এক যুগ আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংবিধানের যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করা হয়েছিল তা বাতিল ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এর ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের যে বিধান আওয়ামী লীগ করেছিল সেটা বাতিল হয়ে গেল। তার জায়গায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার ফিরল। এ রায়কে একটি যুগান্তকারী রায় হিসাবে উল্লেখ করে অনেকে বলছেন এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে আসার গুরুত্বপূর্ণ দ্বার উন্মোচিত হলো। পঞ্চদশ সংশোধনী আইন চ্যালেঞ্জ করে গত ১৮ আগস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি রিট করেছিলেন। তাদের এ রিট মামলার রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাই কোর্ট বেঞ্চ ১৭ ডিম্বের এ রায় দেয়। এ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রিটকারী নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেছেন, এই রায়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে আসার দ্বার উন্মোচিত হলো। আমি খুব উৎফুল্ল, আনন্দিত এবং অত্যন্ত সন্তুষ্ট এই রায়ে। আমি মনে করি যে এটা একটা ঐতিহাসিক রায়। এটা একটা সেমিনাল জাজমেন্ট। তিনি বলেন, আজকে শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো দেশবাসীর জন্য আনন্দিত। এই রায়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে আসার একটা গুরুত্বপূর্ণ দ্বার উন্মোচিত হলো। তবে এটা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে কীভাবে আচরণ করা হয়। গণতন্ত্র ফিরে আসা, গণতান্ত্রিক উত্তরণ মানে একটা পরিবর্তন। সবাই যদি আচরণে পরিবর্তন আনে, রাজনীতিবিদেরা যদি তাঁদের আচরণে পরিবর্তন আনেন, সবাই নিজেদের করণীয় করেন, তাহলে গণতন্ত্র ফিরে আসবে। আর তা না হলে ফিরবে না। উচ্চ আদালতের এই যুগান্তকারী রায়ে বিএনপি জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও সন্তোষ প্রকাশ করেছে। পঞ্চদশ সংশোধনী আইন চ্যালেঞ্জ করে গত ১৮ আগস্ট বদিউল আলম মজুমদারসহ ৫ বিশিষ্ট ব্যক্তি রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট গত ১৯ আগস্ট রুল দেন। রুলে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। এই রুলে ইন্টারভেনার (আদালতকে সহায়তা করতে) হিসেবে বিএনপি, গণফোরাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকজন যুক্ত হন। শুনানিতে রিট আবেদনকারী, বিএনপি, রাষ্ট্রপক্ষ, জামায়াত, গণফোরাম, ব্যক্তি ও সংস্থার পক্ষে তাদের আইনজীবীরা বক্তব্য তুলে ধরেন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেছে, বিগত ৩ জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘জনগণের আস্থাকে ধ্বংস করেছে’। আদালত বলেছেন, ধারা দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। ওই দুটিসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ‘অপরিহার্য’ বিবেচনা করে রায়ের পর্যবেক্ষণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত’ বলা হয়েছে। বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের এই পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, গণতন্ত্র হল আমাদের সংবিধানে মৌলিক কাঠামো। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বলেছেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। কেন? কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায় না। আর অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা ছাড়া, গণতন্ত্র নিশ্চিত করা যায় না। এজন্য তিনি বলছেন, কেয়ারটেকার গভার্নমেন্ট সিস্টেম ইজ দ্য বেসিক স্ট্রাকচার অব দি কনস্টিটিউশন।’ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে।আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস হয়। ২০১১ সালের ৩ জুলাই এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে (২০০৯-২৪) যত বড় বড় ‘অনাচার’ হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো পঞ্চদশ সংশোধনী। ২০১১ সালে অষ্টম সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানের অনেক কিছু ফিরিয়ে আনা হয়েছে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল দলটির ক্ষমতা চিরস্থায়ীকরণের একটি উদ্যোগ। অর্থাৎ চরম ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠার সোপান। শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল নয়, আরও অনেক কারণেই পঞ্চদশ সংশোধনীকে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ ‘অসাংবিধানিক সংবিধান সংশোধন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পঞ্চদশ সংশোধনী আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন। এর ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারাসহ আরও কিছু ধারা বাতিল হয়ে গেল। আদালত বলেছেন, উল্লিখিত ধারা দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তির বিষয়টি শুধু সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেনি, একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে এর অনেক সুদুরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এ সংশোধনীর ফলাফল হিসেবে নির্বাচনব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালে ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’ এবং ২০২৪ সালে ‘আমি ও ডামি নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হয়। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসন প্রলম্বিত হওয়ার সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পর্ক তাই ‘অবিচ্ছেদ্য’।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার বছরখানেক পর ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জিয়াউর রহমানের আমলে করা পঞ্চম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে। এরপরই সংবিধান সংশোধনের তোড়জোড় শুরু হয়। আপাতদৃষ্টে মনে হয়েছিল, সামরিক শাসনামলে সংবিধানে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেগুলো সংশোধনের জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এমন উদ্যোগ নিয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যেও তেমন ইঙ্গিত ছিল।সংবিধান সংশোধনের জন্য ২০১০ সালের ২১ জুলাই ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি করা হয়। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কাছে কমিটির জন্য নাম চাওয়া হলেও তারা এতে সাড়া দেয়নি। তাই ‘সর্বদলীয়’ বলা হলেও কমিটির সব সদস্যই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের। তৎকালীন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ছিলেন কমিটির চেয়ারপারসন, কো-চেয়ারপারসন ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ২০১১ সালের ৫ জুন পর্যন্ত কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি ও নানা শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে অনেকগুলো বৈঠক করেন।এসব বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচ্য বিষয় ছিল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বেশির ভাগ ব্যক্তিই কিছু সংস্কারসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ২০১১ সালের ২৭ এপ্রিল কমিটির ২০তম সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদল বিশেষ সংসদীয় কমিটির সভায় অংশ নেয়। সভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ৩ মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রেখেই সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।সপ্তাহ দুয়েক পর ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি এক সংক্ষিপ্ত আদেশে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত আদেশকে ‘বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে দেখিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিল; কিন্তু যে প্রেক্ষাপট ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ রায় দেওয়া হয়, তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। যে মামলার সূত্র ধরে এ রায় দেওয়া হয়, সেটি ২০০৪ সাল থেকে আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় ছিল। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই এ মামলার শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১১ সালের ১ মার্চ শুরু হয়ে মাত্র ১০ কার্যদিবসে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার শুনানি শেষ হয় এবং বিচারপতি খায়রুল হকের অবসরে যাওয়ার মাত্র ৮দিন আগে একটি সংক্ষিপ্ত আদেশ দেওয়া হয়। প্রায় ১৬ মাস পরে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আদেশের বেশ কিছু পার্থক্যও দেখা গেছে। গত তিনটি নির্বাচনের উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে। দলীয় সরকারের অধীন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এই আশঙ্কা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা বাতিলে আদালতের এই রায়কে তাই গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

