নিত্যপণ্যের মূল্য কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, ডিমসহ প্রায় সবধরনের পণ্যমূল্য কমার পরিবর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পণ্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়েছে। তেল নিয়ে চলছে পুরো তেলেসমাতি। ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রতি লিটার তেলের মূল্য ৬ টাকা বৃদ্ধি করার পরও বাজারে সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক নয়। সিন্ডিকেটের কবলে এখনো তেলের বাজার। এ ছাড়া আমনের এই ভরা মৌসুমে বাড়ছে চালের দাম। গত এক সপ্তাহে সব ধরনের চালের দাম কেচিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কি কারণে এই ভরা মৌসুসে চালের দাম বাড়ছে তা কেউ বলতে পারছে না। প্রতি বছরই আমনের মৌসুমে বাজারে নতুন চালের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে দাম কমে যায়। তবে এবারই ব্যতিক্রম যে ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে। অন্যদিকে প্রচুরশীতকালীন শাক-সবজি বাজারে এসেছে, কিন্তু দাম খুব একটা কমছে না। এখনো সব ধরনের সবজি গড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন আলু বাজারে এলেও এখনো ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ত্রাহি অবস্থা। মানুষের আয় বাড়ছে না, কিন্তু চাল, ডাল, তেল, ডিম ইত্যাদি পণ্যের মূল্য বাড়ছেই। এসব পণ্যের বেশিরভাগের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার টিসিবি’র মাধ্যমে ট্রাকে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা অব্যাহত রাখলেও তার প্রভাব সাধারণ বাজারে পড়ছে না। বলা বাহুল্য, শহরভিত্তিক টিসিবির এ ব্যবস্থা গ্রামীণ বাজারে কাজ করছে না। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করছে। এতে সরকারের প্রতি তাদের অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। বলা বাহুল্য, যে কোনো সরকারের প্রতি জনসমর্থনের মিটারের পারদ উঠানামা করে পণ্যমূল্য নাগালের মধ্যে রাখা-নারাখার ওপর। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে স্বস্তি দেয়া। এ কাজটি করতে সরকার এখনও সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি। এতে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের যে আকাশচুম্বি প্রত্যাশা তা কিছুটা হলেও ম্রিয়মান হয়েছে। যদিও সরকার পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং, বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক ছাড়, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণসহ নানা ব্যবস্থা নিয়েছে, তারপরও এসব পদক্ষেপের সুফল খুব কমই মিলছে। যেমন ডিম ও পেঁয়াজের দাম কমাতে গত মাসে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহর করলেও তার কোনো প্রভাব বাজারে পড়েনি। পেঁয়াজের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা কমলেও ডিমের দাম এখনো আগের মতই আছে।আসলে সমস্যাটা কোথায়? এ সমস্যার ক্ষেত্রে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, ডিমের চাহিদা ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন দৈনিক ডিমের চাহিদা ৫ কোটি পিসের মতো। পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) হিসাব মতে, দেশে দৈনিক ডিমের উৎপাদন ৪ কোটি ৫০ লাখ পিস। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ডিমের দৈনিক উৎপাদন ৬ কোটি ৩০ লাখ পিস। এ হিসেবে, ডিমের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকার কথা। হিসাবের এই গড়মিল হওয়ার কারণ হচ্ছে, বিপিআইসিসি হাঁস ও কোয়েল ডিমের হিসাব ধরছে না। অথচ এই দুই উৎস থেকে ডিম উৎপাদিত হয়, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি পিসের বেশি। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, হয় উদ্যোক্তাদের হিসাবে, নতুবা অধিদফতরের হিসাবে গোলমাল রয়েছে। আমরা দেখেছি, বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সময় সব খাতে পরিসংখ্যানের মিথ্যা তথ্য দিয়ে উন্নয়ন দেখাতে। ফলে মানুষের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি কোনো ধরনের বিশ্বাস ছিল না। তার বিদায়ের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তারা এখনও তা সরকারের মধ্যে দেখতে পাচ্ছে না। তাদের বিশ্বাস ও আস্থা ধরে রাখতে হলে কৃষিপণ্যসহ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঠিক পরিসংখ্যান দিয়ে উৎপাদন ও চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে হবে। এখানে ভোজভাজির হিসাব গ্রহণযোগ্য হবে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, এখন কৃষিপণ্যসহ পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। তবে সাধারণ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে মুল্য তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে তাদের স্বস্তিতে রাখার দায়িত্ব সরকারের। এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি, বেশি বরাদ্দ দিয়ে কিংবা অন্য যে উপায়ে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিত্যপণ্যের চেইনশপ রয়েছে। উন্নত বিশ্বের চেইনশপগুলো পণ্যের উপর মূল্যছাড় দিয়ে থাকে। আমাদের দেশের এ ধরনের শপগুলোও এ পন্থা অবলম্বন করতে পারে। এজন্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে খাদ্য, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়গুলো যোগাযোগ করে পণ্যমূল্য মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য তাদের সহযোগিতা চাইতে পারে। এতে কিছুটা হলেও পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অন্যদিকে, সিন্ডিকেট সবসময়ই ছিল এবং এখনও আছে। সিন্ডিকেটকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে উপায়ও মন্ত্রণালয়গুলোকে বের করতে হবে। