ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গুম, খুন, অপহরণ, চোখ বেঁধে তুলে নেয়া ইত্যাদি ছিল অতি সাধারণ ঘটনা। সাড়ে ১৫ বছর কত মানুষকে যে অপহরণ ও তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে তার সঠিক হিসাব এখনো হয়নি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে গড়ে ওঠা ‘মায়ের ডাক’-এর হিসাবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গুম হওয়া ১৫৫ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম প্রমুখ নিখোঁজ ব্যক্তিরা এ তালিকায় রয়েছেন।গুম করার মাধ্যমে স্বৈরাচার হাসিনা গোটা দেশে ভীতি ও আতংকের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সরকারের সমালোচক, ভিন্ন মতালম্বী ও ভারতের বিরুদ্ধে যারা কথা বলতেন তাদেরকেই টার্গেট করা হতো। তাদের সাধারণত রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে গুম অথবা খুন করা হতো। কাউকে তুলে নিয়ে আয়না ঘরে আটকে রেখে মাসের পর মাস বছরের পর বছর নির্যাতন করা হতো। কারো কারো অকথ্য নির্যাতনের পর রাস্তাঘাটে ছেড়ে দেয়া বা ফেলে দেয়া হতো। তারা ঘরে ফিরে নিশ্চুপ হয়ে যেতেন। আবার গুমের ভয়ে তারা কিছু বলতেন না। গত ১৫ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেওয়া গুম কমিশনের প্রতিবেদনে তারচেয়েও আরও ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনা এক: সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি ধানমন্ডি এলাকা থেকে এক যুবককে তুলে নিয়ে তার ঠোঁট অবশ করা ছাড়াই সেলাই করে দেয়। ঘটনা দুই: একটি ব্যক্তিকে আটক করে যৌনাঙ্গ এবং কানে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। ঘটনা তিন: এক ভিকটিম নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে উদ্ধার করে সেখানেই হত্যা করা হয়। কমিশনের তদন্ত, ঘটনায় সম্পৃক্ত কর্মকর্তা ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের বয়ানে উঠে এসেছে গুম ও নির্যাতনের এসব নানা রোমহর্ষক বর্ণনা। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ১৫ বছরের এক হাজার ৬৭৬টি জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে কমিশন পর্যালোচনা করেছে ৭৫৮টি অভিযোগ। অভিযোগের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ১৩০টি গুমের ঘটনা ঘটেছে এবং ২০২৪ সালে এখন পর্যন্ত ২১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। প্রতিটি অভিযোগে অন্তত ৪ টি বৈশিষ্ট্য থাকায় এসব ঘটনাকে গুম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে কমিশন। সেগুলো হলো: ভিকটিমের স্বাধীনতা হরণ, রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা কর্তৃপক্ষের ঘটনার সাথে জড়িত থাকা, ভিকটিমের অবস্থান সম্পর্কে তার পরিবার বা সমাজকে না জানানো এবং ভুক্তভোগীকে কোন আইনি সুরক্ষা না দেয়া।অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যা ও মুক্তি এই ৫ টি ভাগে সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল উপায়ে গুমের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়। গুমের শিকার ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজন সরকারের কাছে লাগাতার আবেদন-নিবেদন জানিয়েও ফল পেতেন না। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার পালিয়ে গেলে অন্তর্বর্তী সরকার গণদাবি অনুযায়ী গুম সংক্রান্ত কমিশন গঠন করে। ২৭ আগস্ট মইনুল হোসেন চৌধুরীকে প্রধান করে এ কমিশন গঠিত হয়। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুমের ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা বলা হয় কমিশনকে। কমিশন গত ১৫ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন তুলে দিয়েছে। সেই প্রতিবেদনের প্রকাশযোগ্য অংশ গণমাধ্যমকে সরবরাহ করেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। প্রতিবেদনের সরবরাহকৃত অংশের ভিত্তিতে পত্রপত্রিকায় যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তা একইসঙ্গে অচিন্তনীয় ও লোমহর্ষক। শেখ হাসিনা কত নিকৃষ্টতম স্বৈরাচার ছিলেন, প্রতিবেদন সূত্রে সেটা জানা গেছে। কমিশন বলেছে, সাড়ে ১৫ বছর ধরে গুমের নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা স্বয়ং। তথ্যমতে, শেখ হাসিনা ছাড়াও গুমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল হাসান, পুলিশ কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। চরম মানবাধিকারবিরোধী গুম-খুনের সঙ্গে সরকার প্রধান, তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, সামরিক বাহিনী ও পুলিশের উচ্চ পদাধিকারীদের সম্পৃক্ততার কথাই প্রতিবেদনে উঠে আসেনি, একইসঙ্গে ভারতীয়দের সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখিত হয়েছে। কমিশনের তদন্ত, ঘটনায় যুক্ত কর্মকর্তা ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের বয়ানে এ তথ্য পাওয়া গেছে। স্মরণযোগ্য, গুম হয়ে যাওয়া একাধিক ব্যক্তির ভারতে সন্ধান মিলেছে, যার একজন হলেন বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ। ভারতীয়রা সংযুক্ত না থাকলে এটা কোনোভাবেই হওয়া সম্ভব নয়। ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য স্বৈরাচারের যাবতীয় অপকর্ম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে ভারতের মোদি সরকারের জড়িত থাকার বিষয় এখন সর্বজন বিদিত।কমিশনের তথ্যমতে, র্যাব, ডিজিএফআই, ডিবি, সিটিটিসি, সিআইডি, পুলিশ প্রভৃতি সংস্থা গুমের সঙ্গে জড়িত। কমিশনের প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, গুমের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা কাজটি এমনভাবে করেছেন, যাতে এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়। বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের মধ্যে ভিকটিম বিনিময় করেছে। গুমকারীরা গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ওপর কী ধরনের নিপীড়ন ও নির্যাতন করেছেন, তার বিবরণ পড়লে রক্ত হিম হয়ে যায়। শেখ হাসিনার নিষ্ঠুরতা সকল জালিম বর্বর শাসকের নিষ্ঠুরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি নিজেকে রাজা-বাদশাহই মনে করতেন। তার কথাই ছিল আইন। এমনও শোনা যায়, হত্যা-নির্যাতনে তিনি উল্লসিত হতেন, অনন্দ লাভ করতেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে তিনি গণহত্যা চালিয়েছেন। আরো হত্যাকান্ডের নির্দেশ দিয়েছেন। ক্ষমতা টিকেয়ে রাখা ও তা প্রলম্বিত করার জন্য তিনি এমন অপকর্ম-অপরাধ নেই, যা করেননি।
গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত অর্থাৎ গুম করার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০ জন সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তার পাসপোর্ট স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। একই সঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ২০ জনের মধ্যে অধিকাংশই র্যাবে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ বহির্গমন-১ এর উপসচিব মো. কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই আদেশ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা হলেন- র্যাবের সাবেক ডিজি মোখলেছুর রহমান, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ড. বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক এডিজি (বর্তমানে গ্রেফতার) জিয়াউল আহসান ও কর্নেল তোফায়েল মোস্তুফা সারওয়ার, র্যাব-৭-এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফাত উদ্দিন আহমেদ, র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা পরিচালক লে. কর্নেল মো. মাহবুব আলম, র্যাব-৪ এর সাবেক অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার লুৎফুল কবির ও র্যাব-১০ এর সাবেক অধিনায়ক শাহাবুদ্দিন খান, র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. কামরুল হাসান, র্যাব-১ এর সাবেক সিও লে. কর্নেল সারোয়ার-বিন-কাশেম। এছাড়া সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, সাবেক সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান, ডিবির সাবেক ডিসি মশিউর রহমান, সিটিটিসির সাবেক এডিসি তৌহিদুল ইসলাম। ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু তাহের মোহাম্মদ ইব্রাহিম, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদ-উল-ইসলাম এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, গুম সংক্রান্ত কমিশন অফ ইনকোয়ারির অনুরোধ অনুযায়ী দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ২০ জন সরকারি কর্মকর্তার গুম সংক্রান্ত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ পাওয়া যায় এবং তদন্তের প্রয়োজনে ওই ২০ জন যেন দেশত্যাগ করতে না পারে সে লক্ষ্যে তাদের পাসপোর্ট স্থগিতপূর্বক দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। পাঁচ বছর গুম করে রাখার ঘটনায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছেন মাইকেল চাকমা। পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকার পর গত ৭ আগস্ট বাড়িতে ফেরেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল চাকমা।গুম-খুনের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বিচার এবং এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই। গুম সংক্রান্ত কমিশন গুম-খুনের একটা বস্তনিষ্ট প্রতিবেদন দিয়েছে। কমিশনের প্রধান জানিয়েছেন, আগামী বছর মার্চে আরো একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেবে কমিশন। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে আরো এক বছর লাগবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। আশা করা যায়, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুমবিষয়ক সব কিছু অর্থাৎ কারা নির্দেশদাতা, কারা নির্দেশ বাস্তবায়নকারী এবং ভারত কীভাবে ও কতটা জড়িত বিশদভাবে জানা যাবে। আয়নাঘরের বিষয়টাও গুমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আয়নাঘর কোথায় কোথায় ছিল, তার সব জানা যায়নি। এখনো আয়নাঘরে কেউ আছেন কিনা দেখতে হবে। গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের যারা জীবিত আছেন, অবর্ণনীয় নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন তারা এবং যারা নিহত ও নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের আত্মীয়-স্বজনরা যাতে ন্যায়বিচার পান তা নিশ্চিত করতে হবে যেকোনো মূল্যে এবং দ্রুততম সময়ে।

