ঢাকাMonday , 6 January 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজধানী ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হবে

Link Copied!

এক সময়ের তিলোত্তমা নগরী ঢাকা মানুষের বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন ক্রমাবনতিকাল চলছে। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এমন একটা সময় আসবে, যখন মানুষ বাঁচার জন্যই স্বেচ্ছায় এ শহর ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পরিবেশ দূষণসহ এমন কোনো দূষণ নেই, যা সর্বোচ্চ মাত্রায় উপনীত হয়নি। গতকালও বিশ্বে বায়ুদূষণের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে রাজধানী ঢাকা। গতকাল বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (আইকিউএয়ার) সূচক থেকে জানা গেছে বিশ্বের বায়ুদূষণ তালিকার শীর্ষে অবস্থান করা ঢাকার দূষণ স্কোর ২৬৬ অর্থাৎ এই শহরের বাতাস খুবই অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। এক সময় সকালে ঘুম ভাঙতো পাখির কলকাকলিতে। আর এখন রাজধানীবাসীর ঘুম ভাঙে যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজের ভারী যন্ত্রপাতির আওয়াজ আর মাইকের কর্কশ শব্দে। এটাই এখন ঢাকা শহরের বাস্তব চিত্র। এ শহরের শব্দদূষণ দিন দিন একটি গুরুতর সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের স্বাস্থ্যকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাজধানীতে হকাররা তাদের পণ্য বিক্রির জন্য মাইক ব্যবহার করে, যা অনেক সময় সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বাজার, বাসস্ট্যান্ড কিংবা আবাসিক এলাকাতেও তারা এই মাইক বাজায়। ফলে শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষদের জন্য এটি চরম বিরক্তিকর এবং ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। স্কুল ও হাসপাতালের মতো জায়গাগুলোও এই শব্দদূষণের বাইরে নয়। এ ছাড়া যানবাহনের হর্ন, বিশেষত হাইড্রোলিক হর্ন, শব্দদূষণের আরেকটি বড় কারণ। হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ এতটাই তীব্র যে তা শ্রবণশক্তি নষ্ট করার মতো ক্ষতি করতে পারে। যানজটে চালকদের অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানোর প্রবণতা এই দূষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশের এই রাজধানী শহরটি অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এখনো তার সম্প্রসারণ চলছে যথেচ্ছভাবে। স্বাধীনতার সময় এখানে ছিল কয়েক লাখ লোকের বসবাস। ৫৪ বছরে লোকসংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি। লোক যে হারে বেড়েছে সেই হারে সেবাসুবিধা অর্থাৎ গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট, পরিবহন ইত্যাদি বাড়েনি। ঢাকা দেশের মানুষের কাছে স্বপ্নের শহর। সরকারের মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন দফতর, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বেসরকারি অফিস, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির কেন্দ্রভূমি হওয়ায় মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে এ শহরে ছুটে আসে। এমন একটা ধারণাও মানুষের মধ্যে জন্মেছে যে, ঢাকায় এলেই কাজ পাওয়া যাবে, কিছু না কিছু করে আয়-রোজগার করা যাবে, বেঁচে থাকা যাবে। ফলে গৃহহারা, অসহায়, কর্মপ্রত্যাশী মানুষ দলে দলে এই শহর চলে আসে। আসা কমেনি বরং বেড়েছে। প্রথমে বস্তিতে ও রাস্তাঘাটে আশ্রয়। পরে কোনো না কোনো কাজে যেমন, কুলিগিরি, ঠেলাচালক, রিকশাচালক, বেবিচালক, হকারি, ফুটপাতে কিছু না কিছুর ব্যবসাপাতিতে লেগে পড়া। ব্যাস, হয়ে গেলো! ঢাকা শহরে এখন লোকে লোকারণ্য। পা ফেলার জায়গা পাওয়া যায় না। গণপরিবহনে ওঠা