ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতেৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের বয়স ১০০ দিন হতে যাচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থানে গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায়। সে হিসাবে হাসিনার পতনের ১০০ দিন ১৫ নভেম্বর পূর্ণ হয়ে গেছে। আর হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর অর্থাৎ ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তকালীন সরকার। তাই এসরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল অর্থাৎ ১৮ নভেম্বর। একটি সরকারের হানিমুন কাল হিসাবে ১০০দিনকে ধরা হয়ে থাকে। সে হিসাবে সরকারের হানিমুন কালও শেষ হয়ে গেল। এ অবস্থায় এ সরকার সম্পর্কে মানুষ কি ভাবছে সেটি এখন বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরশাসকের পতনের পর যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে তার কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সে অনুযায়ী এ সরকার তাদের সাধানুযায়ী কাজ করছে। তবে দেশি-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্র এ সরকারের এগিয়ে চলার পথে বাধার সৃষ্টি করছে। ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত সফল বিপ্লবের মধ্যদিয়ে নতুন এক বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটছে। এক নায়ক শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ৮ শতাধিক মানুষের আত্মত্যাগের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু নয়, সাম্প্রতিক বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এই বিপ্লবের মূল চেতনা হল বৈষ্যম্যের অবসান। একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু গণ-অভ্যূত্থানের এই যে বিশাল আকাঙ্খা তা বাস্তাবায়নের বিষয়ে এরই মধ্যে জনমনে কিছুটা হতাশার সৃষ্টি করেছে। তারপরও মানুষ এ সরকারকে সমর্থন করে, তাদের সফলতা কামনা করে। দেশের মানুষের এখন প্রধান চাওয়া দুটি। এক রাষ্ট্রসংস্কার, দুই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন। সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষে ১০টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এসব কমিশন তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। নব্বই দিনের মধ্যে এসব কমিশন সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পেশ করবে। এরপর সরকার এসব প্রস্তাবনা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচননা করে একটি ঐক্যমতের ভিত্তিতে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করবে। এ বিষয়টি জনগণের কাছে এখন অনেকটাই পরিস্কার। তবে নির্বাচন নিয়ে এখনো কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকারের কাছে নির্বাচন কবে হবে এমন একটি সুস্পষ্ট রোড ম্যাপ ঘোষণার দাবি করে আসছে। জামায়াতে ইসলামী অবশ্য সংস্কারকেই প্রাধান্য দিয়ে বলছে, সংস্কারের জন্য যৌক্তিক সময়ের পরে নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের কোন আপত্তি নেই। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা একটি টেলিভিশন টকশোতে বলেছেন যে নির্বাচন আগামী বছরের শেষের দিকে অর্থাৎ ২০২৫ সালের নভেম্বর ডিসেম্বরে হতে পারে। তার এ বক্তব্য নিয়ে সরকারের ভিতরেই অনেক সমালোচনা হয়েছে। তবে গত ১৪ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এএফপিকে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ যতটা সম্ভব কম সময় হওয়া উচিত। তার এ কথায় দ্রুত নির্বাচন দেওয়ারই ইঙ্গিত বহন করে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, সংস্কারের গতিই সিদ্ধান্ত দেবে কতো তাড়াতাড়ি নির্বাচন হবে। আমরা এই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, যত তাড়াতাড়ি আমরা প্রস্তুত হবো, তত তাড়াতাড়ি নির্বাচন হবে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে এবং দেশ পরিচালনা করবে। দ্রুততার সঙ্গে সম্ভাব্য সাংবিধানিক সংস্কার, পাশাপাশি সরকার, পার্লামেন্ট এবং নির্বাচনী আইনের ধরনের বিষয়ে দেশকে দ্রুতই একমত হতে হবে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে আমাদের মেয়াদ যতটা সংক্ষিপ্ত সম্ভব তা হওয়া উচিত। তার এ বক্তব্যে কবে নির্বাচন হবে বা হতে পারে এমন কোন তারিখ উল্লেখ করা না হলেও এটা যে খুব দ্রুতই হবে সেটা তিনি কিছুটা পরিস্কার করেছেন।
দেশের ছাত্র-জনতার অন্যতম চাওয়া ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিক গণআন্দোলন ও অভ্যূত্থানে হতাহতদের তালিকা তৈরী করে তাদেরকে যথাযথ পুর্নবাসন ও সম্মানিত করবে। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু ১০০তিন অতিবাহিত হলেও সরকার তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয় এ সরকার আহতদের সুচিকিসা দিতেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ জন্য তারা অবশ্য দুঃখ প্রকাশ করে অতিদ্রুত আহতদের সুচিকিৎসা ও তাদের পূনর্বাসন অঙ্গিকার করেছে। তবে এ সরকারের কিছু ব্যর্থতার পাশাপাশি এই অল্প সময়ে অনেক সফলতাও রয়েছে। এর মধ্যে আর্ন্তজাতিক অঙ্গণে দেশের ভাবমর্যাদাকে অনেকটাই উন্নত করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতি সংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি দেশের ভাব মর্যাদাকে অনেক উজ্জ্বল করেছেন। তার ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এক নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও অভিযাত্রায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ৫৩ বছরের ইতিহাসে আর কখনো কোনো বাংলাদেশী নেতাকে নিয়ে জাতিসংঘে এতটা উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা দেখা যায়নি। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী রিজিমকে হটিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং কথিত সংস্কারের এজেন্ডাকে সামনে রেখে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষেত্রে ড. ইউনূসের বক্তব্য ও বয়ানের একটি যৌক্তিক ভিত্তি লাভ করেছে। আর্ন্তজাতিক মহলে বাংলাদের মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুণঃর্গঠনে ড. ইউনূস বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক দাতা সংস্থার কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। এসব সংস্থা তাকে পূর্ণসহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে এবং সহযোগিতা করছে। এ বিপ্লবের মূল চেতনা বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রগঠন করা। দেশের মানুষ আওয়ামী আমলের গোষ্ঠীপ্রীতি থেকে কতটা মুক্তি পেল এবং অতঃপর তারা বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক সুযোগ পাওয়ার সুযোগ ও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কাছ থেকে যথাযথ সেবা পাচ্ছে কি না, সে মূল্যায়নও এখন শুরু হয়েছে।৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার প্রথম ১০০ দিনে কী করতে পারল না পারল, তার নির্মোহ আলোচনা তুললে আবার কেউ কেউ বলবেন এ সরকারকে আরও কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। হ্যাঁ আমরাও দেশের মানুষের পাশাপাশি এ সরকারকে আরও কিছুটা সময় দিতে চাই। তবে এ সময়টাকে সরকারেরও আন্তরিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। এখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভুলে গেলে চলবে না, শেখ হাসিনার ‘স্মৃতি কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে’। তার আমলের যত কেলেঙ্কারি এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার শহীদ ও তাঁদের পরিবারের গল্প রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গলা ছেড়ে বলছে না কেন, যাতে কালেকটিভ মেমোরিতে জারি থাকে! দুঃশাসনের ভূত বর্তমান ও পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে তাড়া করতেই থাকবে, যদি হত্যাকাণ্ড ও দুর্নীতির দৈত্যকে কলসিতে ভরে সাগরের তলদেশে রাখা না হয়। হাসিনা এখন অতীত। তাঁর শাসনামলে হারিয়ে যাওয়া গণমানুষের আস্থা ও আশাবাদ ফেরানোর প্রতিশ্রুতি নিয়েই ক্ষমতার দৃশ্যপটে হাজির হয়েছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও রক্ত ঝরার বেদনা বিপ্লবের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটায়। এই অভাবনীয় ঘটনার ফলে জনমনের প্রাথমিক স্বস্তি ইউনূস সরকারের জন্য ছিল সুবিধাজনক অবস্থান, কৃতিত্ব নয়। একটি নষ্ট ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার পর সুষ্ঠু, কার্যকর একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই রয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের টিমের সামনে। ইতোমধ্যে এই সরকার কয়েকটি কমিশন গঠন, একঝাঁক নিয়োগ এবং ফ্যাসিবাদী হাসিনা ও তাঁর দোসরদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করাসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।তবে এক দশকের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ সরকার ক্ষমতা সুসংহত করতে পেরেছে, এমনটা মনে হয় না। আমলাতন্ত্র ও বিভিন্ন সেক্টরে অস্থিরতা তার নজির।সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সেবাপ্রাপ্তিতে দুর্নীতির উপস্থিতি এবং আওয়ামী আমলে অর্জিত অবৈধ অর্থসম্পদ উদ্ধারে ব্যবস্থা না নেওয়া, চলমান শাসনের বিচ্যুতিই প্রমাণ করে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যেমন খুব আস্থাশীল হওয়া মুশকিল, তেমনি উন্নতি দেখা যায় না ব্যবসায়িক পরিবেশেও যেখানে উদ্যোক্তা ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ হতে পারতেন ইতিমধ্যেই।প্রধান উপদেষ্টা পদে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত ইমেজ বিশ্বকে মুগ্ধ করে, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে কোনো পেশাগত বা একাডেমিক আলোচনা আমরা শুনতে পাচ্ছি না।হাসিনার স্বেচ্ছাচারী শাসনে যেহেতু বিজাতীয় শক্তিরও আশীর্বাদ ছিল এবং পররাষ্ট্রনীতি ছিল তাঁর পকেটে। তাই পরিবর্তনের বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্ক রিসেট করার জন্য জাতির অন্তর্গত তাগিদ রয়েছে এটা সরকারকে অবশ্যই বুঝতে হবে।যে আশা ও তার জন্য আত্মত্যাগের প্রতিজ্ঞা নিয়ে ছাত্র ও সাধারণ মানুষেরা দেড় দশকের উৎপীড়ককে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করে, সেই জনগণের সঙ্গে সরকারি নেতৃত্বের সরাসরি সংযোগ বা সংলাপের কোনো আয়োজন এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। ছিঁড়ে যাওয়া সামাজিক আবরু প্রতিস্থাপনের উদ্যোগও সেভাবে নেই।ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদের উত্থান রোধ করতে এখনই রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার। ইউনূস সরকারের উদ্যোগগুলো, বিশেষ করে সংস্কার কার্যক্রমকে, টেকসই বা কালজয়ী করতে হলে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতিশ্রুতি ও অংশীদারত্ব অপরিহার্য।

