পতিত ও বিতাড়িত স্বৈরাচারের আমলে সিন্ডিকেটবাজরা সক্রিয় ছিল। বাজার থেকে শুরু করে পরিবহন, টেন্ডার, সরকারি ক্রয়-বিক্রয়, আমদানি-রফতানিসহ এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে সিন্ডিকেটবাজি ছিল না। সিন্ডিকেটবাজ কারা ছিল, তা বিশদভাবে বলার অবকাশ নেই। সবাই জানে, তারা ছিল সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সরকারের কাছের মানুষ ও অনুগত ব্যবসায়ী। সে সময় সিন্ডিকেট নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা সিন্ডিকেট নির্মূল করার বহু হুংকার শোনা গেছে। সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য সরকারের প্রতি অনেকে তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু সরকার কারো কথাই শোনেনি। সরকার মুখে অনেক কথা বললেও ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেয়নি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। তখন নিত্যপণ্যের দাম কখনো স্থিতিশীল হয়নি। সব সময় ওঠানামা করেছে। ১০ টাকা বেড়েছে তো পরে ৫ টাকা কমেছে। আবার সেই পণ্যের দামই আরো পরে ১৫ টাকা বেড়েছে। অকারণ, অহেতুক দাম বাড়ার খেসারত দিতে হয়েছে ক্রেতা-ভোক্তাদের। চাল, ডাল, ডিম, তেল, চিনি, আটা, পেঁয়াজ-রসুন মশলাপাতি, তরিতরকারি ইত্যাদি সকল নিত্যপণ্যের দামই যথেচ্ছ বেড়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সিন্ডিকেট ভাঙার ব্যাপারে তার অক্ষমতার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। জানিয়েছেন, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী, তার একথা থেকেই সম্যক উপলব্ধি করা যায়। স্বৈরাচারের বিদায়ের সময় মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি এতটাই বেড়েছিল যে, অতীতের সর্বোচ্চ রেকর্ড স্পর্শ করেছিল। ১০/১২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ঘটলে সাধারণ ও দরিদ্র-অতিদরিদ্র মানুষের অবস্থা কতটা নাজুক হয়ে পড়ে, তা বলে বুঝানো যাবে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির জেরে অগনন নির্দিষ্ট ও অল্প আয়ের মানুষ তাদের পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছিল। খাওয়া কমিয়ে দিয়েছিল। অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনও তারা পূরণ করতে পারেনি অর্থাভাবে। পূর্বাপর অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝেছিল, ওই সরকার বিদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সেই স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। তার পতনের পাঁচ মাস ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়েছে। ছাত্র-জনতা সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার এখন ক্ষমতায়। কিন্তু এখনো বাজার পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। বাজার সিন্ডিকেট এখনো দৌর্দন্ড- প্রতাপে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রণি সম্পদ উপদেষ্টা বাজার সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্বীকার করে বলেছেন, বাজার সিন্ডিকেট এখনো আছে। হাত বদলের মাধ্যমে দাম বাড়ছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি তা নিয়ন্ত্রণের। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে এবং দৈনন্দিন দরকারি পণ্যের দাম যাতে যৌক্তিক পর্যায়ে থাকে সেজন্য বাজার তদারকি করতে জেলায় জেলায় বিশেষ টাস্কফোর্স করেছে সরকার, যা ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন বাজারে পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখা ও দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার কার্যকর মেকানিজম বা কৌশল না থাকার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। এ সমস্যার ‘স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী’ সমাধান টাস্কফোর্স দিয়ে সম্ভব হবে বলে মনে করেন না তারা। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অনুবিভাগের দায়িত্বে থাকা যুগ্মসচিব মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম বলেন, সরকার এখন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এটাই এখন বড় সমস্যা। এর সমাধানে আরও পরিকল্পিতভাবে কাজ করতেই আমরা টাস্কফোর্সের প্রজ্ঞাপন জারি করেছি এবং তখন থেকেই এটা কার্যকর। এখন তারা (টাস্কফোর্স) নিজেরা বসে বাজার তদারকি করবেন। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভুঁইয়া বলেন বাজার পরিস্থিতি দেখে তাদের কাছে মনে হয়েছে যে দাম বাড়াচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। আমনের খরা মৌসুমে চালের দাম কমার কথা থাকলেও উল্টো যেভাবে বাড়ানো হয়েছে সেটা কারসাজি। আশা করছি টাস্কফোর্সের মনিটরিং শুরু হলে এর সুফল পাওয়া যাবে। যদিও অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন বাজারের সংকট অনেক গভীর এবং ছোটখাটো যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে আপাতত কিছুটা লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে লাভ হবে না। টাস্কফোর্স যদি জেলা পর্যায়ে কার কাছে কোন পণ্য কতটা মজুত আছে সেই তথ্য নিতে পারে। এটা করে মজুত রেখে মুনাফার চেষ্টা কিছুটা কমতে পারে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বাজার ব্যবস্থাপণা ঠিক করতে হবে। শুধু মাত্র