-সব লেখা ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছিল সে কারণে গুম হয়েছেন বলে মনে করেন। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে ব্রি. (অব.) আযমীও অভিযোগ করেছেন, তিনি ভারতবিরোধিতার কারণে গুমের শিকার হন। বুয়েটের ছাত্র আবরার ভারত ও বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের নীরবতা এবং ভারতবিরোধিতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখার কারণে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বেসরকারি ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তাজবির হোসেন শিহানও ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিয়ে লেখালেখি করায় খুন হয়েছেন বলে তার সহপাঠীরা অভিযোগ করেছেন। এমন উদাহরণ আরও অনেক রয়েছে। আমাদের দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা তো কেউ অস্বীকার করে না। দক্ষিণ এশিয়ায় তো এটি একটি অপরিহার্য বাস্তবতা। ভারতেও মুসলমানরা তো ব্যাপকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। বিগত সরকারের সময় দেশে যেসংখ্যালঘু নির্যাতন হয়নি তা নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রধান বিচারপতিকে তো ভয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এরকম অনেক ঘটনাই রয়েছে। কিন্তু সে সময় ভারতীয় মিডিয়াতো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এরকম ভয়াবহ প্রচারণা চালায়নি? এখন কেন এতো অপপ্রচারে নেমেছে ? ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের কথা সবারই মনে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া তো বিশ্বব্যাপী প্রচার করেছিল যে ইরাকের ব্যাপক মাত্রায় বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে যার মধ্যে আছে রাসায়নিক এবং জীবাণু অস্ত্র। বিশ্ব জনমতের সমর্থনের জন্য এই ন্যারেটিভ যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগী দেশগুলো খুব ভালোভাবে ব্যবহার করে এবং বিশ্ববাসী তা বিশ্বাস করা শুরু করে। পরবর্তীতে ইরাক ধ্বংসের পরে এর কোনও সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এর জন্য বিশাল মূল্য ইরাককে দিতে হয়েছে।মনে রাখতে হবে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলে এ অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। দু’দেশের জনগণই উপকৃত হবে। কিন্তু এ সম্পর্ক ন্যায্যতা ও সাম্যের ভিত্তিতে হতে হবে, সেটিই বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা।বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন বা দেশের কথিত ইসলামাইজেশন নিয়ে ভারতীয় একশ্রেণির মিডিয়ার বাড়াবাড়িতো ইতিমধ্যে অনেকদূর গড়িয়েছে। ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর এ প্রচারণার ফলাফল কী হতে পারে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক হচ্ছে। সে দেশে নির্বাচনের আগমুহূর্তে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিয়ে ট্রাম্পের টুইটের কারণে এ শঙ্কা জাগিয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া ইদানীং যা প্রচার করেছে তা অনেকাংশেই বিগত সরকারের সময়ে সৃষ্ট। আওয়ামী লীগের সরকার ভারত এবং পশ্চিমের অনেক দেশকেই বোঝাতে চেয়েছে যে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে আওয়ামী লীগ অপরিহার্য। সেটা গণতন্ত্রের বিনিময়ে হলেও হোক। সেই প্রচারণা যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়নি সেটা আওয়ামী লীগের দীর্ঘশাসন প্রমাণ করে। বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদি যে ক’বার এসেছেন প্রতিবারই ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ করেছে। এসব রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিতে, ভারতে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙেছে মোদির দল বিজেপি ও আরএসএস। তারা মুসলমানদের হত্যা করেছে। গুজরাট দাঙ্গায় মোদির নিষ্ক্রিয়তার কারণে শত শত নিরীহ মুসলিম খুন হয়েছে। এ কারণে মোদির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নিষেধাজ্ঞাও পর্যন্ত আরোপ করেছিল। মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক রাজ্যে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন বেড়েছে। মোদির সফরের বিরোধিতা করায় ইসলামি দলগুলোর নেতাকর্মীরাও গুম-খুন-হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সেসব ঘটনায় একাধিক হত্যা মামলাও দায়ের করা হয়েছে। আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই, ভারত প্রতিবছর বিভিন্ন সেক্টর থেকে ১০০ জন তরুণকে সে দেশে নিয়ে যায় ভারত সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য। ভারতসহ বিশ্বের কয়টি দেশের সাথে বাংলাদেশের এধরনের প্রোগ্রাম আছে?নেই। বিশ্বের কয়টি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফ্যাকাল্টি ও স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম আছে? নেইতো। আজ যদি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর অনেক ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি থাকতো, তারাই তো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে কথা বলতেন। বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মনে করি। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এক্ষেত্রে কী করতে পারে ? ভারতের সাথে অবশ্যই আমাদের সুসম্পর্ক থাকতে হবে এবং তা হতে হবে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। ভারতকে এটা বোঝাতে হবে যে, তাদের দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক হতে হবে বাংলাদেশের জনগণের সাথে, কোনও নির্দিষ্ট একটি দলের সাথে নয়। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সকল পথই বাংলাদেশকে খুঁজতে হবে।মনে রাখতে হবে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলে এ অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। দু’দেশের জনগণই উপকৃত হবে। কিন্তু এ সম্পর্ক ন্যায্যতা ও সাম্যের ভিত্তিতে হতে হবে, সেটিই বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা।

