ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) ইসু্যু এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। সর্বত্রই এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতিবাদে উঠেছে বিতর্কের ঝড়। ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে হাইকোটে অপিল করা হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী নামের ইসকনের সাবেক এক নেতা গ্রেফতার এবং ইসকনের ভেতর ঢুকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের চট্টগ্রামের আদালতে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ঘটনায় নিয়ে তোলপাড় চলছে। ইসকনের ওপর ভর করে ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’ তকমা দিয়ে ভারত চাচ্ছে বাংলাদেশকে সাম্প্র্রদায়িক দেশ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে। এ নীল-নকশা সফল করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের সন্ত্রাসীদের ইসকনের ব্যানারে মাঠে নামিয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার রাজনৈতিক মুরুব্বি ভারতের এই চানক্যনীতি ধরে ফেলেছে বাংলাদেশের মানুষ। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পদত্যাগ করে হাসিনা দিল্লি পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত নানাভাবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের অপচেষ্টা করছে। হিন্দুত্ববাদী ভারতের সর্বশেষ ষড়যন্ত্রের কার্ড হচ্ছে ইসকন ইস্যু নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা। চানক্যনীতির ভারতের এই ষড়যন্ত্র বাংলাদেশ মানুষের কাছে স্পষ্ট। তাই দলমত নির্বিশেষ সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে ভারতীয় ষড়যন্ত্র রুখতে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে। ভারতের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে সারাদেশে মিছিল হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের মিছিলে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সবার মুখে এক আওয়াজ ‘ভারতের ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ও বাংলাদেশ’।গত দু’দিন ধরে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারা দেশের অর্ধশত স্পটে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। মিছিলে সবার মুখে ছিল একই স্লোগান ‘নরেন্দ্র মোদির ফাঁদে পা দেবো না। ভারতীয় ষড়যন্ত্র রুখবোই।’ মূলত সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টাকারী ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে সারা দেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় বড় মাদরাসায় শিক্ষার্থীরা মিছিল করে এবং ইসকন নিষিদ্ধের দাবি জানায়। বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতে ইসলাম, বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টি, সিপিবি, গণঅধিকার পরিষদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ প্রায় শতাধিক রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও সামাজিক সংগঠন ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে মিছিল, সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করেছে। তারা ইসকন ইস্যুতে ভারতীয় ফাঁদে পা না দেয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন। পুরান ঢাকার আদালতপাড়া, চট্টগ্রামের আদালতসহ দেশের বিভিন্ন আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা বিক্ষোভ করে অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলামের খুনিদের বিচার দাবি করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যেই ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরায় ভিডিও দেখে অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকারী সন্দেহে ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃত ছয়জনই আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সাথে জড়িত। মূলত আওয়ামী লীগ এখন গণধিকৃত। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ। ১৫ বছর জুলুম নির্যাতন করায় গণধোলাইয়ের ভয়ে প্রকাশে আসতে পারছে না। তাই মোটা অর্থ দিয়ে সারা দেশের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ইসকনের ব্যানারে নামার চেষ্টা করছে। তারা ঢাকার শাহবাগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। রংপুরে সমাবেশ এবং মিছিল করেছে। এসব খবর প্রচার করছে দেশি-বিদেশি কিছু মিডিয়া। ভারতের কিছু গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশের দিল্লির অনুগত কিছু গণমাধ্যম ইসকনের পক্ষ নিয়ে হিন্দু নির্যাতনের ফেক নিউজ প্রচার করছে। আবার ভারতও ইসকন ইস্যুতে হিন্দু তথা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে নির্যাতন হিসেবে প্রচার করছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী সীমান্তে অবরোধের হুমকি দিয়েছে। গত ২৮ নভেম্বর কলকাতার বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন অফিসে স্মারকলিপি দিয়েছে। ভারতে বাংলাদেশের পতাকা অবমাননা করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র দফতর থেকে একই সুরে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের গ্রেফতারকে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে আখ্যা দিয়ে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমনকি ভারতের লোকসভার বিরোধী দল কংগ্রেসও বিজেপির সুরে সুর মিলিয়ে ইসকন নেতা গ্রেফতারকে হিন্দু নির্যাতন হিসেবে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কর্মরত ভারতীয় সাংবাদিকরা