ঢাকাSaturday , 11 January 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভ্যাট-কর বৃদ্ধির গণবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে

Link Copied!

অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক দুটি সিদ্ধান্ত শুল্ক-কর বৃদ্ধি এবং টিসিবির ট্রাক সেল কর্মসূচি বন্ধ স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় নীতির অদূরদর্শিতা এবং অসামঞ্জস্যের প্রতিফলন। এটা একবারেই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত। প্রথম সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শতাধিক পণ্যের ওপর শুল্ক-কর বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা জনসাধারণের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মূল্যস্ফীতির উচ্চ মাত্রা বর্তমানে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে এবং এভাবে শুল্ক-কর বাড়ানো আরও বেশি চাপ তৈরি করবে। এর ফলে বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।এক বছরের বেশি সময় ধরেই দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন ঘটেছে; কখনো খাদ্যে, কখনো খাদ্য বহির্ভূত খাতে, কখনো আবার সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে দুই অংকের ঘর। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়েও ওষুধ, এলপি গ্যাস, মোবাইলে ফোনের সিম কার্ডের মত প্রয়োজনীয় পণ্যসহ শতাধিক পণ্য ও সেবায় আমদানি, উৎপাদন, সরবরাহ পর্যায়ে শুল্ক ও কর বাড়ল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকার শুল্ক-কর বাড়ানোর সহজ পথ বেছে নিয়েছে। আর এই পদক্ষেপে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ‘গণবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেছেন রাজনীতিকদের কেউ কেউ। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করেন রাষ্ট্রপতি। তাই অধ্যাদেশ জারি করে শুল্ক-কর বাড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ৯ ডিসেম্বর রাতে ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ এবং ‘দ্য এক্সাইজ অ্যান্ড সল্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ নামে এ দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তার আগে ১ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে মূল্য সংযোজন কর-ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক বাড়াতে এনবিআরের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অধ্যাদেশ জারির পরপরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে; এতে তা সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে গেছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও এনবিআর দাবি করেছে, এতে ভোক্তার বাড়তি মূল্য গুনতে হবে না। শুল্ক-কর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে অর্থ উপদেষ্টা দাবি করেছিলেন, এ পদক্ষেপে নিত্যপণ্যের বাজারে ‘প্রভাব পড়বে না’। কর আদায়কারী সংস্থা এনবিআরও একই সুরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে দাবি করেছিল, মূল্যস্ফীতিতে ‘প্রভাব পড়বে না’। তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, যেসব পণ্যে ট্যাক্স বেড়েছে, সেগুলোর দাম তো বাড়বে। প্রভাব পড়বে না বলা হলে, বোধ হয় তা বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়। তিনি বলেন, ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) অনুযায়ী এসব পণ্যের ওজন কম, দর কম, সেজন্য হয়ত মূল্যস্ফীতির হারের উপর খুবই কম প্রভাব পড়বে। যেসব পণ্যের দাম বাড়ানো হল অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে যেগুলো ১৫ শতাংশের নিচে ছিল সেগুলোকে ১৫ শতাংশে উঠানো হয়েছে। তার মানে ভ্যাট রেইট ইউনিফিকেশন (একীভূতকরণ) মানে সব পণ্যে একই ভ্যাট হবে এটা তো একটা নীতি ছিল সরকারের। এর মধ্যে অনেক অব্যাহতি ছিল। ওই অব্যাহতিগুলোকে তুলে নেওয়া হচ্ছে। কারণ রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। রাজস্বে তো এখন পর্যন্ত কোনো প্রবৃদ্ধি নেই। শুল্ক ও কর বাড়ানোর জন্য এই সময়টাকে যথোপযুক্ত মনে করছেন না এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, এখানে সময়টি প্রশ্নবিদ্ধ। যখন খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও প্রায় দুই অংকের ঘরে, সেরকম একটা সময়ে ভ্যাট, ট্যাক্স বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবতার নিরিখে কতটা যৌক্তিক সে প্রশ্ন করা যেতে পারে। যদি একীভূত করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে সেটা তো আগামী বাজেটে করা যেত। ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তির শর্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাড়তি ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে বলেছে। ‘সে কারণে’ অর্থবছরের মাঝপথে এসে এভাবে হঠাৎ শুল্ক ও করের বোঝা বাড়ানোর পথে হাঁটে সরকার। পণ্য ও সেবার তালিকায় চাল, ডাল, আটা, ভোজ্য তেলের মত পণ্য না থাকলেও যেসব পণ্য ও সেবার শুল্ক-কর বাড়ানো হয়েছে, এগুলোর বেশির ভাগ বর্তমান সময়ে প্রয়োজনীয় হওয়ায় তা খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কমে খাদ্য বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। নভেম্বরে যা ছিল ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। কিচেন টাওয়াল, টয়লেট টিস্যু, ন্যাপকিন টিস্যু, ফেসিয়াল