জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। এরই মধ্যে এ সম্পর্ক হিমশীতল অবস্থায় পৌঁছেছে। সংখ্যালঘু ইস্যু তুলে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশ দুটির মধ্যে গত ১৬ বছরের স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্কেও ফাটল দেখা দিয়েছে। ইসকনের বহিস্কৃত নেতা, সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গত ২৫ নভেম্বর গ্রেফতারের পর পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঘোলাটে হয়। তাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ভারতের একাধিক স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। এছাড়া গত ২ ডিসেম্বর ত্রিপুরার আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনায় শক্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। শুধু প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাংলাদেশ বসে থাকেনি। ঘটনার একদিন পর ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে ক্ষোভ জানায় ঢাকা। এ ছাড়া ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে দেশের মানুষ। বিক্ষোভ প্রতিবাদে ভারতীয় শাড়ি পুড়িয়ে পণ্য বর্জনেরও ডাক দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনায় ভারতও গভীরভাবে দুঃখপ্রকাশ করেছে। এছাড়া হামলার ঘটনায় জড়িত ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে ভারত এবং তিন পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করেছে। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ মূলত ভারতের এক চোখা নীতির কারণেই বেড়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই ভারত এদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চেয়েছে। এজন্য শেখ হাসিনার সকল অন্যায় অপরাধকেও ভারত উপেক্ষা করে গেছে। সবশেষে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াটাকেও ভারত সহজে মেনে নিতে পারছে না। এ জন্য ভারত বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক চক্রান্ত করে যাচ্ছে। ভারতের মিডিয়াতে উলঙ্গভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা কাল্পনিক গল্প প্রচার করে যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে আরও ক্ষুব্ধ করছে। ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষে চিন্ময় দাসরা এদেশে যে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে মাঠে নেমেছিল সেটা বর্তমান সরকার এবং সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝকে পেরেছেন। আর এ জন্যই সুর্নিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই চিন্ময়কে গ্রেফকার করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিয়েও ভারত জল ঘোলা করার অনেক চেষ্ট করছে।এ নিয়েও ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের পারদ আরও নিচে নেমেছে। তবে দু’দেশের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় পলাতক শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের অবৈধ ক্ষমতার প্রধান সমর্থক ছিল ভারত। এই সময়ে তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে ভারত বিরোধীতা বেড়েছে। কারণ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। আর সেখানে বসেই শেখ হাসিনা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে। এরমধ্যে ড. ইউনূসকে গণহত্যার ইন্ধনদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে যে আগুন জ্বলছে তাতে পেট্রোল ঢেলেছেন হাসিনা। আগস্টের পর শেখ হাসিনা প্রথম পাবলিক বিবৃতিতে বলেন, ‘আজকে আমি গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ইউনূস গণহত্যার সঙ্গে জড়িত। পরিকল্পিতভাবে তিনি এটি বাস্তবায়ন করেছে।’
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবনতি শুরু হয় যখন ড. ইউনূস শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণের বিষয়ে কথা বলেন। গত মাসে ইউনূস বলেছিলেন, পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হবে। এ বিষয়ে নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক মুবাশ্বর হাসান বলেন, বাংলাদেশের হাইকমিশনের হামলা ঘটনা অবশ্যই গভীর চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে দুই দেশের সম্পর্কের দিক দিয়ে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল বর্তমানে তাতে পুরোপুরি ছেদ পড়েছে। প্রতিবেশী এই দুই দেশের মধ্যে এখন বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যা বাণিজ্যিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে কী হয়। শেখ হাসিনার সময় ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। যার ফলে ২০২৩-২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে অবশ্যই ছেদ পড়বে। আর এতে দু’দেশেরই লোকসান হবে। তবে তাতে ভারতেরই বেশি ক্ষতি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ হামিদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করেন ঢাকায় নিযুক্ত প্রণয় ভার্মা। তিনি বলেন, একটি এজেন্ডার ওপর ভিত্তি করে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক চলতে পারে না। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে ভার্মাকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ভারত অবশ্যই বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এক্ষেত্রে শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভারতীয় সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়াত বাংলাদেশের সহকারী হাইকশিনে হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হবে যখন জনগণের মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটবে। ‘আয়রন লেডি’ শেখ হাসিনার কট্টর শাসনের অধীনে ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে তার অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল অংশীদার বলে মনে করে এসেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা সকলেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছে। কিন্তু হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামল আগস্টে আকস্মিকভাবে শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়, যাকে আবার হাসিনাবিরোধী বলে মনে করছে ভারত। হিন্দুরা বাংলাদেশের ১৭৪ মিলিয়ন জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ এবং তাদের অনেকেই হাসিনার তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছিল। হাসিনা ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হবার পর দাঙ্গাবাজরা আওয়ামী লীগের প্রতীক এবং কিছু ক্ষেত্রে হিন্দুদের টার্গেট করেছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডেপুটি এশিয়া ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী আগস্টে রিপোর্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর ‘হিংসাত্মকভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, মন্দির ভাংচুর করা হয়েছে এবং দোকান লুট করা হয়েছে’। ভারতে নির্বাসিত থেকে হাসিনা দাবি করেছেন, ইউনূস সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার’ জন্য দায়ী। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং সেপ্টেম্বরে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরাইল-গাজার মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উল্লেখ করে যে কোনো ‘অপ্রত্যাশিত’ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে নভেম্বরের শেষের দিকে বাংলাদেশে একজন হিন্দু সন্ন্যাসীকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় যা ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একটি বড় কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে ।
অক্টোবরে এক সমাবেশে বাংলাদেশের পতাকাকে অসম্মান করার অভিযোগে হিন্দু নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সমর্থকরা বিশ্বাস করেন যে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল কারণ তিনি তার দেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন। ইউনূস সম্প্রতি একটি ভারতীয় সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন যে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার দাবিগুলো ‘অতিরঞ্জিত’ ছিল, যা ভারতে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ইতিমধ্যে, ভারতে কট্টরপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের কট্টরপন্থী মুসলিম গোষ্ঠীগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে চলেছে এবং দু দেশের সরকার যারা দীর্ঘদিন ধরে উষ্ণ সম্পর্ক উপভোগ করে এসেছে সেই ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা জারি রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসিনা সরকারের পতনের অনেক আগে থেকেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো অমিত রঞ্জন বলেন, ‘বাংলাদেশিদের মনে এই অনুভূতি সবসময় থাকে যে, ভারত বাংলাদেশের বিষয়ে খুব বেশি হস্তক্ষেপ করে। হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট সমর্থন করেছিল বলেও তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির গবেষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধুমাত্র হাসিনার আওয়ামী শাসনামলের সাথেই উষ্ণ ছিল, সাধারণ মানুষের সাথে নয়। এই মাসের শুরুর দিকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি ড. ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে এবং সম্পর্কের বরফ গলাতে ঢাকায় গিয়েছিলেন। আগস্টে হাসিনা দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সফর। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অক্টোবরে বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল অন্যান্য অভিযোগের পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির গবেষক রেজওয়ান মনে করেন, ‘হাসিনাকে প্রত্যাবাসনের যে কোনও প্রচেষ্টা ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি এবং বিরোধী কংগ্রেস পার্টি উভয়ের দ্বারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে। কারণ ভারতও চাইবে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ পুনর্গঠন করুক এবং মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসুক। তবুও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যত নির্ভর করছে ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত কিনা তার উপর।অস্ট্রেলিয়ায় সাত বছর নির্বাসনের পর বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মী মোবাশ্বর হাসান তার জন্মভূমিতে ফিরে আসেন হাসিনার পতনের পর। ড. হাসান এবিসির দ্য ওয়ার্ল্ডকে বলেছেন যে, ভারত যদি তাকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকার করে, তাহলে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাবে। তাই ভারতকে এখন বাংলাদেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

