বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছর ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের ফেেল দেশের অর্থনীতি চরম নাজুক অবস্থায় রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ব্যাক্তি ইমেজকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিপিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন। তার কারিশমায় ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তবে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুর্ণাঙ্গভাবে চাঙ্গা করতে হলে দেশে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন। অর্থাৎ সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নে ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ কার্যকর। পণ্য আমদানি-রপ্তানি, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন উপকরণের গতিশীলতা, কাঁচামাল ক্রয় ও পণ্য বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পণ্যের বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর সরাসরি নির্ভরশীল। পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের লক্ষে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। দেশে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর বাজারজাতকরণ ও বিদেশে রপ্তানির জন্য বন্দরে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা হতে হবে। সুষম অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অব্যাহত রাখার বিষয়টিও যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। দেশের খাদ্যসংকট মোকাবেলার জন্য এবং দ্রুত পণ্যসামগ্রী পরিবহণের জন্য উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা দরকার। শিল্প-কারখানা প্রতিষ্টা ও শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেঝে মূল্যবান সম্পদ আহরণের সুযোগ ঘটে উত্তম পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে। যোগাযোগ ব্যবস্থা কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের। যোগাযোগ ব্যবস্থা কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সাহায্য করে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্যও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ সহায়ক। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ স্বল্প আয়তনের দেশ। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার সব ধরনের মাধ্যমে থাকলেও অর্থনৈতিক অসাচ্ছলতার কারণে তা এখনো ব্যাপকভিত্তিক প্রসার লাভ করে নি। এছাড়া ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এদেশে জালের মতো নদী ছড়িয়ে আছে বলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দ্রুত সম্ভব নয়। বর্তমানে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে বলে নদীপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত হয়ে পড়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দেশে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের ব্যাপক গল্প শুনিয়েছে।তবে বাস্তবে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার গত ১৫ বছর উন্নয়নের নামে ব্যাপক লুটপাট করেছে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশটিআইবির থথ্যমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ লোপাট হয়েছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বিদ্যুৎখাতে ক্যাপাসিটি সার্চের নামে লুটপাট করেছে ২৯ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য মতে, ২০০৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অর্থাৎ ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে ২৪টি বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এসব কেলেঙ্কারিতে আত্মসাৎ হয়েছে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ফ্যাসিস্ট হাসিনা চরম নাজুক করে ফেলেছে রেখে গেছে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিকে পুন:র্গঠন করতে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। এবারের বন্যায় প্রায় ২৩১টি প্রধান সড়কের ১২৪০ কিলোমিটার এবং প্রায় সাড়ে ৩০০ ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো নতুন করে তৈরি অথবা মেরামত করতে হবে। বিগত সরকারের শেষ দিকে দরপত্র যাচাই-বাছাই হয়। প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার এই কাজ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে এক রকম স্থবির হয়ে পড়েছে সড়ক ও জনপথের (সওজ) ১০টি জোন। বিপুল অংকের এই টাকার সংস্থান থাকলেও কাজ শুরু করতে পারছে না সওজ। কারণ, অন্তর্ভূক্ত ১০৫ প্রকল্পের মধ্যে বেশিরভাগ দরপত্রে ঠিকাদারদের প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ না হওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, যেসব দরপত্রে ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতামূলক হয়নি, সেগুলো পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হবে। কালো তালিকায় স্থান পাওয়া ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে নতুনদের কাজে আসার জন্য শিগগিরই পদেক্ষেপ নেয়া হবে। পর্যবেক্ষকদের মতে, পুনঃদরপত্র এবং নতুন ঠিকাদারদের কাজ দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত ৫/৬ মাস সময় লাগবে। তারপর কাজ শুরু করতে আরো অন্তত ১/২ মাস লেগে যাবে। যা এখনই শুরু করা দরকার, তা শুরু করতে আরো যদি ৭/৮ মাস লাগে তবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও ব্রিজের অবস্থা কী দাঁড়াবে, সহজেই আন্দাজ করা যায়। সওজের সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থলোপাটের কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বে সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণব্যয় বাংলাদেশে অনেক বেশি, এ তথ্য কারো অজানা নেই। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের একাংশ ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং মন্ত্রী-এমপিরা ভাগ বাঁটোয়রা করে খেয়ে নেয়। অভিজ্ঞতাহীন দলীয় নেতাকর্মীদের ঠিকাদারি দেয়া বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সাধারণ নীতিতে পরিণত হয়। শুধু সওজে নয়, সর্বত্র। কাজের নামে টাকা মারা যখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন কাজের মান বলে কিছু থাকে না। শুধু সওজই নয়, কোনো কর্তৃপক্ষেরই রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ও নির্মাণ মানসম্পন্ন হয় না। রাস্তা ১/২ মাসের মধ্যে ভেঙ্গেচুরে চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়া, ব্রিজ বা ভবন নির্মাণের সময় কিংবা অব্যবহিত পরে ভেঙ্গে-ধসে ভূমিস্মাৎ হওয়া এ দেশে কোনো বিরল ঘটনা নয়। বন্যা-বৃষ্টিতে স্বাভাবিকভাবেই রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদির ক্ষতি হয়। আর নির্মাণে যদি ত্রুটি থাকে, নির্মাণ উপকরণ যদি রেশিও অনুপাতে না দেয়া হয়। কিংবা উপকরণ যদি নিম্নমানের হয়, রডের বদল যদি বাঁশ দেওয়া হয় তবে তো কথাই নেই। রাস্তা খানাখন্দে পরিণত হয়। ব্রিজ-কালভার্ট ধসে পড়ে। প্রতি বছর বন্যায় মহাসড়ক থেকে গ্রামীণ সড়ক পর্যন্ত শত শত কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অসংখ্য ব্রিজ-কালভার্ট নষ্ট হয়। এজন্য নতুন সড়ক নির্মাণ অথবা মেরামতের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়। এবারও সংগত প্রয়োজনেই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের তরফে এই নির্মাণ-মেরামতের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সওজও আলোচ্য প্রকল্পগুলো নিয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারের অভাবে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সওজের ৪৫ জন ঠিকাদার বা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। মূলত তারাই সওজে ঠিকাদারী করতো। তাদের কালো তালিকাভূক্ত করে নতুন ঠিকাদার সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, দরপত্রের প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতামূলক হয়নি। তাহলে কারা করবে কাজ? পর্যরেক্ষকদের মতে, সড়ক ও ব্রিজের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছি, দ্রুত মেরামত করতে না পারলে তা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, চলাচলের উপযুক্ততা হারাবে, যানবাহনের অপরিমেয় ক্ষতি হবে এবং মেরামত ব্যয় অনেক বেশি পড়বে। আমাদের সব ধরনের মোটরযানই আমদানি করতে হয়। এদের যন্ত্রাংশও আমদানি করতে হয়। এসব আমদানিকৃত মহার্ঘ যানবাহন ভাঙ্গাচোরা, খানাখন্দকে ভরা সড়কে চলাচল করলে ক্ষতিগ্রস্তই হবে না, এদের স্বাভাবিক আয়ু বা স্থায়িত্ব কমে যাবে। বলে রাখা দরকার, সড়কে চলাচলের জন্য যানবাহনের মালিকদের শুল্ক দিতে হয় বিভিন্নভাবে। এর বিনিময়ে তারা অবাধ ও মসৃণ যাতায়াত নিশ্চয়ই আশা করতে পারে। যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে মসৃণ যাতায়াত ব্যবস্থার অপরিহার্যতা প্রশ্নাতীত। এমনিতেই আমাদের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা ত্রুটিপূর্ণ। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও অপ্রতুল। রাজধানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শহর-নগরেও রাস্তাঘাটে যানজট ভয়াবহ রূপে বিদ্যমান। এর কোনো সমাধান নেই। তার ওপর সওজ ও নির্বাধে যাতায়াতের উপযোগী রাস্তাঘাটও না থাকা যানজটের সমস্যাকে আরো জটিল ও কঠিন করে তুলছে। এমতাবস্থায়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উচিৎ সওজের সড়ক নির্মাণ ও মেরামত প্রকল্পগুলো দ্রুত শুরু ও শেষ করা। ইতোমধ্যে অনেকটা সময় চলে গেছে। এখন কাজ শুরু করতে পারলেও শেষ করা যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। আরো কয়েক মাস বিলম্বিত হলে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। এখন কাজ দেয়ার জন্য যে প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নাও হতে পারে বলে স্বয়ং উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সংশয় প্রকাশ করেছেন। পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, উপদেষ্টাই যদি সংশয় প্রকাশ করেন, তবে আশার বাণী শোনাবেন কে? কে তার মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে কাজে লাগাবেন? অন্তর্বর্তী সরকার ও তার উপদেষ্টাদের কিছু জরুরি কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ দায়িত্ব সন্তোষজনকভাবে সম্পাদন করতে পারলেই সরকার ও তাদের সাফল্য। আমরা আশা করবো, সড়ক-সেতুর কাজ দ্রুতায়িত করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে এসব ক্ষেত্রে বিকল্প অনুসন্ধান করে তা কাজে লাগাতে হবে। সকল ক্ষেত্রে উপদেষ্টারা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ও মনোযোগী থাকবেন, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