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দায়িত্বে আসা অন্তর্বর্তী সরকারকে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অধিক তৎপর হতে হবে। এর উপর সরকারের জনসর্থন ধরে রাখা অনেকাংশে নির্ভর করে। সরকারের মেয়াদ ৩ মাস হতে যাচ্ছে। এই সময়ে নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা মানুষের কাছে ব্যর্থতা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে কারণ যাই থাকুক না কেন, সাধারণ মানুষ চায়, সরকার সেসব কারণ যে কোনো উপায়ে দূর করে তা তাদের নাগালের মধ্যে রাখবে। আমরাও মনে করি, পরিসংখ্যানের হেরফেরের বিতর্ক না করে, কীভাবে নিত্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনা এবং রাখা যায়, সে পদক্ষেপ সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে নিতে হবে। মানুষের বেঁচে থাকার উপকরণে যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে তার পক্ষে সরকারের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার কোনো কারণ নেই। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য যদি জনঅসন্তুষ্টি দেখা দেয়, তাহলে সরকারের অন্যান্য অপরিহার্য লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন বিলম্বিত ও ব্যাহত হতে পারে, যা আদৌ কাম্য নয়। দেশে মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড ১৩.৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। গত এক বছর ধরে গড়ে ১০ শতাংশের উপরে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দুঃসংবাদ দিয়ে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে অন্তত এক বছর লাগবে। এর অর্থ হচ্ছে, নিত্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যমূল্য সহসা কমছে না। মানুষকে কষ্টের মধ্যেই থাকতে হবে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মূল্যস্ফীতি না কমার কারণ হিসেবে বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের ভুল নীতির কথা বলেছেন। তবে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত নিত্যপণ্যের মূল্য তাদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসবে। তাদের এ প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে নিত্যপণ্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে দেশের অর্থনীতির মেরুদ-ভেঙে দেয়া হয়েছে। সীমাহীন লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থপাচার অর্থনীতিকে ফোকলা করে দিয়েছে। তার পতনের পর এর পুরো বোঝা এসে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপর। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুই অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার কীভাবে অর্থনীতিকে প্রায় শূন্যাবস্থায় রেখে গেছে, তারা সে চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি তা পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে বিগত সরকারের দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি জানিয়েছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরে দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার করা হয়েছে। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে হাসিনা সরকারের দুর্নীতিবাজরা লুটেপুটে খেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দ্রুত কিছু উদ্যোগ নিয়ে তা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে লুটপাট হয়ে যাওয়া ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে স্বল্প সময়ে পুনরুদ্ধার করা সহজ কাজ নয়। এ জন্য সময় প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে, সাধারণ মানুষ যে কষ্টের জীবন অতিবাহিত করছে, সবার আগে তা দূর করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। কী করলে, কীভাবে করলে, সাধারণ মানুষ অন্তত কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে, এ বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া উচিৎ। আমরা দেখেছি, ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ায় জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, পশ্চিমাবিশ্বসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাইকা, এডিবি ও অন্যান্য আর্থিক সংস্থাগুলো বিলিয়ন বিলিয় ডলারের আর্থিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অর্থনীতি কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হয়েছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ খুবই দুর্গতির মধ্যে রয়েছে। তারা আয় দিয়ে কোনোভাবেই চলতে পারছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের এখন সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করার দিকে।

