ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায়। এরপর ৮ আগস্ট নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্কীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সরকারে বিরুদ্ধে ভারতনানা ষড়যন্ত্র করছে। এর মাধ্যমে ভারত প্রমাণ করছে যে তারা বাংলাদেশের নয় শুধু আওয়ামী লীগের বন্ধু। বাংলাদেশের সঙ্গে এই মুহূর্তে ভারতের সম্পর্ক টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। ভারতের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে যে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তারা কোনোভাবেই মানতে পারছে না। সম্প্রতি বহিষ্কৃত ইসকন নেতা ও সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে আটকের পর সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে। আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা হামলা করেছে। ভাঙচুর করেছে এবং আমাদের জাতীয় পতাকায় আগুন দিয়েছে। এ ঘটনায় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করেছিল বাংলাদেশ সরকার। স্বভাবতই ভারতীয় উগ্রপন্থীদের এ ধরনের আচরণ বাংলাদেশিদের আহত করেছে। তাঁদের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। এর আগে কলকাতায় উপহাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ ও হামলার চেষ্টা করেছিল একদল ভারতীয়। ওই ঘটনার পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল। যদিও আগরতলায় হামলার পর ভারত দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর ভারতের আচরণ কখনোই বন্ধুসুলভ মনে হয়নি। প্রতিবেশী হিসেবে ভারত একচেটিয়া আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে যাচ্ছে। এটা দেশের সাধারণ মানুষকে ক্রমেই ভারতবিরোধী করে তুলছে। ভারতকে বুঝতে হবে যে জুলাই বিপ্লব কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর ছিল না। এটি ছিল গণমানুষের আন্দোলন। আন্দোলনে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামপন্থী, বামপন্থীদেরও অংশগ্রহণ থাকলেও এটি একটি গণচরিত্র ধারণ করেছিল এবং এই গণ আন্দোলনের মুখেই স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারত দেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়েছে। দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হলেও প্রথম দিকে ভারতবিরোধী তেমন কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে আটকের পর ভারতীয়দের অনিয়ন্ত্রিত আচরণের প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় জাতীয় পতাকার অবমাননা করা হয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তবে এটা ছিল মিথ্যা ও ষড়যস্ত্রমূলক। এটা এআই দিয়ে তৈরী করা ফেইক ভিডিও। রিউমর স্ক্যানার এটা প্রমাণ করেছে।এ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার হওয়া অপতথ্যের বিষয়ে শুরু থেকেই পর্যবেক্ষণ এবং অনুসন্ধান জারি রেখেছে রিউমর স্ক্যানার। সামাজিক মাধ্যমসহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার হওয়া অপতথ্যের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। রিউমর স্ক্যানার এই সময়কালের মধ্যে ৮৯৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে মাসভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনায় সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি (২৭৬) অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। দুই শতাধিক অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে আগস্ট (৮ তারিখ থেকে বাকি মাস) এবং অক্টোবরেও। নভেম্বরের প্রথম ১৫ দিনে দেড় শতাধিক অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এসব অপতথ্যের মধ্যে অনুমতিভাবেই সবচেয়ে বেশি ছিল রাজনীতি কেন্দ্রিক ঘটনার অপতথ্য। এর বাইরে আশঙ্কাজনকভাবে অপতথ্য ছড়িয়েছে জাতীয়, ধর্মীয় এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক ইস্যুতে। আর্থিকসহ একাধিক প্রতারণায়ও ভুয়া তথ্যের ব্যবহার এ সময়ে লক্ষণীয় ছিল। রিউমর স্ক্যানার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অপতথ্যের প্রবাহ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখেছে, এই সময়ে বর্তমান সরকারকে জড়িয়ে ৯৯টি গুজব প্রচার করা হয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে এই সময়ে অপতথ্যের সবচেয়ে বড় শিকার ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে জড়িয়ে ৯০টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ৭২টি গুজব প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে থাকা দুই সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে জড়িয়ে যথাক্রমে ২৪টি ও ১৮টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন, উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জড়িয়ে সমানসংখ্যক (১৫) অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। অপতথ্যের এই প্রবাহে জড়িয়েছে সরকারের আরেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের নামও, তাকে জড়িয়ে ৮টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে।