ঢাকাSunday , 17 November 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল নিয়ে এত কথা কেন

তালুকদার রুমী
November 17, 2024 10:19 pm
Link Copied!

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে গণমাধ্যম সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে বা স্বাধীনতা ভোগ করছে এমনটাও বলা যায়। অনেক সংবাদকর্মীর মতে গত ৫০ বছরেও দেশের গণমাধ্যম এত স্বাধীনতা ভোগ করেনি যা এখন করছে। এই স্বাধীনতা যাতে সব সময় থাকে তা নিশ্চিত করতে এ সরকার এরই মধ্যে গণমাধ্যম সংস্কার বিষয়ক একটি কমিশনও গঠন করেছে। গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের আন্তরিকতা সংবাদমাধ্যমগুলোকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে অনুপ্রাণিত করছে। এর প্রতিফলন প্রতিদিনই সংবাদপত্রগুলোতে আমরা দেখছি। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করার সাহস দেখাচ্ছে। বিগত স্বৈরাচারের আমলে যে সংবাদটি প্রকাশ করতে ভাবতে হতো, এখন তা ভাবতে হচ্ছে না। বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র বিনির্মাণে সংবাদপত্রের সঙ্গে সরকারের এই মেলবন্ধন গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। আমরা সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা যখন এত স্বাধীনতা উপভোগ করছি তখন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল নিয়ে একটা গোষ্ঠী হৈ চৈ শুরু করেছে। অনেকেই বলছেন এটাও এ সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরণের ষড়যন্ত্র। সংবাদপত্র সংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে এ সরকারকে দেশে বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এ ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে তারা পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার দোসরদের সুকৌশলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা অভিযোগ তুলেছেন, সরকার গত তিন দফায় মোট ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করেছে। এসব সাংবাদিকদের সিংহভাগই সক্রিয় সাংবাদিকতায় জড়িত। পত্রিকার সম্পাদক থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের কার্ড ঢালাও বাতিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে শুধু খর্ব করছে না, এটি একটি খারাপ নজিরও স্থাপন করতে যাচ্ছে। এ নিয়ে ইতিমধ্যে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) এবং বাংলাদেশের সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’ প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। সম্পাদক পরিষদ গত ১২ নভেম্বর এক বিবৃতিতে ঢালাওভাবে সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ বলেছে, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের কোনো অপব্যবহার হলে তা রিভিউ করার অধিকার তথ্য মন্ত্রণালয় রাখে। তবে এভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও অপরাধের প্রমাণ ছাড়াই ঢালাওভাবে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের পদক্ষেপ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতের অন্তরায়। তবে এ বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের কোনো চাপ নেই, এই স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে গণমাধ্যমকে সাহসের সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল হচ্ছে। তারপরও যদি প্রফেশনাল কারো কার্ড বাতিল হয়ে থাকে তাহলে সেটা রিভিউয়ের সুযোগ আছে। অন্যদিকে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড কমিটি ঢালাওভাবে কার্ড বাতিল হচ্ছে বলে যে অভিযোগ করছে তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এসব কার্ড বাতিল হয়েছে। এছাড়া প্রায় চার হাজার কার্ডের মধ্যে মাত্র ১৬৭ জনের কার্ড বাতিল হয়েছে। এটাকে ঢালাওভাবে বাতিল হচ্ছে এমনটা বলা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। এ বিষয়ে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড কমিটির সদস্য জিয়াউল কবির সুমন বলেন, ঢালাওভাবে কার্ড বাতিল হচ্ছে এটা মোটেও সত্য নয়। কারণ এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার কার্ডের মধ্যে মাত্র ১৬৭ জনের কার্ড বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জনের নামে হত্যা মামলা আছে। প্রায় ১০০ জনের মতো আছেন যাদের কার্ডের মেয়াদ আরো পাঁচ-ছয় বছর আগে শেষ হয়েছে। তারা আর রিনিউ করেননি। এ ছাড়া অনেকের অফিস থেকে আবেদন করে কার্ড বাতিল করা হয়েছে। কারণ তারা আগে প্রধানমন্ত্রী বিট বা সচিবালয় বিটে কাজ করতেন। এখন তাদের অন্য বিটে দেয়া হয়েছে। এজন্য তাদের আর অ্যাক্রিডিটিশন কার্ডের প্রয়োজন নেই। তাই যারা বলছেন ঢালাওভাবে কার্ড বাতিল করা হচ্ছে এটা সঠিক নয়। যথাযথ কারণেই কার্ড বাতিল করা হচ্ছে। তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) বলছে ফ্যাসিবাদের দোসর, হত্যা মামলার আসামিসহ আরো অনেক সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সাংবাদিক নামধারীদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিন দফায় মোট ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল হয়েছে। পিআইডির তথ্য মতে, গত জুলাই বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেয়া হয়েছে তিন হাজার ৮৫৭টি অর্থাৎ প্রায় চার হাজার। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে মাত্র ১৬৭ জনের কার্ড। দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসন আমলে দেশের সংবাদপত্রের কোন স্বাধীনতা ছিল না। সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করতে আইসিটি অ্যাক্ট, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট এসব নামে কালাকনুন করে সাংবাদিকদের নিপীড়ন-নির্যাতন করা হয়েছে। তখন এক শ্রেণির ‘দালাল’ সাংবাদিক ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের তোষণে লিপ্ত ছিল। তখন তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কোন কথা বলেনি। আইসিটি অ্যাক্টে ২০১৪ সালে প্রথম মামলা করা হয় দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, পত্রিকার বার্তা সম্পাদক, প্রধান প্রতিবেদক ও সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের নামে। এরপর অফিস থেকে বার্তা সম্পাদক রবিউল্লাহ রবি, তখনকার প্রধান প্রতিবেদক রফিক মুহাম্মদ ও রিপোর্টার আহমদ আতিককে ডিবি গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ইনকিলাব অফিসের প্রেসে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। সম্পাদকের বাসায় হামলা-ভাঙচুর করা হয়। তখন এ সব মানবতাবাদীরা সংবাদপত্রের বা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিয়ে কোন কথা বলেননি। বিগত সরকারের সময় ইনকিলাবের ২৮টি কার্ডে মধ্যে ২০টি বাতিল করা হয়। বিচারপতি স্কাইপি কেলেঙ্কারি প্রকাশ করায় আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে অফিস থেকে গ্রেফতার করা হয়। আমার দেশ পত্রিকার প্রেস বন্ধ করে দেয়া হয়। এ পত্রিকার রিপোর্টার অলিউল্লাহ নোমানকে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। এ রকম দেশ ছেড়েছেন আরো অনেক সাংবাদিক। সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক যায়যায় দিনের সম্পাদক শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করা হয়, এরপর এক পর্যায়ে তাকে দেশ ছেড়ে যেতে হয়েছে। দৈনিক সংগ্রামের প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদকে অফিস থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ রকম সাংবাদিক নির্যাতনের আরো বহু ঘটনা ঘটেছে, তখন এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারেনি বা বলেনি। দৈনিক দিনকাল পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দিগন্ত টিভি, চ্যানেল ওয়ান, ইসলামী টিভিসহ আরো অনেক মিডিয়া বন্ধ করা হয়েছে। দৈনিক সংগ্রাম, নয়া দিগন্ত, দিনকাল, ইনকিলাব এসব পত্রিকার বেশির ভাগ অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। আজকে যারা ১৬৭ টি কার্ড বাতিল হওয়া নিয়ে এত কথা বলছেন তারা তখন কেউ কোনো কথা বলেনি। এ বিষয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি রাশেদুল হক বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ছিল মাত্র হাজার থেকে বার শ’-এর মতো। আর এখন এই কার্ডের সংখ্যা হয়েছে প্রায় চার হাজার। এরা সবাই কি সাংবাদিক? ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে যুবলীগ, ছাত্রলীগের কর্মীদের ঢালাওভাবে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেয়া হয়েছে। তারা এ কার্ড দিয়ে সচিবালয়ে ঢুকে তখন তদবির করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের মালিকরা তাদের ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার তাদের নামে কার্ড নিয়েছে। এসব এখন ভালভাবে তদন্ত করে বাতিল করতে হবে। ছাত্রলীগ, যুবলীগের যে সব নেতাদের কার্ড দেয়া হয়েছে তারা এসব ব্যবহার করে সচিবালয়ে ঢুকে যে কোনো অঘটন ঘটাতে পারে। তাই সরকারকে এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রফেশনাল সাংবাদিক যারা তাদের কার্ডের বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু স্বৈরাচার হাসিনার দোসর যারা তাদের কার্ড অবশ্যই বাতিল করতে হবে। তা না হলে জুলাই বিপ্লবের চেতনার সাথে বেঈমানি করা হবে। বাতিল হওয়া অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড মালিকদের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, তাঁদের মধ্যে একটি অংশ বিদায়ী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন। অনেকেই শেখ হাসিনা সরকারের তাঁবেদারি করতে গিয়ে সাংবাদিকতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। অনেকেই প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের সংবাদ সংগ্রহের জন্য হাউসগুলো থেকে নিয়োজিত ছিলেন। তাদেরকে অফিস থেকে অন্য বিটে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকের নামে হত্যা মামলাসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সরকার যে যুক্তিতে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করেছে, সেই যুক্তিগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলে প্রেস অ্যাক্রেডিটেশনের নীতিমালা ২০২২ এর আলোকে বাতিল করা হচ্ছে। তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) অ্যাক্রেডিটেশনের নীতিমালা ২০২২-এর অনুচ্ছেদ ৬.৯, ৬.১০, ৯.৫ এবং ৯.৬ ধারার আলোকে স্থায়ী ও অস্থায়ী সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের কথা বলেছে। কার ক্ষেত্রে ঠিক কোন ধারাগুলোর আওতায় পড়েছে সেগুলো বিশ্লেষন করেই বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে পতিত শেখ হাসিনা সরকারপন্থী সাংবাদিকদের তালিকাকে সামনে রাখা হয়েছে, যাঁরা অতীতে সরকারপন্থী সাংবাদিকদের সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছে, সদস্য ছিল তাদের কার্ড শুধু বাতিল হচ্ছে এমন প্রচারা এক ধরনের অপপ্রচার। ফ্যাসিবাদের দোসরদের বাঁচানোর এই সুকৌশলী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।