বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সারা বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থেকে এই খাত বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে, দেশের পোশাক খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ এবং হুমকি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে প্রতিবেশী দেশের ষড়যন্ত্র, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আগস্টের শেষে শুরু হওয়া পোশাক খাতের নৈরাজ্যের সঠিক কারণও বের করতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। গত কয়েকদিন ধরে গাজিপুর এলাকায় সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। দাবি মানার পরও আন্দোলন-ভাঙচুর না থামায় দানা বাঁধছে নানা সন্দেহ। তবে সঠিক কারণ এখনো অধরা। পোশাকখাতের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বললে তারা তাদের কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। চেষ্টা করেছেন সম্ভাব্য কারণ ও সমাধানের জায়গা খুঁজে বের করার। তাদের ধারণা, এ জায়গাগুলোতে সরকার যদি নজর দেয় তাহলে বের হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান এই খাত নিয়ে প্রতিবেশী দেশের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি এখন স্পষ্ট। উদ্যোক্তাদের অনেকে বলছেন, এর পেছনে আন্তর্জাতিক চক্রের শিল্প ধ্বংসের ইন্ধন রয়েছে। আর্থিকভাবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতকে ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিদেশি অদৃশ্য শক্তি টাকা ছিটিয়ে দেশি এজেন্টদের দিয়ে শিল্পাঞ্চলগুলোকে অস্থিতিশীল করার জন্য পর্দার আড়ালে কলকাঠি নাড়ছে বলেও তাঁদের ধারণা। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, পোশাক শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা চলছে তৃতীয়পক্ষের ইন্ধনে। শিল্প মালিকরা মনে করছেন, শিল্পকে অস্থিতিশীল করাসহ অন্তর্বর্তী সরকারকে বিভ্রান্ত করতে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে নেপথ্যে থাকা একটি গোষ্ঠী। এতে আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের অর্ডারগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। গণমাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ভারতের। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে তাদের রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশ। শুধু আগস্টেই তাদের আয় হয়েছে ১২৬ কোটি ডলার। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত রপ্তানি থেকে ভারতের আয় হয়েছে ৬৩৯ কোটি ডলার। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি বলেছেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি। অস্থির পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ আদেশ অন্য দেশে চলে গেছে। বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে দেশি ও বিদেশি গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। এর মধ্যে রাজনীতিও ঢুকে পড়েছে উল্লেখ করে নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি বলেছেন, এই শ্রমিক আন্দোলন কোনো সাধারণ আন্দোলন নয়। এখানে বিদেশি শক্তি ঢুকে পড়েছে। ফলে শ্রমিক আন্দোলনের নামে দেশের পোশাকশিল্পসহ সরকারকে অস্থিতিশীল করতে বহিরাগত সন্ত্রসীরা এসব করছে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব একটি বাজার সৃষ্টি করতে পেরেছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদার কারণে প্রতিবছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। শ্রমিক ও মালিক উভয়েরই প্রতিষ্ঠান একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। দুই পক্ষেরই রুজি-রোজগারের স্থান এটি। শিল্প যাতে ধ্বংস না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার। একই সঙ্গে চক্রান্তকারীদের চিহ্নিত করতে হবে।
শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা কারণে গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক শিল্প-কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে দুই শতাধিক কারখানায় উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। ফলে শিল্পের প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই)। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি পূরণের আশ্বাস দিলেও অসন্তোষ কমেনি, বরং বিভিন্ন ধরনের অযৌক্তিক দাবি তুলে কারখানা ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মালিকরা। বেতনভাতা ও বিভিন্ন দাবি দাওয়ার নামে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে একশ্রেণীর শ্রমিকের আন্দোলন যে ষড়যন্ত্রের অংশ, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। অনেকে মনে করেন, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা শ্রমিকদের বেতনভাতা ও বিভিন্ন দাবি আদায়ের নামে আন্দোলন ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে উসকানি দিচ্ছে। তারা বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনে নামিয়ে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকদের উত্তেজিত করে গার্মেন্ট খাতকে অচল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপাকে ফেলার ষড়যন্ত্রে তারা লিপ্ত। বেশিরভাগ গার্মেন্টস কারখানা সচল থাকলেও কিছু কারখানার শ্রমিক বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করা থেকেই বোঝা যায়, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে। ন্যায্য দাবিদাওয়া নিয়ে গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলনে কোনো বাধা নেই। তারা মানববন্ধন কিংবা সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি উত্থাপন ও তা আদায় করতে পারে। তবে সন্ত্রাসী কায়দায় সড়ক অবরোধ, কারখানা ও যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের হেতু কি? দাবি আদায়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করবে কেন? তারা কেন সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে?কেন ত্রাসের পথ বেছে নিতে হবে?পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সময় তাদের এই আন্দোলন কোথায় ছিল? তখন কেন তাদের এ দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করা হয়নি?বলা বাহুল্য, রুটি-রুজির জায়গাই যদি বন্ধ হয়ে যায়, না থাকে, তখন তারা কোথায় আন্দোলন করবে? শ্রমিকদের মনে রাখা উচিত, যারা আন্দোলনের নামে কারখানা ভাঙচুর ও সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে জনজীবন অচল করে, তারা কোনোভাবেই শ্রমিক নয়, তারা সন্ত্রাসী। তারা তাদের পক্ষে নয়, তারা তাদের কর্মক্ষেত্র ধ্বংসকারি। উল্লেখ করা প্রয়োজন, রফতানি আয়ের প্রায় ৮৩ ভাগ গার্মেন্ট খাত থেকে আসে। গার্মেন্ট খাতে যে অস্থিরতা ও চক্রান্ত চলছে, তা ভারতেরই সৃষ্টি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার প্রতিশোধের ষড়যন্ত্র। এটি এখন ওপেন সিক্রেট। গার্মেন্ট খাতের এই ষড়যন্ত্র চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আগাম তথ্য সংগ্রহ এবং তা প্রতিহত করার পদক্ষেপ নিতে পারছে না। অন্যদিকে, সেনাবাহিনী সেখানে মোতায়েন থাকলেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারি উচ্ছৃঙ্খলদের নিবৃত্ত করার পরিবর্তে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে। অথচ সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা রয়েছে। সন্ত্রাসী কায়দায় সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে তথাকথিত শ্রমিক নামধারীদের আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
২০১৮ সালে এশিয়ার তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬০ শতাংশ এবং ইউরোপীয় বাজারে ৩৩ শতাংশ। ভবিষ্যতে ইউরোপীয় বাজারের এই অংশ কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে, চীনের রপ্তানি সম্ভাবনা সীমিত থাকার কারণে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে প্রতিবেশী কিছু দেশ নানা রকম ষড়যন্ত্র করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম এবং ভারত তাদের রপ্তানি ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজার দখলের লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় নামছে।বিশ্বের পোশাক বাজারে বড় একটি অংশ বর্তমানে বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা অনেক প্রতিবেশী দেশের চোখে শূলের মতো বিঁধছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং ভিয়েতনামসহ অন্যান্য কয়েকটি দেশ ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের বাজারে ভাগ বসানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পোশাক খাতের অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগানোর পাঁয়তারা করছে। একাধিক কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন, যেখানে তারা বাংলাদেশে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ভিত্তি করে একটি নেতিবাচক চিত্র উপস্থাপন করছেন। বিশেষ করে, ভারতের কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কীভাবে বাংলাদেশের শ্রমিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ভারতের জন্য সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারা প্রকাশ্যে বলছেন যে, বাংলাদেশে শ্রমিক অসন্তোষ ও ক্রেতাদের কার্যাদেশে মন্দাভাব ভারতের পোশাক শিল্পের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে, যার ফলে ২০২৭ সালের পর থেকে তাদের পণ্যের ওপর কোনো শুল্ক থাকবে না। এটি ভিয়েতনামের জন্য ইউরোপীয় বাজারে একটি বড় সুবিধা। আর বাংলাদেশ যদি ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটে তবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে, তারপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হবে। এই অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ভিয়েতনাম ইউরোপীয় বাজারের একটি বড় অংশ নিজেদের দিকে টানার জন্য কাজ করছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শুধু দেশের অর্থনীতির জন্য নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। প্রতিবেশী দেশের ষড়যন্ত্র এবং তাদের কৌশল মোকাবিলায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।