অপতথ্যের এই বিশাল সংখ্যায় এটির যেমন ভূমিকা দেখেছি আমরা, তেমনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও বেশ প্রভাব রেখেছে। রিউমর স্ক্যানার অপতথ্যের এই প্রবাহ রুখতে আগামীতেও দায়বদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি এই লড়াইয়ে সচেতন সমাজ, গণমাধ্যম এবং সরকারকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানায় রিউমর স্ক্যানার। শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে নিরন্তর হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। একবার চট করে দেশে ঢোকার কথা বলেছেন, আবার তালিকা করে ধরে ধরে শায়েস্তা করার হুমকি দিয়েছেন। সর্বশেষ নিউইয়র্কের সভায় ভিডিও ভাষণে বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের পরিকল্পনাতেই গণহত্যা হয়েছে। আশ্রয় দেওয়ার পর ভারত এখন নির্বিঘেœ শেখ হাসিনাকে এসব কথা বলতে দিয়ে এ দেশের মানুষকে আরও খেপিয়ে তুলছে। ভারতের একশ্রেণির গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে ক্রমাগত অপতথ্যও ছড়ানো হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে ভারত সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ভারতীয় রাজনীতিবিদেরাও বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা সময় এমন সব কথা বলছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। চিন্ময় আটক হওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু ভারতে কোনো মুসলিম ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতা আটক হলে বাংলাদেশ বিবৃতি দেয় না। কূটনৈতিক রীতি অনুসারে দেওয়ার প্রয়োজনও মনে করে না। কিন্তু এসব বিষয়ে ভারতের সরকার ও রাজনীতিবিদেরা কূটনৈতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা করছেন না। ভারতের একশ্রেণির গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে ক্রমাগত অপতথ্যও ছড়ানো হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে ভারত সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ভারতীয় রাজনীতিবিদেরাও বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা সময় এমন সব কথা বলছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। চিন্ময়ের আটক হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেরাওয়ের হুমকি দিয়েছেন। পেঁয়াজ, আলু পাঠানো বন্ধ করে দেবেন বলেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী পাঠানোর মতো উদ্ভট কথাও বলেছেন। ভারতের একশ্রেণির গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদদের আচরণে মনে হচ্ছে, তাঁরা রাগে ফুঁসছেন। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করাই কি তাদের রাগের কারণ? হতে পারে শেখ হাসিনা ভারতকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। এখন তিনি পালিয়ে যাওয়ায় ভারতের স্বার্থে আঘাত লেগেছে। কিন্তু একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ভারতের সংযত আচরণ করা উচিত। তাদের এসব আচরণে মূলত বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত সরকারের প্রতি বিদ্বেষ বাড়ছে। এখান থেকে ভারতকে বেরিয়ে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ নয়, বাংলাদেশের মানুষকে আস্থায় নিতে হবে ভারতকে। সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝতে হবে ভারতকে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, প্রতিবেশী কোনো দেশেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতের প্রতি ভালো ধারণা নেই। নিরাপত্তার কারণেই প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভারতের হাতে রাখা দরকার। এটা করতে গিয়ে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর সরকারদের হাতে রাখার চেষ্টা করেছে। নিজেদের পছন্দের সরকারকে ক্ষমতায় রাখার চেষ্টা করেছে। এটা টেকসই কূটনীতি নয়। একসময় না একসময় ভারতপন্থী সরকারগুলো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফাঁকে জনসাধারণের মধ্যে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনা থেকে ভারত শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং ভারতের রাজনীতিবিদেরা একের পর এক উসকানি দিয়ে যাচ্ছেন। তবে আশার কথা হচ্ছে, ভারতের উসকানিতে কেউ পা দিচ্ছেন না। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে আটকের পরবর্তী ঘটনায় সারা দেশের মানুষ নজিরবিহীন ঐক্য ও সংযম প্রদর্শন করেছে। সব ধর্ম ও জাতি মিলে শান্তি বজায় রেখেছে। আগরতলার ঘটনায় জনসাধারণ প্রতিবাদ করলেও উগ্র আচরণ করেনি। নিরাপত্তার খাতিরেই ভারতকে উগ্রতা পরিহার করতে হবে এবং বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য আনতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার জনসাধারণকে আশ্বস্ত করতে হবে এই বলে যে তারা সৎ প্রতিবেশী হিসেবে অন্যদের ক্ষতির কারণ হবে না। ভারত যদি এ ধারণা বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে তৈরি করতে পারে, তাহলে ভারতের নিরাপত্তাঝুঁকি এমনিতেই কমে যাবে।স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশকে একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে ভারত। সীমান্তে অব্যাহতভাবে বাংলাদেশিদের হত্যা করেছে, উজানে নদীর পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে নিজের স্বার্থ আদায় করতে চেয়েছে। একের পর এক নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু ভারত যদি সীমান্তে হত্যা বন্ধ করে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে নদীর পানি বণ্টন করে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করে, তাহলেই ভারতবিরোধী মনোভাব এমনিতেই কমে আসবে এবং নিরাপত্তাঝুঁকিও কমবে। নিরাপত্তাসহ নানাবিধ কারণে বাংলাদেশকে ভারতের প্রয়োজন। আবার ভারতকেও বাংলাদেশের প্রয়োজন। তাই আস্থার সম্পর্ক বজায় থাকলে উভয় দেশই লাভবান হবে। কিন্তু ভারত চাপ দিয়ে একচেটিয়াভাবে স্বার্থ আদায় করতে চাইলে উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে। এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তাঝুঁকি যেমন বাড়বে, ভারতের নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়বে। মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুই দেশের সাধারণ মানুষ।