ইসকন নেতা গ্রেফতারকে সংখ্যালঘুর ওপর নির্যাতন হিসেবে প্রচার করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভারতের এই মিথ্যা অভিযোগের বিবৃতির কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং ইসকন এক করে দেখার সুযোগ নেই। ভারতের ষড়যন্ত্রের কড়া প্রতিবাদ করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ভারতের উচিত তার দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা ভারতকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানাচ্ছি এবং আওয়ামী লীগের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা যেন ভারত সাসস্ক্রাইব না করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, আওয়ামী লীগের সহায়তায় ইসকন জঙ্গি সংগঠন হিসেবে স্বৈরাচারের সঙ্গী হয়ে ভারতের প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, ভারতের হাসিনা এই বাংলাদেশে তোমার আর ঠাঁই হবে না। ভারতে বসে যতই ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করা হোক, আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ সেই ষড়যন্ত্র রুখে দেব। গত ৫ আগস্ট দাঁড়িওয়ালা-টুপিওয়ালারা হিন্দুদের মন্দির পাহারা দিয়েছে। তবুও উগ্র হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি সংগঠন সাইফুল ইসলাম আলিফ ভাইকে হত্যা করেছে। এ দেশে সব ধর্মের সহাবস্থান থাকবে। যে হিন্দু সে হিন্দু ধর্ম পালন করবে। যে বৌদ্ধ সে বৌদ্ধ ধর্ম পালন করবে। যে খ্রিষ্টান সে খ্রিষ্টান ধর্ম পালন করবে। আমরা সবার অধিকার রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা উগ্রবাদী সংগঠন পরিচালনা করবে, সেসব উগ্রবাদী সংগঠনকে বাংলাদেশে কোনও জায়গা দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ ধর্মীয় সৌহাদ্য ও সম্পৃতির দেশ। ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সব ধর্ম ও বর্ণের নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করছে। উপদেষ্টা মন্ডলীর একাধিক সদস্য এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। কিন্তু ইসকন আর সনাতন ধর্মকে এক করে গুলিয়ে ‘ফেক’ তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। গত ২৯ নভেম্বর ভয়েস অব আমেরিকার প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা দিতে পারছে। জরিপের ফলাফলে নিরাপত্তা নিয়ে ধারণায় মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তুলনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে বেশি নিরাপত্তা দিচ্ছে।একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জানান, ইসলাম ধর্মের কিছু মানুষ যেমন তাবলিগি জামাতের সদস্য, তারা মসজিদে মসজিদে ঘুরে বেড়ান, মানুষকে ইসলামের বাণী শোনার আমন্ত্রণ জানান; তেমনি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কিছু মানুষ ইসকনের সদস্য। সনাতন ধর্ম আর ইসকন এক করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ও ভারতের শতকরা ৯০ থেকে ৯২ ভাগ হিন্দু র্ধর্মাবলম্বী ইসকন সমর্থন করেন না। মুসলমানদের তাবলিগি জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি। ১৯২৬ সালে মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি ভারতের মেওয়াতে এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলাম ধর্মের কিছু সংখ্যক মানুষ তাবলিগি জামাত করে থাকেন। আর আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের ইংরেজি নাম ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেসের সংক্ষিপ্ত রূপ হলোÑ ইসকন। মার্কিন নাগরিক হিন্দু ধর্মগুরু অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ১৯৬৬ সালে নিউইয়র্কে এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ইসকন মূলত গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদের অনুসারী এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষুদ্র একটি সংগঠন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসকন সদস্য। এমনকি বাংলাদেশে মুসলমান ঘরে জন্ম নেয়া সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুর রহমান নওফেল চৌধুরী ইসকন সদস্য। অতএব রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীকে গ্রেফতার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন বলার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূলত ধার্মিকতা আর ধর্মান্ধতা এক জিনিস নয়। ধার্মিকতা মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যায় আর ধর্মান্ধতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে দেশছাড়া করার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মান্ধতার দিকে ঠেলে দেয়া ইসকনের ওপর ভর করে বাংলাদেশের উপর প্রতিশোধ নিতে চায় ভারত। গত সাড়ে তিন মাসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়ে পুরোনো সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যুকে সামনে আনতে চাচ্ছে। বাংলাদেশে তথাকথিত মৌলবাদীর উত্থান প্রমাণ করতে চাচ্ছে। ইসকনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অস্থিতিশীল করার ফন্দি করেছে। এ জন্য নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও পলাতক আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অনেকেই মুসলমান হয়েও গেরুয়া পোশাক পরে ইসকনের সমাবেশ ও মিছিলে যোগদান করছে। ইসকনের মিছিলে অংশ নিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে মাঠ গরমের চেষ্টা করছে ওই ফ্যসিস্ট হাসিনার অনুসারীরা। ভারতের মদদেফ্যাসিস্ট সরকারের ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে হবে।

