ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের দু:শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ তাদের দাবিনিয়ে সরকারের কাছে হাজির হতে থাকে। এতে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পতিত সরকারের দোসরাএ পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষে বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরংস্কারের জন্য ১৫টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই কমিশনগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। এরমধ্যে প্রশাসন সংস্কার কমিশনারের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর একটি বক্তব্য নিয়ে আমলাদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। গত ১৭ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন,উপসচিব পদে পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের ৫০ শতাংশ ও অন্য সব ক্যাডারের ৫০ শতাংশ রাখার জন্য সুপারিশ করা হবে। একইসঙ্গে বিসিএস শিক্ষা ও বিসিএস স্বাস্থ্যকে ক্যাডার হিসাবে না রেখে জুডিশিয়াল সার্ভিসের মতো আলাদা আলাদা কমিশন হবে। বলাই বাহুল্য, এখনো প্রশাসন সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট চূড়ান্ত করা হয়নি, প্রকাশও করা হয়নি। তার এই বক্তব্য নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সচিবালয়ের ভেতরে ও বাইরে তুমুল শোডাউন করেছেন। তারা সরকারকে হুমকি দিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রশাসন সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশন প্রধানের অপসারণ দাবি করেছেন। ওদিকে বৈষম্য নিরসন পরিষদের কোনো কোনো অ্যাসোসিয়েশন কলমবিরতি ও মাবনবন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। আমলাদের এমন আন্দোলন তাদের চাকরি বিধি লঙ্ঘন বলে অনেকে মনে করেন। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রতিবাদের নামে আমলারা যা করেছেন তা চাকরি বিধি লঙ্ঘন। এই চাকরির নিয়ম লঙ্ঘনকারী আমলাদের পাশাপাশি আগের শাসনামলের দুর্নীতিবাজ আমলাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা আমলাদের কাছ থেকে বিবৃতি শুনছি। তারা এক ধরনের হুমকি দিচ্ছে। পূর্ববর্তী শাসনামলে তারা এই ধৃষ্টতা অর্জন করেছিল যখন আমরা আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী হতে দেখেছি। রাষ্ট্রকে শক্তভাবে দাঁড়ানোর জন্য আমলাতন্ত্রকে শক্তভাবে দাঁড়াতে হয়। আমলাতন্ত্রকে পেশাদারির সঙ্গে শক্তভাবে দাঁড়ানোর জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। রাজনীতি ঠিক না হলে আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনযন্ত্র কখনো ঠিক হবে না।বলা হয়, আমলাতন্ত্র সরকারের অংশ। সরকারের যাবতীয় কর্ম পরিচালিত হয় আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে, আমলাদের সহযোগিতায়। তাই যখন কোনো সরকার ভালো করে, তখন তার কৃতিত্বের ভাগ আমলাতন্ত্রও পায়। যখন ব্যর্থ হয়, তখন তার আংশিক দায় তার ওপরও বর্তায়। এই নিরিখে বিগত স্বৈরাচার যা কিছু করেছে, তার দায় দেশের আমলাতন্ত্র এড়িয়ে যেতে পারে না। এটা কারো অজানা নেই, প্রশাসন ও পুলিশ পতিত স্বৈরাচারকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করেছে। অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন, বিচার বিভাগ, দুদক, এনবিআর, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির অধিকর্তা ও আমলারা একইভাবে সরকারকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছেন। বিগত সাড়ে ১৫ বছর দেশে যত রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও জুলুম হয়েছে, মানুষের ওপর যত অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে, শোষণ-বঞ্চনা ও বৈষম্য হয়েছে, ভোটাধিকার, মাববাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হয়েছে, রাষ্ট্রীয় অর্থ বেশুমার লুটপাট ও পাচার হয়েছে, তার জন্য সরকার পরিচালনকারীরা যেমন দায়ী, তেমনি তাদের সহযোগিতাকারী আমলারাও সমান দায়ী। গত জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকার ছাত্র-জনতার ওপর যে তা-ব করেছে, নির্বিচার গণহত্যা চালিয়েছে, প্রশাসন, পুলিশসহ অন্য অনেকেই তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করেছেন। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার বিদায় নিয়েছে। পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছেন শেখ হাসিনা ও সাঙ্গ-পাঙ্গরা। ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালিয়ে বিপুল হতাহত করার জন্য পুলিশের ওপর গণরোষ পতিত হয়েছে। অনেকে হতাহত হয়েছে, অংশবিশেষ পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছে। গত প্রায় ৫ মাসে পুলিশ শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পুলিশের নতুন আইজি পুলিশের অপরাধের কথা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অন্য সহযোগী প্রশাসনের তরফে এখনো কোনো দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি। স্বৈরাচারের প্রশাসন উচ্চ পর্যায়ে কিছু রদবদলসহ এখনো বহাল আছে। আমলাতন্ত্রের অন্যান্য ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্বৈরাচারের দোসর ও সহযোগী হিসেবে পুলিশ, প্রশাসন ও অন্যান্য ক্ষেত্রের আমলাদের বিরুদ্ধে তাদের কৃত অপরাধের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। কিন্তু কোমর দুর্বল সরকার সেটা নিতে পারেনি। ফলে স্বৈরাচারের দোসররা মুখ বের করতে শুরু করেছে। নানা রংয়ে, নানা অসিলায় ও নানা দাবি-দাওয়ার মোড়কে তারা সরকারকে বিব্রত ও অচল করার