যায় না। ফুটপাত দিয়ে হাঁটা যায় না। এ শহরে যত লোক বাস করে তার ৪০ শতাংশ বস্তিতে বাস করে। এক সময় ঢাকাকে বলা হতো মসজিদের শহর। এটা অচিরেই বস্তির শহরে পরিণত হবে। মানুষ বাড়লে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ইত্যাদির চাহিদা বাড়ে। অন্যান্য সব কিছুর চাহিদাও বাড়ে। বিদ্যুতে ঘাটতি আছে। ফলে লোডশেডিং করতে হয়। গ্যাসেরও ঘাটতি আছে। অনেক সময় চুলা জ্বলে না। ঢাকা ওয়াসা প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করতে পারে না। অনেক এলাকায় ওসার পানি ময়লা-দুর্গন্ধময়। এসব সেবার ক্ষেত্রে মানুষের দুর্ভোগ-বিড়ম্বনার শেষ নেই। প্রকৃত গ্রাহকরা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। মারাত্মক দূষণের পাশাপাশি এ শহর ময়লা-আবর্জনারও শহর। গৃহবর্জ্য তো বটেই, এমন কি, ড্রেনের ময়লা আবর্জনাও রাস্তার পাশে রাখা হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য উন্মুক্ত ময়লা-আবর্জনা অত্যন্ত ক্ষতিকর। মশার উপদ্রব প্রচন্ড। ডোবা-নালা, উন্মুক্ত নর্দমা মশার প্রজননক্ষেত্র। সার্বিক দূষিত-পরিবেশের কারণে এখানে বিভিন্ন রোগ ব্যাধিও বেশি। যানজট ঢাকার একটি বড় সমস্যা। যানজটের কারণে ১০ মিনিটের রাস্তা যেতে অনেক সময় দু’ ঘণ্টাও লেগে যায়। যানজটে আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষতির যে বিবরণ বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষায় উঠে এসেছে, তা লোমহর্ষক। রাজধানী শহর ২৪ ঘণ্টা সচল ও সক্রিয় থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে ঢাকা ব্যতিক্রম। প্রতিদিন এ শহর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অচল হয়ে থাকে। যানজট নিরসনে অনেক কিছু করা হয়েছে, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ইত্যাদি। কিন্তু যানজট না কমে বরং বেড়েছে এবং বাড়ছে। এখানে যে পরিমাণ রাস্তাঘাট ও তদনুযায়ী পরিবহন থাকার কথা, তা নেই। ফলে কংক্রিটের স্তূপ বেড়েছে, যানজটের নিরসন হয়নি। রাস্তাঘাট যা আছে, তার অবস্থাও ভালো নয়। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির উৎসব চলে সারা বছর। এই সঙ্গে খানাখন্দে ভরা অধিকাংশ রাস্তা। কাটাকুটি করা ও খানাখন্দে ভরা অপ্রশস্ত রাস্তা দিয়ে চলাচল করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সহজেই অনুমেয়। মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। বর্ষা ও বৃষ্টিপাতের সময় ঢাকা শহর সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নয়, দিনের পর দিন রাস্তাঘাটে পানি জমে থাকে। এই পানিজটের প্রধান কারণ অপর্যাপ্ত ও অপ্রশান্ত ড্রেন, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম এবং পানি নিকাশে প্রাকৃতিক উৎসসমূহ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এক সময় এই শহরে প্রচুর খাল-নালা ছিল। এগুলো ছিল সবসময় প্রবাহমান। এদের সঙ্গে সংযোগ ছিল ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর। ফলে বর্ষা-বাদলের পানি সঙ্গে সঙ্গে ময়লা আবর্জনা নিকাশ হয়ে যেতো। ড্রেনের ময়লাও একইভাবে নিকাশ হয়ে যেতো। এখন খাল-নালা খুব কমই অবশিষ্ট আছে, দখল হয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গাসহ আশপাশের নদী দখল-দূষণে মৃতপ্রায়, বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। খাল-নালা উদ্ধার, নদীদূষণ রোধ, অবৈধ দখল থেকে তা মুক্ত করার অনেক ঘোষণা ও উদ্যোগ অতীতে লক্ষ করা গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি কাড়িকাড়ি অর্থের অপচয় ছাড়া। পতিত স্বৈরাচারের আমলে দুই সিটির দুই মেয়র বায়ুুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ থেকে শুরু করে খাল উদ্ধার, বুড়িগঙ্গাসহ অন্যান্য নদীর দূষণ রোধে, পানিজট ও যানজট নিরসনে লম্বা লম্বা অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পাঁচ মাস পূর্ণ হলো। এই সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন যিনি তিনি পরিবেশ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। সুস্থ সুন্দর পরিবেশের জন্য তিনি দীর্ঘদিন থরে আন্দোলন করছেন। এখন দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনিও কথার ফুলঝুরি ছড়াচ্ছেন। এখনো কাজ কিছু দেখাতে পারেননি। ঢাকার ২১টি খাল উদ্ধার এখনো কর্মপরিকল্পনার মধ্যে আবদ্ধ। নদীগুলো দূষণমুক্ত করাও একই পর্যায়ে। পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। এখন নাকি নতুন উদ্যোগ চলছে। ঢাকার শব্দদূষণ কমাতে বিধিমালা চূড়ান্ত হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলেছেন। দেখা যাচ্ছে, পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত আছেন উপদেষ্টা। কাজ এখনো দূর অস্ত। পরিবেশ উপদেষ্টা ঢাকাবাসীকে হাইড্রোলিক হর্ন থেকে বাঁচানোর ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র বায়ু দূষণকারী লক্কড়-ঝক্কর, ফিটনেসহীন যানবাহন বন্ধ হবে কবে? এ ব্যাপারে আরো পাঁচ মাস সময় নেয়া হয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। বাসযোগ্য ও পরিবেশসম্মত ঢাকা গড়ার কাজটি মোটেই খুব সহজ নয়। গত ৫৪ বছর ধরে ঢাকাকে তিলোত্তমা নগরী রূপে গড়ে তোলার কথা অনেকেই বলেছেন। বাস্তবে সেই তিলোত্তমা নগরীর দেখা পাওয়া যায়নি। উল্টো এ নগরী বসবাসের প্রায় অযোগ্য হয়ে গেছে। এই নাজুক অবস্থা থেকে ঢাকাকে উদ্ধার করতে হলে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক সরকার নয়। রাজনৈতিক সরকারের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে। দলীয় স্বার্থ থাকে। ফলে যা করা দরকার তা অনেক সময় করতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সেই অর্থে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। দলীয় স্বার্থ নেই। তার আছে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা এবং এই দায়বদ্ধতা প্রতিপালনে বিস্তর স্বাধীনতা। সুতরাং, এই সরকারকে ঢাকাকে বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব এগিয়ে নিতে হবে। ডিসেন্ট্রালাইজেশানে জোর দিতে হবে। গ্রামে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে, যাতে শহরের মানুষকে গ্রামে পাঠানো সম্ভব হয়। কর্মসংস্থান এবং মানবাধিকারের কথা বলে তাদের শহরে ধরে রাখার কোনো মানে নেই। ঢাকাকে কাম্য লোকসংখ্যায় স্থিতিশীল করা গেলে সর্ব প্রকার দূষণের মাত্রা কমবে। চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ইত্যাদির সংস্থান সম্ভব হবে। খাল-নদী উদ্ধার ও দখল-দূষণ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দখলবাজ সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে হবে। ড্রেনেজ সিস্টেমের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত ও লাগসই করতে হবে। পরিবেশে এসবের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং পানি জটের উপশম হবে। যানজট কমাতে সড়ক ব্যবস্থপনা ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। বাস টার্মিনালগুলো আরো দূরে সরিয়ে দিতে হবে। রিকশা, থ্রিহুইলার ও ছোট যান চলাচল কমাতে হবে। পুরানো ও ফিটনেসহীন যানবাহন উঠিয়ে দিতে হবে। অধিক সংখ্যক যাত্রীধারণক্ষম গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বলা বাহল্য, এসব ব্যবস্থা নিলে ঢাকার বাসযোগ্যতার উন্নয়ন হবে। মানুষ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে, নিরাপদ হবে। বসবাসের জন্য একটি আদর্শ সুন্দর শহর হিসাবে গড়ে উঠবে রাজধানী ঢাকা।