ঢাকাMonday , 23 February 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নৌ-দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি: লাভ কার?

Link Copied!

Paturia-parনিজস্ব প্রতিবেদক : একের পর এক লঞ্চ ডুবে, মারা যায় শত শত মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারের জন্য মিলে কিঞ্চিত অর্থ সাহায্য। আর তা ফলাও করে প্রচার করা হয় নানা গণমাধ্যমে। কিন্তু কোনোভাবেই উদঘাটিত হয় না লঞ্চডুবির প্রকৃত কার্যকারণ। চিহ্নিত হয় না দায়ীরাও। অথচ প্রতিটি নৌ-দুর্ঘটনার পরই মন্ত্রী-এমপি ও সরকারের সংশ্লিষ্টরা জনরোষ প্রশমন করতে দায়সারাভাবে ঘোষণা দেয় তদন্ত কমিটির। আর দু’একদিন যেতে না যেতেই ফাইলচাপা পড়ে যায় তদন্তের কর্মযজ্ঞ।
রোববার মানিকগঞ্জের পদ্মায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে কার্গোজাহাজ এমভি নার্গিস-১ এর ধাক্কায় দু’শতাধিক যাত্রীবোঝাই লঞ্চ এমভি মোস্তফা-৩ ডুবে ৭০ জন যাত্রীর প্রাণহানী ঘটেছে, নিখোঁজ আছে আরো অনেকেই। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পরই যথারীতি সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এছাড়া ইতিপূর্বে গঠিত নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিবের নেতৃত্বে স্থায়ী তদন্ত কমিটিও আলাদাভাবে এই দুর্ঘটনা তদন্ত করবে বলে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান জানিয়েছেন। কিন্তু আদৌ এ ঘটনার তদন্ত হবে কি না বা হলেও এ ঘটনার কার্যকারণ ও দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা হবে কি না সে সংশয়ই দেখা দিয়েছে মানুষের মনে।
জানা গেছে, যাত্রীবাহী লঞ্চসহ বিভিন্ন ধরনের নৌ-দুর্ঘটনার পর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর গণমাধ্যমের কাছে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা ফলাও করে প্রচার করলেও গঠন করা তদন্ত কমিটির সিংহভাগই কোনো প্রতিবেদন জমা দেয় না। দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর অধিকাংশই প্রতিবেদন দেয়ার আগে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। আর আলোচিত দুর্ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিবেদন দেয়া হলেও সেগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওঠে।
আবার কোনো কোনো তদন্তে ‘উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এতে পার পেয়ে যাচ্ছে দায়ী সরকারি কর্মকর্তাসহ প্রকৃত অপরাধীরা। ফলে এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। সারা বছরই দেশের বিভিন্ন স্থানে পুনরাবৃত্তি ঘটে চলে নৌ-দুর্ঘটনার।
সম্প্রতি বহুল আলোচিত সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে অয়েল ট্যাংকার (তেলবাহী জাহাজ) ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ ও পদ্মার মাওয়ায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমএল পিনাক-৬ এবং রোববারের এমভি মোস্তফাসহ গত ১০ মাসে সংঘটিত ১৩টি নৌ-দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে সরকারের ভূমিকা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব দুর্ঘটনায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর (ডস) মোট ১৭টি কমিটি গঠন করলেও ইতিপূর্বের আটটি কমিটি এখনো তাদের প্রতিবেদনই জমা দেয়নি। আর তদন্তের শেষ পর্যায়ে বিলুপ্ত করা হয় একটি কমিটি।
গত ৯ ডিসেম্বর বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের মৃগামারি এলাকায় মংলা বন্দরের অদূরে শ্যালা নদীতে তেলবাহী জাহাজ ‘এমটি টোটাল’র ধাক্কায় নিমজ্জিত হয় সাড়ে তিন লক্ষাধিক লিটার ফার্নেস অয়েলবাহী জাহাজ ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’।
দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ ঘটনায় ওইদিনই ডস মহাপরিচালক অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ (আইএসও)-১৯৭৬ এর ৪৫ ধারা মোতাবেক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সংস্থার নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদকে আহ্বায়ক, পরিদর্শক মো. আবু জাফর মিয়াকে সদস্যসচিব এবং বিশেষ কর্মকর্তা (নৌ-নিরাপত্তা) ও নির্বাহী হাকিম গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসানকে করে সদস্য করে গঠিত তিন সদস্যের কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। গত ২৫ ডিসেম্বর ১৩ কার্যদিবস পেরিয়ে যায়। এছাড়া ১৭ ডিসেম্বর শনিবার পর্যন্ত এই কমিটির আহ্বায়ক ও একমাত্র কারিগরী বিশেষজ্ঞ গিয়াসউদ্দিন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাননি।
একই ঘটনা তদন্ত করছে নৌ-মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব নুর-উর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত আরেকটি কমিটি। কমিটির সদস্যরা গত ১২-১৩ ডিসেম্বর সুন্দরবন ও মংলা বন্দরসহ নিমজ্জিত জাহাজ পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সাক্ষগ্রহণ করেছেন। এছাড়া পরবর্তী সময়ে তারা এই দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আটক হওয়া অপর নৌযান এমটি টোটালও পরিদর্শন করেছেন। তবে এখনো প্রতিবেদন জমা দেননি তারাও।
তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ডসের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন কে এম জসিমউদ্দীন সরকার জানিয়েছেন, দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে ‘এমটি টোটাল’র চালকসহ চারজনকে আটকের পর আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের বক্তব্য নেয়া আবশ্যক। কিন্তু চারজন কারাবন্দি থাকায় তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি। এ কারণে প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব হচ্ছে।
এছাড়া সুন্দরবনে এই দুর্ঘটনার পর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সুন্দরবন বিভাগ আরো দু’টি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে সে দু’টি কমিটি ইতোমধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