টাস্কফোর্স দিয়ে হবে না। বিশ্ব বাজারের চালের দাম কমেছে। অথচ আমাদের দেশে চালের দাম হু হু করে বাড়ছে। আমনের ভরা মৌসুম চলার সময়ও দাম না কমে বেড়েছে। আমনের উৎপাদন এবার কম হয়েছে। সংরক্ষিত খাদ্যপণ্যের মজুদও কমেছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার চাল আমদানির অনুমতিসহ শুল্ক হ্রাস করেছে। ব্যবসায়ীদের কিছু সুযোগ-সুবিধাও দিয়েছে। এতে প্রতি কেজি চালের আমদানি মূল্য ২৫ দশমিক ৪৪ টাকা কমার কথা। অথচ, বাজারে এর প্রভাব নেই। উল্টো এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম কেজিতে অন্তত ৮ টাকা বেড়েছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিই এর কারণ, তাতে সন্দেহ নেই। ক্যাবের মতে, চাল ব্যবসায়ীদের ফ্রিস্টাইল মনোভাবের কারণে চালের দাম কমছে না। চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের আশু হস্তক্ষেপ চেয়েছে ক্যাব। চালের মূল্যবৃদ্ধির জন্য মিল মালিক, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরাই দায়ী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না কেন, সেটাই প্রশ্ন। বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের পাশাপাশি পরিবহন সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও কারো অজানা নেই। পরিবহনে চাঁদাবাজি আগের মতই সরবে ও প্রকাশ্যে চলছে। কৃষক পর্যায়ে কোনো পণ্যের দাম যা, ভোক্তা পর্যায়ে সেই পণ্যের দাম ১২ থেকে ১৫ গুণ বেশি হতেও দেখা যায়। একটি ফুলকপি বা বাঁধাকপির দাম গ্রামে দুই টাকার বেশি নয়। সেই কপিই ঢাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৫/৩০ টাকায়। এই যে দামের ব্যবধান, তার জন্য বার বার হাত বদল যেমন দায়ী, তেমনি পরিবহনে চাঁদাবাজিও দায়ী। কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। ভোক্তাও কম দামে পণ্য পাচ্ছে না। মধ্যসত্ত্বভোগী ও চাঁদাবাজরা সব খেয়ে ফেলছে। চালসহ যাবতীয় কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেটবাজি বহাল আছে। চালের দাম, চিনির দাম, তেলের দাম বিশ্ববাজারে কমেছে। আমাদের দেশে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। চিনির দাম কমেনি। তেলের দাম আরো বেড়েছে। বলাবাহুল্য, সিন্ডিকেজবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে কোনো পণ্যের দামই কমবে না। বাজার স্থিতিশীল হবে না। সামনে পবিত্র রমজান মাস। এ মাসকে সামনে রেখে সিন্ডিকেট এখনই সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। ভোজ্য তেলের বাজার ইতোমধ্যে কারসাজির মাধ্যমে অস্থিতিশীল করে ব্যবসায়ীরা কেজিতে ৮ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়েছে। সরকার কিছুই করতে পারছে না।
সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন উঠেছে, স্বৈরাচারের আমলে সিন্ডিকেটবাজি ও চাঁদাবাজি চলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা চলতে পারছে কীভাবে? দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক খবরে জানা গেছে, স্বৈরাচারের আমলে বিদ্যমান সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় আছে। কোথাও কোথাও সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের পরিবর্তন হয়েছে। চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সিন্ডিকেটবাজদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে বিএনপির নামদারি সিন্ডিকেটবাজরা। বিগত সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগ পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি করেছে। এখন তাদের জায়গায় চাঁদাবাজি করছে বিএনপি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সম্পর্কিত খবরাখবর প্রকাশিত হতে দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা, আওয়ামী লীগের লোকেরা এতদিন যা করেছে, তা যদি এখন বিএনপির লোকেরা করে, তাহলে দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা যাবে কীভাবে? বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বপর্যায় থেকে সিন্ডিকেটবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ইত্যাদিতে লিপ্ত না হওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হলে দলের তরফে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই বেশকিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তারপরও সিন্ডিকেটবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিতে বিএনপির লোকদের নাম উঠছে কেন? বিষয়টি শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। সিন্ডিকেটবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি আগেও ছিল, এখনো আছে, অন্তর্বর্তী সরকারকে এটা স্বীকার করলেই চলবে না। এসব অপকর্ম ও অপরাধ যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করতে হবে। এ সবের সঙ্গে যারাই জড়িত এবং তারা যে দলেরই হোক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন উপদেষ্টার মতে, বাজারে তিন ধরনের সিন্ডিকেট আছে। যথা: আগের সরকারের সিন্ডিকেট। আগামী সরকারের সিন্ডিকেট। স্থানীয় প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেট ভাঙার দায়িত্ব সরকারেরই। সরকারকে এ ব্যাপারে নিরব হয়ে বসে থাকলে চলবে না। ব্যবস্থা নিতে হবে, তা যত কঠোরই হোক। গণস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে।