টিস্যু, হ্যান্ড টাওয়াল, সানগ্লাস, নন-এসি হোটেল, মিষ্টান্ন ভান্ডার, প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটা, নিজস্ব ব্র্যান্ড সম্বলিত তৈরি পোশাকের শো-রুম বা বিপণি বিতানে পণ্য ও সেবা বিক্রিতে থাকা বিদ্যমান ভ্যাট বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতদিন তা সাড়ে ৭ শতাংশ ছিল। বৈদ্যুতিক খুঁটি, মোটর গাড়ির গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ, ডক ইয়ার্ড, ছাপাখানা, চলচ্চিত্র স্টুডিও, চলচিত্র প্রদর্শনী (সিনেমা হল), চলচ্চিত্র পরিবেশক, মেরামত ও সার্ভিসিং, স্বয়ংক্রিয় বা যন্ত্রচালিত করাতকল, খেলাধুলা আয়োজক, পরিবহন ঠিকাদার, বোর্ড সভায় পণ্য যোগানদাতা, টেইলারিং শপ ও টেইলার্স, ভবন রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা, সামাজিক ও খেলাধুলা বিষয়ক ক্লাবে সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এটি সত্যিই অত্যন্ত আশ্চর্যজনক এবং উদ্বেগজনক যে বর্তমান সরকার কর আয় বাড়ানোর জন্য পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রার নির্ভরতা আরও বাড়াচ্ছে। পরোক্ষ কর সাধারণত সাধারণ জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কারণ, এসব কর সরাসরি পণ্যের মূল্য বা সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং জনগণ এগুলোর পুরো বোঝা বহন করে।বিশেষ করে যখন মূল্যস্ফীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের কর বৃদ্ধির ফলে গরিব ও মধ্যবিত্ত জনগণের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। অথচ সরকার যদি তাদের রাজস্ব নীতির পুনর্বিবেচনা করে এবং ধনীদের কাছ থেকে আরও কর আদায় করার পথে পদক্ষেপ নেয়, তবে তা বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। টিসিবির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে দরিদ্র জনগণের জন্য সহায়তার পরিসর সংকুচিত করা হয়েছে, যা মূলত সরকারের অর্থনৈতিক নীতি এবং জনগণের প্রয়োজনের মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। এই পদক্ষেপে শুধু দরিদ্র জনগণের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে না, বরং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা এবং বিশ্বাসও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।বর্তমানে, দেশে কিছু ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকি দেয় বা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কর রেহাই পেয়ে থাকে। এরা উচ্চ মূল্যের পণ্য ও সেবা বিক্রি করলেও, তাদের আয় ও সম্পত্তির ওপর যথাযথ কর আদায় করা হয় না।এই বৈষম্য সমাজে ন্যায্যতা ও আস্থা নষ্ট করে এবং দেশীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। যদি সরকার তাদের কর ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নিত এবং কর ফাঁকি দেওয়া ধনীদের থেকে প্রকৃত কর আদায় করত, তবে সরকারের রাজস্ব আয় আরও শক্তিশালী হতে পারত। বিশেষ করে, যারা অবৈধভাবে কর ফাঁকি দেয়, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব।এভাবে সরকার যদি পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে, প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে ধনীদের কাছ থেকে কর আদায় বৃদ্ধি করতে পারত, তবে তা দেশের অর্থনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্থিতিশীল করে তুলতে পারত। জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমতার ভিত্তিতে কাজ করা সরকারের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য বয়ে আনতে পারে। কিন্তু যদি সরকার শুধু পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেয়, তাহলে তা কেবল সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে।
অন্যদিকে, টিসিবির ট্রাক সেল কর্মসূচি বন্ধ করার সিদ্ধান্তটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। টিসিবির এই কর্মসূচি দরিদ্র জনগণের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। যেখানে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং মানুষের আয় স্থিতিশীল নয়, সেখানে এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার দরিদ্র জনগণের সহায়তা বাড়ানোর সুযোগ পেত। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তটি একে অপরের সঙ্গে মিল রেখে চলা বাস্তবতার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।এই সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে সরকারের মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো সঠিক সমন্বয় নেই। সরকারের উচিত ছিল, এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে দরিদ্র ও সাধারণ জনগণের সহায়তার পরিসর বাড়ানো এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।কিন্তু সরকার এই পরিস্থিতিতে আরও কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা জনগণের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। সরকারের উচিত ছিল তাদের রাজস্ব নীতি পরিবর্তন করে সরাসরি প্রভাবিত জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে, কর আদায়ে ধনী শ্রেণির ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। আশা করি, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় দ্রুত হবে এবং তারা জনগণের প্রকৃত প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ও সদর্থক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।