ঢাকাTuesday , 17 December 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মুক্ত বাতাসে বিজয় দিবস উদযাপন

তালুকদার রুমী
December 17, 2024 6:41 pm
Link Copied!

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ১৫ বছরের দু:শাসনের অবসান ঘটিয়ে জাতি আবার মুক্ত বাতাসে নতুন করে মহান বিজয় দিবস উদযাপন করেছে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বাংলাদেশের নবযাত্রায় জাতি নতুন উদ্যম ও উদ্দীপনা নিয়ে বিজয় দিবসটি নতুন করে উদযাপন করেছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর দেশবাসী এ সময়টাকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলে অভিহিত করছে। স্বৈরশাসককে ক্ষমতাচ্যুত করতে গিয়ে সহস্রাধিক ছাত্র-জনতা শাহাদাত বরণ করেছে, সাত শতাধিক মানুষ চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে, অনেকে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুইয়েছে, কমপক্ষে ২৪ হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, বিপুলসংখ্যক মানুষকে জোরপূর্বক গুমের শিকার হতে হয়েছে, অনেক আহত মানুষ এখনও হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন এবং অনেকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কালাতিপাত করছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হঠাতে এবং এরপর এ বছর শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের কবল থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে যেসব শহিদ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জাতি তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এই বিজয় দিবসে নতুন করে শপথ গ্রহণ করেছে। দেড় যুগ পর নতুনরূপে আবির্ভাব ঘটছে বিজয় দিবসের। এত দিন পর দেশের আমজনতা নতুনরূপে ভিন্ন আঙ্গিকে দিবসটি পালনের স্বাদ আস্বাদন করেছেন। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘ ১৭ বছর বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্রীয়ভাবে বিজয় দিবস উৎযাপানে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। এ দেশের মানুষের বিজয় দিবস ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। বিজয় দিবস মানেই পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের কাছে ছিল এক ব্যক্তির বন্দনা এবং ভারতীয় দাদাদের ঢাকায় এনে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসব করা। ফ্যাসিস্টদের ওই উৎসবে আওয়ামী লীগ, দিল্লির তাঁবেদার ছাড়া সাধারণ মানুষ দূরের কথা, মুক্তিযোদ্ধারাও আমন্ত্রণ পেতেন না। ফলে বিজয় দিবস কার্যত মাদার অব মাফিয়া বা গুম জননী হাসিনার শৃঙ্খলে নিয়ন্ত্রণ ছিল। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ভারতের নাচের পুতুল হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করে। ফলে এবারের বিজয় দিবস দেশবাসীর কাছে নতুনভাবে এসেছে। মুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম দেশে, মুক্ত বাতাসে এবার ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের ১৮ কোটি মানুষ প্রাণ খুলে বিজয় দিবস উৎযাপন করেছে। জাতীয় স্মৃতিসৌধে ১৬ ডিসেম্বর শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা এলেও সেই স্বাধীনতা ছিল অরক্ষিত। ২০২৪-এর বিজয় আমাদের স্বাধীনতাকে পূর্ণতা দিয়েছে। দেশবাসীকে মহান বিজয় দিবসের রক্তিম শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৪-এর বিজয়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে জনগণ প্রকৃত বিজয়ের স্বাদ অনুভব করছে। একই সাথে তিনিফ্যাসিজম ও আধিপত্যবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার দাবিদার আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছর ‘বিজয় দিবস’ ‘স্বাধীনতা দিবস’ ‘শহীদ দিবস’সহ গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো কুক্ষিগত করে রেখেছিল। প্রতিটি দিবসে আওয়ামী লীগ নেতা, মুজিব অনুসারী, দিল্লির তাঁবেদার, আওয়ামী লীগ অনুসারী কিছু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, কিছু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতাদের বাইরে দেশের সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো না। এ সব দিবস মানেই আওয়ামী লীগের কাছে ছিল শেখ মুজিবের বন্দনা। মুজিবের বাইরে আওয়ামী লীগের জাতীয় চার নেতাও তেমন গুরুত্ব দেয়া হতো না। আর ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশের আলেম সমাজকে কখনোই আমন্ত্রণ জানানো হতো না। বরং তাদের বিরুদ্ধে ‘মৌলবাদী’ ‘সন্ত্রাসবাদী’ ‘জঙ্গি’ তকমা দেয়া হতো। ২০২১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের আগে তো শত শত আলেমকে গ্রেফতার করে কারাগারে রাখা হয়েছিল। হাসিনা