গত ২৫ নভেম্বর রাতে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে মেঘনা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি বিউটি অব ইমা’র ধাক্কায় যাত্রীবাহী একটি লঞ্চ ডুবে যায়। এতে একজন নিহত হন। এর একদিন আগে ১৪ নভেম্বর ভোররাতে (১৩ নভেম্বর শেষরাত) মংলা বন্দরের কাছে সুন্দরবনের ভেতরে পশুর ও শ্যালা নদীর সংযোগস্থল তামবুল বুনিয়ায় তলা ফেটে ডুবে যায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি শাহীদূত।
এ দু’টি ঘটনা তদন্তের ২৬ ও ২৫ নভেম্বর চার সদস্যবিশিষ্ট আলাদা দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দু’টি কমিটিরই আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব করা হয়েছে যথাক্রমে ডসের প্রকৌশলী, জাহাজ জরিপকারক ও পরীক্ষক ড. এ এস এম নাজমুল হক ও মূখ্য পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমানকে।
এছাড়া ডসের নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদ এবং বিশেষ কর্মকর্তা (নৌ নিরাপত্তা) ও নির্বাহী হাকিম গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসানকে দু’টি কমিটিতে সদস্য রাখা হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত ১৫ কার্যদিবস অনেক আগে শেষ হয়ে গেলেও দু’টি দুর্ঘটনার একটিরও প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
কমিটির প্রধান ড. নাজমুল হক জানিয়েছেন, ১৫ কার্যদিবস পার হওয়ার আগেই দু’টি কমিটির পক্ষ থেকে সময়সীমা সাত কার্যদিবস বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যে দুটি প্রতিবেদনই জমা দেয়া হবে।
গত ১৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের বহিঃনোঙ্গরে মালবাহী নৌযান এমভি নাফিজ তলা ফেটে কর্ণফুলী নদীতে ডুবে যায়। এই দুর্ঘটনা তদন্তে নাবিক ও প্রবাসী কল্যাণ পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জসীমউদ্দিন পাটোয়ারীকে আহ্বায়ক ও ডসের পরিদর্শক এয়াছিনুল আজমকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। গত ২ ডিসেম্বর গঠিত এ কমিটিকে ১৫ কার্যদিবস সময় বেঁধে দেয়া হলেও তারাও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
গত ৬ নভেম্বর রাতে খুলনার লবনচরা এলাকায় ভৈরব নদে ডুবে যায় কিংকার বোঝাই জাহাজ এমভি সাফিনা-এ-মক্কা। এই দুর্ঘটনা তদন্তে ডস মহাপরিচালক গত ১২ নভেম্বর সংস্থার নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেন। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও এখনো প্রতিবেদন দেয়নি তারা।
গত ১২ অক্টোবর রাতে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার কালিগঞ্জে মেঘনা নদীতে প্রথম দফায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি টিপু-৭ ও দ্বিতীয় দফায় তেলবাহী জাহাজ এমটি নুরজাহানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নিমজ্জিত হয় সার বোঝাই নৌযান এমভি এমসিএল সিন্ধু। এ দুর্ঘটনা তদন্তে ডসের নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদকে আহ্বায়ক, পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমানকে সদস্যসচিব এবং বিশেষ কর্মকর্তা (নৌ নিরপত্তা) ও নির্বাহী হাকিম মোহাম্মদ সাইফুল হাসানকে সদস্য করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ১২ নভেম্বর গঠিত এই কমিটিও ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
গত ১২ সেপ্টেম্বর সকালে মংলা বন্দরের কাছে পশুর নদে ডুবে যায় কিংকার বোঝাই জাহাজ এমভি হাজেরা-১। এ ঘটনায় ডস মহাপরিচালক ১৪ সেপ্টেম্বর সংস্থার প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মো. মুঈনউদ্দিন জুলফিকারকে আহ্বায়ক করে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্তের জন্য বেঁধে দেয়া ১৫ কার্যদিবস অনেক আগে পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন দেয়নি তারা।
গত ২৬ আগস্ট সকালে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে তেলবাহী নৌযান এমটি হেকমতের সঙ্গে সংঘর্ষে মালবাহী জাহাজ এমভি চিতলমারী ডুবে যায়। এ ঘটনায় ২৭ আগস্ট ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
৩ আগস্ট রাতে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার শিকারপুরে বিআইডব্লিউটিএর টার্মিনাল ঘাটে দু’টি যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি রাজদূত-৭ ও এমভি আঁচল-৪ এর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ২৪ আগস্ট ডসের বিশেষ কর্মকর্তা (নৌ নিরাপত্তা) ও নির্বাহী হাকিম মোহাম্মদ সাইফুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত দুই সদস্যের কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
গত ৪ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত হয় আড়াই শতাধিক যাত্রীবোঝাই লঞ্চ এমএল পিনাক-৬। বহুল আলোচিত এ দুর্ঘটনা তদন্তে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আইএসও-১৯৭৬ এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে সংস্থার প্রকৌশলী, জাহাজ জরিপকারক ও পরীক্ষক ড. এ এস এম নাজমুল হকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। তবে তদন্তের শেষ পর্যায়ে এই কমিটি বিলুপ্ত করেন মহাপরিচালক।
একই ঘটনায় নৌ-মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব নুর-উর রহমানের নেতৃত্বে একটি কমিটি দীর্ঘ ৪০ দিন পর তদন্ত প্রতিবেদন দিলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি সরকার। এছাড়া দুর্ঘটনার জন্য দায়ী একাধিক কর্মকর্তাকে আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে। ওই কমিটিকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ও তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান এবং পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও পরিবেশবিদসহ নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতারা।