ভারতের কলকাতায় বাংলাদেশ উপ হাইকমিশনের সামনে বাংলাদেশের পতাকা ও প্রধান উপদেষ্টার প্রতিকৃতি পোড়ানো এবং সহিংস বিক্ষোভের ঘটনায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার পরিপন্থী। এ ঘটনায় সারা বাংলাদেশের জনগণ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে একধরনের টানাপোড়েন চলছে। এ অবস্থায় পতাকা অবমাননার মতো প্ররোচনামূলক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করেই উত্তেজনা ও বিভক্তি বাড়াচ্ছে। যেকোনো দেশের মিশন ও এর কর্মীদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব স্বাগতিক দেশের। কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করলাম, ২৮ নভেম্বর বিকেলে বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ নামের একটি সংগঠনের কর্মসূচির সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে এবং কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়ে। এ ঘটনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের সব মিশন এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও কর্মীদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারপরও গত ২ ডিসেম্বর সোমবার দুপুরে আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা হয়। সেখানে হামলা, ভাঙচুর, ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড ভেঙে বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক জাতীয় পতাকা খুলে নিয়ে পোড়ানোর নিন্দনীয় ঘটনা ঘটে। এরপর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মাকে জরুরি ভিত্তিতে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বর্তমানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার পর কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, নিরাপত্তার কারণে আপাতত আগরতলার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে কনস্যুলার সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে ওই মিশন থেকে বাংলাদেশের ভিসা সেবা বন্ধ। এই সহিংস বিক্ষোভকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। কেননা, ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে যে ধরনের উত্তেজক বক্তব্য দিচ্ছেন, তা বস্তুনিষ্ঠ তো নয়ই, বরং বিভেদ উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মাঠের রাজনীতি ছাড়িয়ে ভারতের লোকসভায় গিয়েও এটি পৌঁছেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর লোকসভায় বলেছেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতির ওপর ভারত গভীরভাবে নজর রাখছে। ফলে এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে বাংলাদেশ বিরোধী কথাবার্তাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ভারতের অনেক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে এমন খবর পরিবেশন করা হচ্ছে, যেটা ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত। কিছু কিছু সংবাদপত্রে খবর পরিবেশনার ধরন এমন যে তারা যেন বাংলাদেশ বিরোধী প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে নেমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সয়লাব হয়ে যাচ্ছে অপতথ্য ও গুজবে। সর্বশেষ আমরা এর দৃষ্টান্ত দেখলাম সাবেক ইসকন সদস্য ও সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেপ্তারের ঘটনায়। চট্টগ্রাম আদালতে তার অনুসারীরা বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত বেধে যায়। একপর্যায়ে আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ভারতীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে মিথ্যা দাবি করা হয় যে চিন্ময় কৃষ্ণের আইনজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, সহকারী হাইকমিশনে হামলা ভারতীয় মিডিয়ার মিস ইনফরমেশনের ক্যাম্পেইনের ফল। ভারতীয় মিডিয়া মিথ্যা অপতথ্য ছড়াচ্ছে, ফলে ভারতের একটা অংশ ভায়োলেন্স ছড়াচ্ছে। ভারতের সঙ্গে আমরা সুসম্পর্ক চাই। তবে এই সুসম্পর্ক হতে হবে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে। আমরা বিবিসি, সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছি। ভারতীয় মিডিয়া আগে ডিটারমাইন করেছে কী ঘটেছে (সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে তারা কী দেখাবে)। সব মিডিয়াকে বলবো আপনারা আসেন, দেখে যান কী ঘটছে। ভারতীয় মিডিয়া আমাদের পুরো জাতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রভাব বহুমুখী। এতে দুই দেশের বহুমাত্রিক ও বহুমুখী সম্পর্কে যেমন স্থায়ী তিক্ততার সৃষ্টি হতে পারে, আবার সামাজিক অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে। কূটনীতিক ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, ৫ আগস্টের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণ হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা তারা মানতে পারেনি।ফলে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য ৫ আগস্টের আগের বাংলাদেশ আর ৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশ যে এক নয়, ভারতের নীতিনির্ধারকদের সবার আগে এই বাস্তবতা মানতে হবে। ভারতেই যেখানে সংখ্যালঘুরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা নিয়ে অতি উৎসাহী হয়ে কথা বলা কূটনৈতিক শিষ্টাচার পরিপন্থী।নিকট প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কটা শুধু ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, কৌশলগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। পরিবর্তিত বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তার আলোকেই দুই দেশের মধ্যে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, কূটনৈতিকভাবেই তার সমাধান করতে হবে। রাজনৈতিক নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য ও সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যমের অতিরঞ্জন সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয় নেওয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এমনকি জনপরিসরেও ভারতবিরোধিতা তীব্র হয়েছে। যেটি দৃশ্যমান ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন দেওয়াল চিত্রেও। ‘বয়কট ভারত’ কিংবা ‘ভারতবিরোধিতা দেশপ্রেমের অংশ’ এরকম স্লোগানও চোখে পড়েছে। ৫ আগস্ট থেকে এই বিরোধিতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। কেননা বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের বিরাট অংশই মনে করে বা বিশ্বাস করে যে, নির্বাচনী ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করে শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন মূলত ভারতের আশীর্বাদে। তার আমলে ভারত এই দেশকে তাদের অঙ্গরাজ্য হিসেবে বিবেচনা করেছে এমন জনশ্রতিও রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন এখানে ভারতের সৈন্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে বা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এখানে ভীষণ সক্রিয় ছিল, এমন কথাও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে। সত্য-মিথ্যা যাই হোক না কেন, অসংখ্য মানুষ এটি বিশ্বাস করেছে বা এখনও করে। এসব কারণে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এখানে ভারত বিরোধিতা আরও প্রবল হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দিয়ে বিভিন্ন মন্দির, মসজিদ ও মাজারে হামলা-ভাঙচুর। বিশেষ করে ভারত তথা সে দেশের সরকার ও গণমাধ্যমের একটি অংশ বলার চেষ্টা করছে যে, বাংলাদেশে হিন্দুরা নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারের পরে পানি আরও ঘোলা হয়। চিন্ময়কে মুক্তি না দিলে সীমান্ত ঘেরাওয়েরও হুমকি দেয় পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। সব মিলিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, সেটি কোনো দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। প্রশ্ন হলো, এই টানাপোড়েন কি শেষমেশ যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করবে? যদি সেটি নাও হয় তাহলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কি ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের মতো একটা দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা তৈরি হবে? গণমাধ্যমের প্রকাশ হচ্ছে, বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর কলকাতার মানিকতলা এলাকার জেএন রায় হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বাংলাদেশে ভারতীয় পতাকার অবমাননা এবং দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। এর আগে ভারতের জাতীয় পতাকা অবমাননার প্রতিবাদে বাংলাদেশি রোগী দেখা বন্ধ করেন প্রখ্যাত ভারতীয় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ইন্দ্রনীল সাহা। এরপর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার একটি হাসপাতালও বাংলাদেশি রোগী দেখবে না বলে ঘোষণা দেয়। ত্রিপুরা বাংলাদেশেীদের হোটেল -গেস্টহাউজ থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ভারতে বাংলাদেশের রোগীরা না গেলে তাতে ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজমই যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই। যেমন বাংলাদেশি পর্যটকের অভাবে কলকাতার নিউমার্কেটের ব্যবসায় লালবাতি জ্বলার উপক্রম হয়েছে এমন খবরও গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে এই সম্পর্কের টানাপোড়েনের পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সীমান্ত সমস্যা, পানিবণ্টন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বেশ কিছু কারণও রয়েছে। যেমন: তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে মূলত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে। এই চুক্তি কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশের মানুষের মনে ক্ষোভ আছে। তিস্তা ছাড়াও গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির তোয়াক্কা করে না বলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এটিও নির্মম সত্য। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যাও রয়েছে। ভারত যদি বাংলাদেশকে তার একটি বাজার কিংবা তার কোনো রাজ্যের মতো মনে করে, সেটি বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না। ভারতের এই আত্মজিজ্ঞাসাটা জরুরি যে, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে দারুণ অবদানের পরেও এই দেশের বিরাট জনগোষ্ঠীর ভেতরে যে ভারতবিরোধী মানসিকতা প্রবল হচ্ছে, সেখানে তার নিজের দায় কতটুকু?পরিশেষে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রশ্নে আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক ভাষা পরিহার করা জরুরি। যুদ্ধের বিকল্প সব সময়ই আলোচনা এবং আলোচনা।