রেজিমে বিজয় দিবস পালনে রেওয়াজ হয়েছিল ভারতীয় কিছু ব্যক্তিকে ঢাকায় এনে সংবর্ধনা দেয়া, পুরস্কারের নামে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়া। রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খবর করে শেখ মুজিবের নামে নানান ‘বন্দনা মঞ্চ’ গড়ে তুলে উল্লাস করা। ফলে সাধারণ মানুষ বিজয় দিবসে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেতো না। এবার দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ৫ আগস্ট দেশের পূর্ব দিগন্তে নতুন সূর্য উঠেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিজয় দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করেছে। দীর্ঘদিন পর দলমত নির্বিশেষে বিনম্র শ্রদ্ধায় গতকাল বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ-বিদেশের বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ। সকাল থেকেই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে নেমেছিল বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের ঢল। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রাণ দেয়া শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে তারা। দিবসটি উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে বাণী দিয়েছেন। বাণীতে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দেশকে আরো উন্নত ও শক্তিশালী করতে এবং স্বাধীনতার পূর্ণ সুফল ভোগ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। যথাযোগ্য মর্যাদায় মুক্ত পরিবেশে ভয়ভীতিহীন চিত্তে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে জাতীয়ভাবে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। মহান বিজয় দিবসের প্রত্যুষে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসটির সূচনা করা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বিদেশি কূটনীতিক এবং বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। সব সরকারি-আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাসমূহ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে এ দিন সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। মাসব্যাপী ইলেকট্রনিক মিডিয়াসমূহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করেছে। এছাড়া, দেশের সব জেলা ও উপজেলায় দিনব্যাপী আড়ম্বরপূর্ণ বিজয়মেলা আয়োজন করা হয়েছে। শিশুদের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসেও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।বঙ্গভবনে অপরাহ্নে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারগুলোকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এ ছাড়া, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এ উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হয়। এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল, জেলখানা, সরকারি শিশুসদনসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানসমূহে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়।দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘর বিনা টিকিটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় এবং সিনেমা হলে বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ছিল মানুষের ঢল। সবাই মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একত্রিত হয়েছিলেন। গাঢ় সবুজ আর লাল পতাকায় ঢাকা এই পরিবেশ যেন পুরো জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ১৯৭১ আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন রয়েই যায়, কী চেয়েছিলাম আর কী পেয়েছি? স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে অনেক কিছু অর্জন হয়েছে, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। কিন্তু তবুও, মুক্তিযুদ্ধের সেই শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন এখনও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ছিল মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, আর দুর্নীতি আমাদের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও, এই বিজয় দিবসে আমাদের আশার আলো রয়েছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলন এবং স্বৈরশাসনের পতনের পর, জাতি নতুন করে আশার বাতিঘর খুঁজে পেয়েছে। ১৯৭১ সালের সেই বিজয়ের আলো আবারও আমাদের পথ দেখাচ্ছে। এই নতুন আলো আমাদের ঐক্যবদ্ধ করছে, আমাদের শক্তি এবং সাহস দিচ্ছে একটি উন্নত, দুর্নীতিমুক্ত এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য। বিজয়ের এই চেতনায় আমরা শপথ নিতে পারি, আমরা একটি সুন্দর, মানবিক এবং সাম্যের বাংলাদেশ গড়ব।