ঢাকাSunday , 5 January 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জুলাই প্রোক্লেমেশন এবং গণ-ভাবনা

Link Copied!

ঘটনাবহুল ২০২৪ সালের শেষদিন ৩১ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেপ্রোক্লেমেশন অব জুলাই রেভ্যুলেশন বা জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র পেশ করার কথা ছিল। আয়োজক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।বলা হয়েছিল, এই ‘জুলাই প্রোক্লেমেশন’ হবে ‘আগামীর বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র’। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে এর মাধ্যমে জার্মানির ‘নাৎসি বাহিনীর’ মতো অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করা হবে। একইসঙ্গে ১৯৭২ সালের মুজিববাদী সংবিধানের কবর রচনা করা হবে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গণসহ সারা দেশব্যাপি বলা যায় তোলপাড় চলছিল। যে ঘোষণাপত্র ওই দিন পাঠ করা হবে বলে শোনা যাচ্ছিলো, তার একটি কপি দুদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে যায় অথবা ছড়িয়ে দেওয়া হয় গণ-ভাবনা বোঝার জন্য। তবে ওই দিন সত্যিই কী ঘোষণা দেওয়া হবে, সংবিধান বাতিল করে একটি বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হবে কি না, যদি এরকম ঘোষণা আসে তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত বিএনপির প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেনাবাহিনীই বা বিষয়টিকে কীভাবে নেবে, এসব নিয়ে জনমনে যখন নানা প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হচ্ছিলো এবং এই কর্মসূচি ঘিরে কোনো নাশকতা ঘটে কি না বা ঘটানো হয় কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের ঠিক আগের রাতে দৃশ্যপট পাল্টে যায়।প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম শুরুতে এই কর্মসূচির সঙ্গে সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং এটি একটি প্রাইভেট ইনিশিয়েটিভ (ব্যক্তিগত উদ্যোগ) বলে দাবি করলেও ৩০ ডিসেম্বর রাতে তিনিই জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে বললেন, অন্তর্বর্তী সরকারই এরকম একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করবে, যেখানে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকবে।এই ব্রিফিংয়ের পরেই ধারণা করা হয় যে ৩১ ডিসেম্বর বিকেলে শহীদ মিনার থেকে জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র পেশ করার কর্মসূচি হয়তো বাতিল হয়ে যাবে, না হয় কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনা হবে।হলোও তাই শেষ পর্যন্ত কর্মসূচিতে পরিবর্তন এনে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ নামে শহীদ মিনারে বর্মসূচি পালন করা হয়। আর সেখান থেকে জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রকাশের জন্য সরকারকে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। এসব মিলিয়ে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশের বিষয়টিগেল সপ্তাহের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠে। ৩১ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আগামী ১৫ জানুয়ারি ২০২৫-এর মধ্যে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশে সরকারকে সময় বেঁধে দিয়েছে। সমগ্র জাতি এখন অপেক্ষা করছে, যে ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তাতে কী কী থাকছে। মূলত ঘোষণাপত্রটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। জাতির আগামী দিনের পথচলার একটি দিকনির্দেশনা। ফ্যাসিবাদের পতনের পর গঠিত সরকার অর্থাৎ বিপ্লব-পরবর্তী সরকারের বৈশিষ্ট্য ও কর্মকা- নিয়ে চলছে নানান অলোচনা-সমালোচনা। অনেকের মতে এটি একটি দুর্বল সরকার যাকে বৈপ্লবিক সরকার বলা যায় না। তাদের কথায় যুক্তি আছে সন্দেহ নেই। তবে সরকার ইতোমধ্যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতে নিয়েছে, যাকে অসাধারণ বলতে হবে। প্রথমত, পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের দ্বারা মানবতাবিরোধী যে নির্মম গণহত্যা ও নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার ন্যায্যবিচারের উদ্যোগ নেয়া। নিয়তির কী পরিহাস, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যে ট্রাইব্যুনাল ও বিধি-বিধান স্বৈরাচার হাসিনা সরকার তৈরি করেছিল প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বিচারে, ওই আদালত ও আইন-কানুন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি বর্তমান সরকারের একটি সাহসী উদ্যোগ। চিফ প্রসিকিউটর বলেছেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানদ- মেনে ন্যায়বিচার করা হবে। যদি বিচারের কাজটি সঠিকভাবে করা যায় তাহলে সেটি একটি বিপ্লবী সরকারেরই সাফল্য হবে। দ্বিতীয়ত, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকার সর্বক্ষেত্রে দেশ ও জনগণের যে ক্ষতি করে গেছে তার প্রতিবিধানে ব্যাপক সংস্কার কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। দশটি কমিশন নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিবেদন প্রণয়নে এবং সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে দু-একটি বাদে বাকি প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে আশা করা যায়। অতীতে যেসব সংস্কার কমিশন বা কমিটি গঠিত হয়েছিল সেগুলো ছিল সরকারের প্রভাবান্বিত। সরকারের অভিপ্রায় প্রতিবেদনগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছিল। যদিও সুপারিশগুলোর সামান্য বাস্তবায়িত হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সঠিকভাবে উপলব্ধি করে বিপ্লবের শুরুতে বলেছিলেন যে, সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ এসেছে তা বারবার আসবে না; এবার সুযোগের সদ্ব্যবহারে ব্যর্থ হলে নিকট ভবিষ্যতে আর সুযোগ পাওয়া যাবে না। আর সেজন্য ড. ইউনূসের সরকার উল্লিখিত দু’টি কাজ অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে, যাকে বৈপ্লবিক কাজ বলতে হবে। আমাদের বিশ্বাস জনগণের বৃহদংশ সরকারের এ দু’টি উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন। এখন দেখার বিষয় যে, বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে কী বয়ান থাকবে। বাংলাদেশ তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বারবার রাষ্ট্র গঠন, আত্মপরিচয় বিনির্মাণ ও নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করেছে। প্রথমত, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হয়ে পাকিস্তান গঠন ছিল একটি বিরাট স্বপ্ন; আমাদের পূর্ব-পুরুষ নবাব সলিমুল্লাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রমুখ নেতা তাদের জীবন-যৌবনের মূল সময় ব্যয় করেছেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও কুচক্রী রাজনীতিকদের স্বার্থবাদী মানসিকতা ও উন্নাসিকতায় পূর্ব বাংলার জনগণ বিক্ষুব্ধ হন এবং যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে দেশ স্বাধীন করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাপতিসহ অনেকে তখন প্রতিবেশী দেশের কুমতলব বুঝতে পারলেও বৃহত্তর স্বার্থে তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিগত ৫৩ বছরে বাকিরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, ভারত আমাদের সত্যিকারের বন্ধু নাকি বন্ধুবেশী শত্রু। বাংলাদেশের জনগণ অন্তত তিনবার গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশালের বিরুদ্ধে, ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদের পতনে। প্রতিটিতে জনগণ জয়লাভ করেছেন। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তিন তিনটি অপশক্তির জুলুম-নির্যাতনের যে তিক্ত ও অভিশপ্ত শাসন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তার ফল হচ্ছে জুলাই বিপ্লব। বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে নিশ্চয় এসবের প্রতিফলন থাকবে।আমেরিকান বিপ্লবের সময় আব্রাহাম লিঙ্কন গেটিসবার্গের ঐতিহাসিক ভাষণে গণতান্ত্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়ে আছে : জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের সরকার। ১৭৮৯ সাল থেকে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরব্যাপী লড়াইয়ের পর ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। ১৭৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে তিনটি প্রধান নীতির কথা বলা হয় : স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব। রুশ কমিউনিস্ট বিপ্লবের অব্যবহিত পরে ১০ নভেম্বর ১৯১৭ সালের সরকারি দলিলে বলা হয় যে, দেশের জনগণ সকলে রাশিয়া প্রজাতন্ত্রের নাগরিক এবং সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে তারা সমান অধিকার পাবেন। ১৯৪৯ সালে মাও জে দঙয়ের নেতৃত্বে চীনে যে কমিউনিস্ট বিপ্লব হয় তার পেছনে ছিল মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা ও সর্বহারার সরকার প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭৯ সালে সংঘটিত ইরানের ইসলামী বিপ্লবের উদ্দেশ্য সম্পর্কে দেশটির সংবিধানে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ইসলামের আলোকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলা হয়। ২০১০-২০১১ সালে সংঘটিত আরব বসন্ত বা গণ-আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল : ‘বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭০ সালে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যেই ম্যান্ডেট প্রদান করিয়াছে সেই ম্যান্ডেট অনুযায়ী আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ আমাদের সমন্বয়ে গণপরিষদ গঠন করিয়া পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য ‘সাম্য’, ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ-এ রূপান্তরিত করার ঘোষণা প্রদান করিতেছি। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রস্তাবে বলা হয়, ‘আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’ এটি ছিল স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অনেকটাই বিচ্যুতি। যা হোক, বাংলাদেশের মূল সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১১তে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। এ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রের আংশিক প্রতিফলন ঘটেছিল। পরবর্তীতে অবশ্য ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করে জাতির সাথে চরম প্রতারণা করা হয়।
২০২৪ সালের বিপ্লবকে অনেকে দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলছেন। সুতরাং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে ইতিহাসের কী বয়ান থাকবে তা বেশ প্রাসঙ্গিক। শিক্ষার্থী ও জনতা যে বৈষম্যবিরোধী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা নিয়ে লড়াই করেছিলেন তার বহিঃপ্রকাশ নিশ্চয় বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে স্থান পাবে। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে জাতীয় ঐক্য ও জনগণের বৃহদংশের অভিপ্রায় সঠিকভাবে তুলে ধরবে এবং তাই হবে আগামী বাংলাদেশের পথচলার পথনকশা।