পতিত আওয়ামী লীগ ও ভারতের মোদি সরকার একট্টা হয়ে ‘সংখ্যালঘু কার্ড’ খেলেই চলেছে। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণবিপ্লবে স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা রকম চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের মধ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে অপপ্রচার অন্যতম। মিথ্যা অভিযোগ তুলে কিছু হিন্দুকে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিন দিন সীমান্তে রেখে ছবি তুলে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। এরপর ১১ আগস্ট থেকে রাজধানীর শাহবাগে সংখ্যালঘু নিপীড়নের প্রতিবাদে কিছু লোক বিক্ষোভ-সমাবেশ শুরু করে। বাংলাদেশে স্বৈরাচারের পতনের পর পরই ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে কল্পিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পেছনে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী জড়িত বলে প্রচারণা চালানো হয়। এমনকি এর পেছনে পাকিস্তানের আইএসআই আছে বলেও বলা হয়। এ প্রচারণাও চালানো হয় যে, ইসলামপন্থী নানা বাহিনী সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলা করছে। টাইমস গ্রুপের ‘মিরর নাউ’ এর ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যার শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলা : উত্তেজিত জনতার গণহত্যা, হত্যা’, ওই ভিডিওতে চারটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা দেখানো হয়। পরে দেখা গেছে, চারটি বাড়ির দুটির মালিক মুসলমান। কাতারভিত্তিক আলজাজিরা এ ব্যাপারে একটি বিস্তৃত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বরাতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দিন ৫ আগস্ট সোমবার রাতে দেশটির ৬৪টি জেলার মধ্যে ২০টিতে হিন্দু বাড়িতে হামলা ও লুটপাট হয়েছে। আলজাজিরার প্রতিনিধি কয়েকটি জেলায় সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক কারণে ওইসব বাড়িতে হামলা ও লুটের ঘটনা ঘটেছে। আলজাজিরাকে একজন হিন্দুনেতা বলেছেন, যতদূর তিনি জানতে পেরেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে এমন হিন্দু ব্যক্তি বা পরিবার ছাড়া সাধারণ হিন্দু ব্যক্তি বা পরিবার আক্রমণের শিকার হয়নি। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, হামলার কারণ রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক নয়। এখানে বিশেষভাবে বলা দরকার যে, ৫ আগস্ট রাতে সারাদেশে অন্তত ১১৯ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র দু’জন হিন্দু। একজন আওয়ামী লীগের নেতা, অন্যজন পুলিশ। পরবর্তী কয়েকদিনেও হামলা-লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বটে, তবে হিন্দুর মৃত্যুর কোনো খবর নেই। আর অধিকাংশ হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে মুসলমানদের বাড়িঘরে। সর্বশেষ ইসকনের নেতা-কর্মীরা বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের ব্যানারে সারাদেশে ব্যাপক আন্দোলনের নামে অরজাকতা চালায়। এ সংগঠনের মুখপাত্র ইসকনের সাবেক নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতারে প্রতিবাদে সনাতনীরা ২৫ নভেম্বর ডিবি কার্যালয় ঘেরাও করে। ২৬ নভেম্বর চিন্ময় কৃষ্ণকে চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করা হলে তার সমর্থকরা প্রিজনভ্যান ঘিরে রাখে। পুলিশ তাদের সরাতে গেলে ইসকন নেতাকর্মীরা সেখানে ব্যাপক হামলা ও ভাংচুর চালায়। তারা চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে পিটিয়ে হত্যা করে। আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যায় ধারালো অস্ত্র হাতে সরাসরি অংশ নেয় ১৫ জনের একটি দল। তাদের মধ্যে অন্তত দুইজন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এদের সাতজনকে গ্রেফতার করেছে যৌথবাহিনী।
তারপরও হিন্দুদের হত্যা, হামলা ও লুটপাটের কল্পকাহিনী প্রচার ও নানাভাবে ডেমনেস্ট্রশনের লক্ষ্য আসলে রাজনৈতিক। এতে পতিত স্বৈরাচারের রাজনৈতিক লাভ এবং ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক মোদির রাজনৈতিক লাভ। আওয়ামী লীগের লাভ, আওয়ামী লীগ বা হাসিনা সরকারের সময় হিন্দুরা নিরাপদ ছিল, এটা প্রমাণ করে বিশ্ববাসীকে দেখানো। মোদির লাভ, এই প্রচারণার মাধ্যমে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে আরো একটু মজবুত করা। ইতোমধ্যেই তার দলীয় নেতা এবং মিডিয়ার তরফে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের নানা কাহিনী প্রচার করার সঙ্গে সঙ্গে এক কোটি হিন্দু ভারতে প্রবেশ করবে বলেও জানানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তাদের শরণার্থী হিসাবে গ্রহণ করা হবে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল করলেও তাদের বেশির ভাগের সংশ্লিষ্টতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে। বলা হয়, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিন্দুরা। অথচ, আওয়ামী লীগের দ্বারাই হিন্দুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা বেশির ভাগ হামলার শিকার হয়েছে আওয়ামী লীগের লোকদের দ্বারা। তাদের জমি-সম্পদ দখলকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের লোকদের সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে হিন্দুদের ওপর যে হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, তাও ঘটাচ্ছে আওয়ামী লীগের লোকরাই। এটা হিন্দু নেতাদেরই দাবি। জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোবিন্দ প্রামানিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, চলমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর আওয়ামী লীগ নেতারই হামলা চালাচ্ছেন। তিনি কয়েকটি নজির তুলে ধরেছেন। বলেছেন, দক্ষিণাঞ্চলের একটি বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। একজন বিএনপি নেতার কথা বলে ডাকাতি হলেও ডাকাতদের আটক করার পর দেখা গেছে, তারা আওয়ামী লীগের কর্মী। আরেকটি জায়গায় একজন প্রতীমা ভাঙতে গেছে। তাকে হাতে নাতে ধরার পর দেখা যায় তার গায়ে বিএনপি’র একটি জার্সি। পরে ভিডিও ফুটেজে তার বক্তব্যে দেখা যায়, তাকে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা টাকা দিয়ে পাঠিয়েছে। একটা গ্রামে বেশ কিছু হামলা হয়েছে। সেসব হামলার ব্যাপারে ভিকটিমরাই বলেছে, হামলাকারীরা আওয়ামী লীগের লোকজন। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা অনেকেই বলেছেন, অতীতে আওয়ামী লীগের নেতারা যেমন হিন্দুদের ঘরবাড়ি জমিজমা দখল করেছেন। এবারও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ধুঁয়া তুলে নিরীহ হিন্দুদের দেশছাড়া করে তাদের সবকিছু দখল করার পাঁয়তারা করেছে তারা। সনাতন পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনুপ কুমার দত্ত এক আলোচনা সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কালিমা লিপ্ত করার জন্য একটি গোষ্ঠী সংখ্যালঘু নির্যাতনের ফানুস ওড়াচ্ছে। তিনি অবিলম্বে তাদের শক্ত হাতে দমন করার আহব্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ভারতের এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও সবাই ভারতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, গণতন্ত্র মঞ্চ সবাই ভারতের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে কেউ যেন পা না দেয় এ জন্য দেশবাসীকে দৈর্য্য ধরার আহবান জানিয়েছে। তাদের এ আহবানে গতকাল সারাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এই ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ করেছে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে।
বাংলাদেশ সম্প্রদায়িক সম্পীতির দেশ হিসাবে বিশ্বব্যাপী নন্দিত ও প্রশংসিত। শত শত বছর ধরে মুসলমান, হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ও অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মানুষ এদেশে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করে আসছে। মুসলমানরা সংখ্যাগুরু হলেও অন্যান্য সম্পদায়ের লোকদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ও সহানুভূতিসম্পন্ন। ইসলামে সংখ্যালঘুদের প্রতি যে আচরণ করতে বলা হয়েছে, মুসলমানরা সে আচরণই করে। এখানে সংখ্যালঘুরাও মুসলমানদের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে না। স্বৈরাচারের পতনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক কিছুই ঘটেছে, যা অভিপ্রেত নয়। তবে মনে রাখতে হবে, কোনো জনপদে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন ঘটলে বা রাষ্ট্রবিপ্লব হলে এর চেয়ে অনেক বেশি অপ্রীতিকর ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। অত্যন্ত আশা ও আত্মশ্লাঘার কথা, বৃহত্তর সম্প্রদায় মুসলমানরা সংখ্যালঘুদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আগের মতই। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঘোষণা দিয়ে হিন্দুদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দির রক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। ইসলামী দলসমূহ, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ইত্যাদি গ্রাম-জনপদ, মাঠে-ময়দানে রাতদিন পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। এটাই আসলে বাংলাদেশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ও নেতাদের সতর্ক থাকতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া কখনোও উচিৎ হবে না। যারা এ ফাঁদে পা দেবে তাদেরই ক্ষতি হবে। হিন্দুনেতারা এ ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা প্ররোচণায় প্ররোচিত হয়ে যারা সীমান্ত পার হবে, তাদের তালিকা করতে হবে। তাদের ভোটার আইডি, পাসপোর্ট সব কিছু বাতিল করতে হবে। এখনই এরকম পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিলে কেউ সীমান্তমুখী হবে না। আমরা তাদের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। সরকার বিষয়টি আমলে নেবে বলে মনে করি। আশা করি, যারা প্রতিদিন বিক্ষোভ সমাবেশ করছে তারাও বিষয়টি উপলব্ধি করবে। হিন্দুরা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ফাঁদ থেকে নিজেদের মুক্ত ও নিরাপদ রাখবে, এটাই কাম্য। গত ১৬ বছরে দেশকে লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিনত করার মধ্য দিয়ে একেকজন আওয়ামী লীগ নেতা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ভারতে পালাতে গিয়ে অল্প কিছু সংখ্যক ধরা পড়লেও অধিকাংশ এখন দেশে-বিদেশে পলাতক। তারা এখন কোটি কোটি টাকা খরচ করে দেশকে অস্থিতিশীল করার মধ্য দিয়ে অর্ন্তবর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলে, ব্যর্থ প্রমাণ করে দেশে একটি প্রতিবিপ্লবের গ্রাউন্ড তৈরী করতে চাচ্ছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মূল আইকন, প্রকাশ্য-নেপথ্যে থাকা সব কুশীলব ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে।নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ, রিকশা ও পরিবহন শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, হিন্দুলীগসহ ১৬ বছর ধরে নানারকম সুবিধাভোগীরা বসে নেই। প্রতিটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, কল-কারখানা ও শহর-বন্দরে তারা কাজ করে চলেছে। অর্ন্তবর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল ও ব্যর্থ করে দিতে তারা নানামুখী ষড়যন্ত্রের জাল বুনে চলেছে। এই ষড়যন্ত্রে কিছুতেই পা দেওয়া যাবেনা।

