অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করেই কারামুক্ত হতে হলো উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে। আদালতে অ্যাসাঞ্জ নিজ অপরাধ স্বীকার করে নেবেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে—তার এমন একটি চুক্তি হওয়ার পর গত সোমবার তাকে ছেড়ে দিয়েছে যুক্তরাজ্য। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর এভাবেই মুক্তি পেলেন মার্কিন গোপন দলিল ফাঁস করে সারা বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেওয়া ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। অ্যাসাঞ্জকে দোষীসাব্যস্ত করার বিষয়টি আজ বুধবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের একটি আদালতে চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত বলেই বিচারিক কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওই দ্বীপটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। অ্যাসাঞ্জ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকা উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছেন। তার ৬২ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যে যে পাঁচ বছর তিনি কারাভোগ করেন, সেটিও এই সাজার অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ নতুন করে তাকে কারাভোগ করতে হবে না। এর অর্থ হলো অ্যাসাঞ্জ নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরতে পারবেন। খবর বিবিসি ও সিএনএনের।
যুক্তরাজ্যের পুলিশ ৫২ বছর বয়সী অ্যাসাঞ্জকে ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষাবিষয়ক গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং প্রকাশের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুক্তি দিয়ে আসছে যে, অ্যাসাঞ্জের প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের বিষয়ে এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে, যা অনেক মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। প্রসঙ্গত ২০১০ সালে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নথি ফাঁস করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক হৈচৈ ফেলে দেয় জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ প্রতিষ্ঠিত ওয়েবসাইট উইকিলিকস। এরপর অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করে যুক্তরাষ্ট্র। শুরু হয় গ্রেপ্তার তৎপরতা। গ্রেপ্তার এড়াতে এক পর্যায়ে অ্যাসাঞ্জ লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয়ে নেন এবং সেখানেই প্রায় সাত বছর কাটান। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যের কারাগারে ছিলেন অ্যাসাঞ্জ। সেখান থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বিষয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি অ্যাসাঞ্জ মার্কিন সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী, তিনি এখন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করে নেবেন; কিন্তু তাকে নতুন করে আর কারাগারে যেতে হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিবিসির পার্টনার সিবিএসের খবরে বলা হয়েছে, নিজের অপরাধ স্বীকার করার জন্য অ্যাসাঞ্জকে কারাগারে পাঠানো হবে না। উল্টো, এতদিন তিনি যে কারাভোগ করেছেন, সেটির জন্য ক্ষতিপূরণ পাবেন। অ্যাসাঞ্জ এরই মধ্যেই যুক্তরাজ্যের কারাগার থেকে বের হয়েছেন বলে জানিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ নিজেদের অ্যাকাউন্টে প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে যে, যুক্তরাজ্যের কারাগারের একটি ছোট্ট কক্ষে ১৯০১ দিন বন্দি থাকার পর সোমবার জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ছাড়া পান। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের স্ত্রী স্টেলা মরিস অ্যাসাঞ্জ এক্স পোস্টে অ্যাসাঞ্জের সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, সমর্থকরা বছরের পর বছর ধরে পাশে থেকেছেন বলেই অ্যাসাঞ্জের মুক্তির দাবি পূরণ হয়েছে। উইকিলিকস এক ভিডিও পোস্টে বলেছে, (সোমবার) বিকেলে তাকে স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দরে ছেড়ে দেওয়া হয়, যেখান থেকে তিনি একটি বিমানে যুক্তরাজ্য ত্যাগ করেন। সেই ভিডিওতে জিনস ও নীল রঙের শার্ট পরা অ্যাসাঞ্জকে স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দরে দেখা গেছে। এএফপির খবর বলছে, স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর থেকে অ্যাসাঞ্জকে বহনকারী বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকা উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছে। এরই মধ্যে সেই দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছেন তিনি। এখানকার স্থানীয় আদালতে আজ নিজ অপরাধ স্বীকার করবেন অ্যাসাঞ্জ। রায়ে তার ৬২ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যে যে পাঁচ বছর তিনি কারাভোগ করেন, সেটি এই সাজার অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তাকে নতুন করে আর কারাভোগ করতে হবে না। এর পরই তিনি নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরতে পারবেন।
এদিকে, বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে অস্ট্রেলিয়া সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, মামলাটি অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চলছে। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে মার্কিন সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছিল যে, তারা যেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম প্রত্যাহার করেন। এর পর গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানান, তিনি অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওই অনুরোধ বিবেচনা করে দেখছেন।