অপচেষ্টা করছে। দেখা যাচ্ছে, গোটা আমলাতন্ত্রই এখন আন্দোলনে নেমে পড়েছে। সিভিল সার্ভিসের অধীনে সাধারণ ও করিগরি বা পেশাগত এই দুটি ক্যাটাগরিতে ২৬টি ক্যাডার রয়েছে। এদের নিয়েই মূলত আমলাতন্ত্র গঠিত। এদের প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা অ্যাসোসিয়েশন আছে। অ্যাসোসিয়েশনগুলো বিভিন্ন দাবি-দাওয়াতে আন্দোলন করছে। এই আন্দোলনের একদিকে আছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, অন্যদিকে আছে শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি ২৫টি অ্যাসোসিয়েশন। এই ২৫টি অ্যাসোসিয়েশন একটি মোর্চা গঠন করেছে ‘আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ’ নামে। তারা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সচিবালয়ের ভেতরে ও বাইরে শোডাউন করেছেন। তারা সরকারকে হুমকি দিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রশাসন সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশন প্রধানের অপসারণ দাবি করেছেন। ওদিকে বৈষম্য নিরসন পরিষদের কোনো কোনো অ্যাসোসিয়েশন কলমবিরতি ও মাবনবন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। পরস্পরবিরোধী দাবিতে আমলাতন্ত্র সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনগুলোর আন্দোলনে নামার উপলক্ষ হলো প্রশাসন সংস্কার কমিশনারের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর ১৭ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য। তিনি সাংবাদ সম্মেলনে জানান, উপসচিব পদে পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের ৫০ শতাংশ ও অন্য সব ক্যাডারের ৫০ শতাংশ রাখার জন্য সুপারিশ করা হবে। একইসঙ্গে বিসিএস শিক্ষা ও বিসিএস স্বাস্থ্যকে ক্যাডার হিসাবে না রেখে জুডিশিয়াল সার্ভিসের মতো আলাদা আলাদা কমিশন হবে। বলাই বাহুল্য, এখনো প্রশাসন সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট চূড়ান্ত করা হয়নি, প্রকাশও করা হয়নি। এর মধ্যেই বিভিন্ন ক্যাডারের আমলারা মাঠে নেমে পড়েছেন। তারা যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন, সেটা আইনীভাবে করতে পারেন না বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। তাদের স্পর্ধা এতদূর যে, সরকারকে হুমকির ভাষায় কথা বলছেন, আল্টিমেটাম দিচ্ছেন। স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবে আমলাদের একাংশের এখন দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার হওয়ার কথা ছিল, কারো কারো ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হওয়ার কথা ছিল। তা হয়নি বলেই তাদের পক্ষে এই বাড়াবাড়ি করা সম্ভব হচ্ছে। প্রজাতন্ত্রের সচিব, যুগ্মসচিব, ডিসি, ইউএনও ইত্যাদিরা পতিত স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবে কী না করেছেন! স্বাধীন দেশকে ভারতের উপনিবেশ বানানোর ক্ষেত্রে ভারতের দাসী হাসিনা গংয়ের সঙ্গে আমলাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশগ্রহণের প্রশ্ন কি বাদ দেয়া যাবে? ভারতের সঙ্গে যেসব অসম ও প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তি হয়েছে তার মুসাবিধা কারা করে দিয়েছে? প্রকল্প পরিচালকরা বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বিপুল অংকের অর্থ সরিয়ে নিয়ে সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের ভাগ দিয়েছে, পাচার করেছে তার দায়নি কি তাদের নিতে হবে না? যাদের এতসব অপকর্ম ও অপরাধ, তারা দাবি-দাওয়া ও বৈষম্য নিরসনের নামে আন্দোলনে নেমেছে। আমাদের দেশে যে অনেক কিছুই হয়, হতে পারে, এটা তার প্রমাণ। দুঃখের বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকারের দৌড়ানোর কথা যাদের, তারাই এখন সরকারকে দৌড়াচ্ছে। এনজিও মার্কা সরকারের অথর্বতা পদে পদে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সমালোচকদের মতে, সরকারের অধিকাংশ উপদেষ্টা এনজিও সংশ্লিষ্ট। একাংশ বার্ধক্যের ভারে নত, অপরাংশ নাবালগ। ছাত্র-গণআন্দোলনে ৩-৪ জন ছাড়া কারো কোনো অবদান নেই। তাদের উদ্যম নেই, সৃজনশীলতা নেই। নতুন কিছু দেওয়ারও নেই। অধিকাংশ উপদেষ্টা তাদের সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল। যারা এনজিও করেছেন, তারা একসময় সচিবদের স্যার স্যার করেছেন। এখন সেই স্যারকে নির্দেশ দেয়া, নির্দেশ প্রতিপালনে বাধ্য করানো কতটা সম্ভব সহজেই অনুমেয়। ছাত্র-উপদেষ্টাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সীমিত, সেটা তো সকলকেই স্বীকার করতে হবে। আমলাতন্ত্রের কাছে অন্তর্র্বতী সরকার রীতিমত জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হতে না পারলে সরকারের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়তে পারে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আশাবাদী মানুষ। তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পারেন। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন। তার সারা জীবনের কাজ দেখলে সেটা বুঝা যায়। তাকেই ছাত্র-জনতা নতুন দেশ গঠনের প্রধান কান্ডারি নিযুক্ত করেছে। তার ওপর দেশের মানুষ গভীর আস্থা রাখে। এই আস্থার মূল্য দিতে তাকে শক্ত হতে হবে। শক্ত হাতে সবকিছু করতে হবে। আমলারা তার সরকার ও দেশবাসীর সঙ্গে যে আচরণ করছে, তা বেআইনী, শৃংখলাবিরোধী ও গণস্বার্থের পরিপন্থী। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যদিকে তার উপদেষ্টা পরিষদকে সক্রিয় ও গতিশীল করতে হবে, সক্ষম করতে হবে। প্রয়োজনে কাউকে কাউকে বাদ দিতে হবে। দক্ষ-যোগ্য-অভিজ্ঞ নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ করতে হবে।

