আগামী ১৮ নভেম্বর ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একশ’ দিনপূর্ণ হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলেএই সময়কালটা তার জন্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার তো শুধু একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। এ সরকার জুলাই আগস্ট বিপ্লবের চেতনায় একটি নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে চায়। তারা দেশে এমন একটা ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চায় যার ফলে ভবিষ্যতে এই দেশে আর কোন স্বৈরাচার পরে আসতে না পারে। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন গণবিরোধী বিধি-বিধান জারি, আইন প্রবর্তন, সর্বোপরি অপশাসনের মাধ্যমে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, ব্যাংক, নির্বাচন ব্যবস্থাপনাসহ দেশের সব ক’টি প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে ধ্বংস করে ফেলেছে, তাতে কোনো সরকারের পক্ষেই সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার এই ক্ষেত্রগুলোতে সংস্কারের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসাবে অনুষ্ঠান করতে চায়, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশে দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।
এই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যেই ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য দেশের প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ১০টি কমিশন গঠন করেছে। এই কমিশনগুলো ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। তারা এখন অংশীজন ও বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছে। গত ৮ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের গত ৩ মাসের সাফল্য তুলে ধরেন, যেখানে তিনি অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো এবং বিশ্বের পরাশক্তিসহ ঋণপ্রদানকারী সংস্থাগুলোর আমাদের দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে পাশে থাকার অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। এসব বিবেচনায় এখন পর্যন্ত তো সবই ভালো বলা চলে। তাহলে প্রশ্ন হলো সমস্যাটা কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর একেবারে সহজ না হলেও অনেকটা দ্বিধাহীন ভাবেই বলা চলে ‘ষড়যন্ত্রের’ কথা। ছাত্র-জনতার অবিস্বরণীয় গণঅভ্যুত্থনে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর যে দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তা নস্যাৎ করতে সর্বত্র চলছে গভীর ষড়যন্ত্র। পুলিশ, র্যাব, প্রশাসন, আদালতসহ সকল সেক্টরে পালিয়ে যাওয়া হাসিনা সরকারের দোসররা বিভিন্নভাবে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। দেশজুড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। সরকার গঠনের প্রথম দিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় হামলা, ডাকাতি ও লুটপাট হয়েছে। তাতে আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী জড়িত বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থিতিশীল হয়ে একটা শান্ত, সুন্দর পরিবেশে যাতে কাজ শুরু করতে না পারে সে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সদ্য পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার সরকারের প্রেতাত্মারা। প্রায় ১৮ বছর ধরে হাসিনা সরকার সারাদেশে তার দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী ও সংগঠন দিয়ে মানুষকে হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও দখলদারিত্ব চালিয়ে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তা স্বল্প সময়ে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। এজন্য সময় প্রয়োজন। এর মধ্যে পুলিশ বাহিনীকে দলীয় ক্যাডার দিয়ে সাজানোয় তা এখনো সরকারের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এখনো অনেক থানা তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু করতে পারেনি। এতে বুঝতে অসুবিধা হয় না, দলীয় এই পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রের কর্মচারি না হয়ে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের কর্মচারি হিসেবে কাজ করেছে। প্রশাসন, র্যাব, সেনাবাহিনী এবং আদালতেও স্বৈরাচার হাসিনার দোসররা রয়ে গেছে। তারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে ছাত্র-জনতার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থ করে দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
শুধু র্যাব, পুলিশ, প্রশাসন বা বিচার বিভাগই নয় দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে ব্যবহার করেও গভীর ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘর ভাংচুর ও লুটপাট হচ্ছে, তাদের মন্দিরে হামলা হচ্ছে এ ধরনের অপপ্রচার বেশ জোরালো ভাবে করা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে এর কোন সত্যতা নেই। এসব মিথ্যা অপপ্রচারকে পুঁজি করে হিন্দু সম্প্রদায়কে মাঠে নামানো হয়েছে। তারা শাহবাগে প্রতিদিন বিক্ষোভ করছে। তাদেরকে ইন্দন দিচ্ছে ভারত এবং সে দেশের অর্থে চালিত ইসকন নামের একটি প্রতিষ্ঠান এমন বদ্ধমূল ধারণা এখন এদেশের মানুষের মনে। আর এই হিন্দুদের বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা। বিবিসির এক অনুসন্ধানি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত থেকে হিন্দুদের ওপরে ‘অত্যাচার’র ভুয়া পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপরে ‘ব্যাপক অত্যাচার’ হচ্ছে বলে যেসব ভুয়া পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার বেশিরভাগই ভারতীয় বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছিল বলে ফ্যাক্ট-চেকাররা নিশ্চিত করেছেন। আসলে বাংলাদেশকে অস্থির করতে ভারত এখনো তাদের অনুগত পতিত স্বৈরাচারের পক্ষে গোপনে নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। পোশাক শিল্পে অস্থিরতা এখনো চলছে। এর পেছনে যে দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্র কাজ করছে তা বুঝতে এখন আর কোন অসুবিধা হচ্ছে না।
পুলিশ বিগত ১৬-১৭ বছরে দেশের মানুষের সাথে কি অমানবিক আচরণ ও অপকর্ম করেছে, তা কারো অজানা নয়। আমরা বলছি না, সব পুলিশ সদস্য এ কাজ করেছে। পুলিশের মধ্যে বিগত স্বৈরাচার সরকারের পদলেহী সদস্য ছাড়া অনেক পেশাদার ও সৎ সদস্য রয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন মোকাবেলা করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থীসহ সবশ্রেণীর বহু মানুষ নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে, চোখ হারিয়েছে। জনতার প্রতিরোধে কিছু পুলিশ সদস্যও নিহত ও আহত হয়েছে। এরকম দ্বিপাক্ষিক ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক। এটা পুলিশকে বুঝতে হবে। শুধু তাদের সদস্যদের নিয়ে আফসোস করলে চলবে না, তাদের গুলিতে যে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিহত-আহত হয়েছে, মা-বাবার বুক খালি হয়েছে, সেটাও তাদের দেখতে হবে। হাসিনা সরকার যেভাবে আদালতকে ব্যবহার করে আইনের শাসন ভুলুণ্ঠিত করে গেছে, তার নজির ইতিহাসে নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিতর্কিত রায় দেশে স্বৈরশাসনের জন্ম দিয়েছে। তারপর থেকে স্বৈরাচার হাসিনা সরকার তার দলীয় লোক দিয়ে পুরো আদালতকে কবজা করে নিয়েছে। দেশের মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখেছে, হাসিনা অনুগত উচ্চ আদালতের বিচারকরা কীভাবে দলীয় আনুগত্য ও শ্লোগান দিয়েছে। বিচাপতির মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে ‘তারা শপথ বদ্ধ আওয়ামী লীগ’। ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান যেভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিচার ব্যবস্থাকে ব্যাহত করার জন্য এই প্রধান বিচারপতি নজিরবিহীনভাবে সমগ্র আদলত শাটডাউন ঘোষণা করে, যা দেশকে বিচারহীন পরিবেশের দিকে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র ছিল। পতিত স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে পরিচিত এই প্রধান বিচারপতি ‘জুডিশিয়াল ক্যু’ করার চেষ্টা করেছে। তবে বিপ্লবী ছাত্র জনতা তার সেই অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে। পরে ছাত্র-জনতার চাপে এই কুখ্যাত দলবাজ বিচারপতি তার দলবল নিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। তবে এখনো বিচার বিভাগে হাসিনার দোসরা রয়ে গেছে। আশার কথা হচ্ছে যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আবার চালু হয়েছে। তাই এসব স্বৈরাচারের দোসরদের অপসারণ হয়তো শিগগিরই হবে এমনটাই প্রত্যাশা।
প্রশাসনেও স্বৈরাচার সরকারের দোসরদের সক্রিয় এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা স্বাভাবিক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যাতে ঠিকমতো কাজ করতে না পারে, তা বাধাগ্রস্থ করার শঙ্কা এখানেও রয়েছে। স্বৈরাচার সরকারের আমলে র্যাব ভয়ংকর খুনি বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের মতো ভয়াবহ ঘটনাসহ অসংখ্য মানুষকে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে। কত মানুষকে গুম করেছে, তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৪ বছর আগে র্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তারপরও র্যাবের অপকর্ম থেমে থাকেনি। এ বাহিনী সংস্কার করার মতোও অবস্থায় নেই। ফলে এখন র্যাবের মতো অমানবিক ও ভয়ংকর বাহিনী রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলেছেন, র্যাবের মতো এমন বাহিনী না রাখাই ভালো। সেনাবাহিনীতেও শেখ হাসিনার অনুগতরা রয়েছেন। সেখানেও সংস্কার করা জরুরি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত কালবিলম্ব না করে, ছাত্র-জনতার দাবি এবং আশা-আকাংক্ষা পূরণে অতিদ্রুত পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী, আদালত, প্রশাসনসহ সর্বত্র বিরাজমান স্বৈরাচারের দোসরদের অপসারণ করা। ষড়যন্ত্রকারী ও বিতর্কিতদের বিচারের মুখোমুখি করে সর্বত্র ক্লিন ইমেজ প্রতিষ্ঠা করা।
তবে এসব সংস্কার করতে গিয়ে যাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুরত্ব তৈরী না হয়, ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি না হয় সেদিকটা অবশ্যই সরকারের নজর রাখতে হবে। এ ছাড়া সরকারের যে মূল শক্তি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তাদের সাথেও যেন কোন প্রকার দূরত্ব সৃষ্টি না হয়। উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিমত দেখা দিয়েছে। এটা আলোচনার ভিত্তিতে সমধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে পতিত স্বৈরাচার তাদের প্রভু ভারতের এজেন্ট দিয়ে এখন সর্বশেষ নিজেদের মধ্যে বিভাজন তৈরী চেষ্টা করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তির চেষ্টা করবে। এ বিষয়টি অবশ্যই সবার মনে রাখতে হবে যে যে কোন বিভাজনই ফ্যাসিবাদীদের বিভাজনের পথ উন্মুক্ত করবে। তাই আমাদের প্রত্যাশিত লক্ষে পৌঁছতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ সরকারকে সমর্থন দিতে হবে।

